ফুটবল বিশ্বে সর্বকালের সেরা কে? এই প্রশ্নটি করলেই লিওনেল মেসি এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর নাম সবার আগে উঠে আসে। মাঠের পারফরম্যান্স, গোল বা শিরোপার হিসেবে হয়তো মেসি অনেকটাই এগিয়ে, কিন্তু যখন প্রসঙ্গ আসে ব্যাংক ব্যালেন্স বা বার্ষিক আয়ের, তখন চিত্রটা কিন্তু একদম ভিন্ন। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘স্পোর্টিকোর’ এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ফুটবলারদের আয়ের চমকপ্রদ সব তথ্য।
ভক্তদের তর্কের বিষয় এখন আর শুধু গোল বা ট্রফির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, দুই তারকার পকেটের ওজন নিয়েও চলছে জোর আলোচনা। আসুন দেখে নেওয়া যাক, ২০২৫ সালে আয়ের দৌড়ে কে কাকে টেক্কা দিলেন।
আয়ের রাজত্বে রোনালদোর হ্যাটট্রিক
মাঠের খেলায় বয়স কোনো বাধা নয়, সেটা আবারও প্রমাণ করলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। শুধু প্রমাণই করলেন না, আয়ের দিক থেকে নিজেকে নিয়ে গেলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। স্পোর্টিকোর রিপোর্ট অনুযায়ী, টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বের সর্বোচ্চ আয়কারী খেলোয়াড় হিসেবে নিজের নাম লিখিয়েছেন পর্তুগিজ এই সুপারস্টার।
আল-নাসরের হয়ে খেলা এই ফরোয়ার্ডের বাৎসরিক আয় শুনলে যে কারো চোখ কপালে উঠবে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে রোনালদোর মোট আয় দাঁড়িয়েছে ২৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৩১ হাজার ৭২০ কোটি টাকা!
৪০ বছর বয়সী রোনালদোর এই বিশাল আয়ের প্রধান উৎস সৌদি প্রো লিগের ক্লাব আল-নাসরের সাথে তার চুক্তি। গত ১২ মাসে শুধু ক্লাব থেকেই তিনি বেতন হিসেবে পেয়েছেন প্রায় ২০ কোটি ডলার।
মাঠের বাইরের আয়েও রোনালদোর দাপট
রোনালদো শুধু ফুটবলার নন, তিনি নিজেই একটি ব্র্যান্ড। মাঠের বেতনের বাইরেও তার আয়ের অঙ্কটা বিশাল। বিভিন্ন বিজ্ঞাপন, স্পনসরশিপ এবং নিজস্ব ব্যবসার মাধ্যমে তিনি আয় করেছেন আরও প্রায় ৬০ মিলিয়ন ডলার। নাইকি (Nike), বাইনান্স (Binance) এবং নিজের ব্র্যান্ড ‘CR7’-এর মতো উৎস থেকে এই বিপুল অর্থ তার অ্যাকাউন্টে যোগ হয়েছে।
মেসির অবস্থান ও আয়ের ব্যবধান
রোনালদো যখন আয়ের পাহাড় গড়ছেন, তখন তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসির অবস্থান কোথায়? মাঠের জাদুকর মেসি বর্তমানে খেলছেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব ইন্টার মিয়ামিতে। জনপ্রিয়তায় মেসি এখনো বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ক্রীড়াবিদ, কিন্তু আয়ের দিক থেকে রোনালদোর সাথে তার ব্যবধানটা বেশ বড়।
রিপোর্টে দেখা গেছে, এই তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছেন আর্জেন্টাইন সুপারস্টার। আশ্চর্যের বিষয় হলো, মেসির বর্তমান আয় রোনালদোর আয়ের প্রায় অর্ধেক। যদিও মাঠের বাইরের ব্র্যান্ড ভ্যালু এবং স্পনসরশিপ থেকে মেসির আয় এখনো ঈর্ষণীয়, তবুও সৌদি আরবের তেলের টাকার ঝনঝনানির কাছে সেটা কিছুটা ম্লান হয়ে গেছে। আমেরিকার লিগে খেললেও, সৌদি প্রো লিগের মতো বিশাল অঙ্কের বেতন কাঠামো সেখানে নেই, যা এই ব্যবধানের মূল কারণ।
নেইমারের পতন: শীর্ষ ১০ থেকে বিদায়
এই তালিকার আরেক বড় চমক ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টার নেইমার জুনিয়র। এক সময় যিনি আয়ের দিক থেকে মেসি-রোনালদোর ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলতেন, সেই নেইমার এখন শীর্ষ দশেও নেই। সৌদি প্রো লিগের ক্লাব আল-হিলালের সাথে চুক্তি এবং পরবর্তীতে ইনজুরি ও চুক্তি বাতিলের জটিলতায় তার আয়ে বড়সড় ধস নেমেছে।
২০২৫ সালে নেইমারের মোট আয় এসে ঠেকেছে মাত্র ৩.৭ কোটি ডলারে। এর ফলে আয়ের তালিকায় তিনি শীর্ষ ছয় থেকে ছিটকে সোজা ৩০ নম্বরে নেমে গেছেন। ইনজুরির কারণে দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে থাকা এবং স্পনসরদের আগ্রহ কমে যাওয়াই এর প্রধান কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কেন এই বিশাল ব্যবধান?
ফুটবল এখন আর শুধু খেলা নয়, এটি এখন বিশাল এক বাণিজ্যের নাম। রোনালদোর আয়ের এই উল্লম্ফনের প্রধান কারণ সৌদি আরবের ফুটবলে বিশাল বিনিয়োগ। ইউরোপের পাট চুকিয়ে রোনালদো যখন সৌদি আরবে পাড়ি জমালেন, তখন অনেকেই সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু অর্থনৈতিক দিক থেকে তার সেই সিদ্ধান্ত যে কতটা লাভজনক ছিল, তা এই পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট।
অন্যদিকে, মেসি বেছে নিয়েছেন আমেরিকাকে। সেখানেও অর্থের অভাব নেই, অ্যাপল (Apple) ও অ্যাডিডাসের (Adidas) সাথে তার লভ্যাংশ শেয়ারিং চুক্তি আছে, তবুও সরাসরি বেতনের অঙ্কে রোনালদো যোজন যোজন এগিয়ে।
একনজরে আয়ের সারাংশ:
- রোনালদো: ২৬০ মিলিয়ন ডলার (শীর্ষে)
- মেসি: রোনালদোর অর্ধেক আয় নিয়ে ৩য় স্থানে
- নেইমার: ৩.৭ কোটি ডলার নিয়ে ৩০তম স্থানে
ভক্তদের তর্কে কে সেরা সেটা হয়তো কখনোই মীমাংসা হবে না। তবে ব্যাংকের হিসাব বলছে, এই মুহূর্তে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে ধনী এবং দামী তারকা নিঃসন্দেহে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো।








