বিশ্বকাপ ফুটবলের সেমিফাইনালে আবারও মুখোমুখি হতে যাচ্ছে দুই পরাশক্তি আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। ফুটবল দুনিয়ায় এই দুই দলের লড়াই মানেই কেবল ৯০ মিনিটের খেলা নয়, এর সাথে মিশে থাকে কোটি ভক্তের আবেগ, তীব্র উত্তেজনা এবং মাঠের ভেতরের পুরোনো সব ইতিহাস। প্রায় ২৪ বছর পর আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখা হচ্ছে এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর।
তবে এবারের এই মহাযুদ্ধের ঠিক আগেই আর্জেন্টিনা হারিয়েছে তাদের সাবেক কিংবদন্তি অধিনায়ক অ্যান্তোনিও রাত্তিনকে। কয়েক দিন আগেই ৮৯ বছর বয়সে তিনি না-ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। রাত্তিনের বিদায়ের পরই ফুটবল বিশ্ব কাঁপাতে তৈরি হচ্ছে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচ। সবশেষ ২০০২ সালের বিশ্বকাপে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল দল দুটি। এই হাইভোল্টেজ ম্যাচের আগে চলুন একনজরে দেখে নেওয়া যাক এই দুই দলের দ্বৈরথের ৫টি বহুল আলোচিত ও ঐতিহাসিক ঘটনা।
১. অধিনায়ক রাত্তিনকে মাঠ থেকে বের করতে মাঠে নামল পুলিশ (১৯৬৬)
১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওয়েম্বলিতে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। সেই ম্যাচে জার্মান রেফারি রুডলফ ক্রিটলিন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক অ্যান্তোনিও রাত্তিনকে হুট করেই মাঠ ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। রাত্তিন রেফারিকে জানান যে তিনি ভাষা বুঝতে পারছেন না, তাই কথা বলার জন্য একজন দোভাষী চান।
কিন্তু রেফারি তা না মেনে তাকে মাঠ ছাড়তে বাধ্য করেন। রাত্তিন মাঠ ছাড়তে রাজি না হওয়ায় প্রায় ১০ মিনিট খেলা বন্ধ থাকে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, শেষ পর্যন্ত পুলিশ মাঠে নেমে তাকে জোর করে মাঠের বাইরে নিয়ে যায়। মজার ব্যাপার হলো, তখন ফুটবলে হলুদ বা লাল কার্ডের কোনো নিয়ম ছিল না। এই রাত্তিনের ঘটনার পরেই মূলত ফুটবলে লাল ও হলুদ কার্ডের প্রথা চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
২. বার্তোনির প্রচণ্ড ঘুষি ও চেরির দাঁত ভাঙার গল্প (১৯৭৭)
১৯৭৭ সালে লা বোম্বোনেরা স্টেডিয়ামে একটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল এই দুই দল। প্রীতি ম্যাচ হলেও লড়াইটি রূপ নিয়েছিল রীতিমতো যুদ্ধক্ষেত্রে। ম্যাচের শেষ মুহূর্তের দিকে ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার ট্রেভর চেরি আর্জেন্টিনার ড্যানিয়েল বার্তোনিকে একটি কঠিন ট্যাকল করেন।
এতে ক্ষিপ্ত হয়ে বার্তোনি সরাসরি চেরির মুখে এক প্রচণ্ড ঘুষি মারেন। ঘুষির আঘাতে চেরির সামনের দুটি দাঁত ভেঙে যায়। এই ঘটনার পর রেফারি দুজনকেই লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেন। সেই সাথে ট্রেভর চেরি প্রথম ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে কোনো প্রীতি ম্যাচে লাল কার্ড দেখার রেকর্ড গড়েন।
৩. পচেত্তিনোর ফাউল বিতর্ক এবং বেকহ্যামের গোল (২০০২)
২০০২ সালের বিশ্বকাপে দুই দলের সর্বশেষ লড়াইতেও রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশাল বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। প্রথমার্ধের ঠিক শেষের দিকে আর্জেন্টিনার ডি-বক্সের ভেতর মরিসিও পচেত্তিনোর চ্যালেঞ্জের মুখে ইংল্যান্ডের মাইকেল ওভেন মাটিতে পড়ে যান। বিখ্যাত রেফারি পিয়েরলুইজি কোলিনা সাথে সাথে পেনাল্টির বাঁশি বাজান।
সেই পেনাল্টি থেকে ডেভিড বেকহ্যাম গোল করে ইংল্যান্ডকে ১-০ ব্যবধানে জয় এনে দেন। তবে বহু বছর পর পচেত্তিনো দাবি করেছিলেন, ওভেন আসলে ডাইভ দিয়েছিলেন এবং তিনি তাকে স্পর্শই করেননি।
৪. ডেভিড বেকহ্যামের সেই লাল কার্ড ও টাইব্রেকার (১৯৯৮)
১৯৯৮ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ম্যাচ হিসেবে পরিচিত। নির্ধারিত সময়ে ম্যাচটি ২-২ গোলে সমতায় ছিল। তবে ম্যাচের আসল নাটক তৈরি হয় দ্বিতীয় রিলিজ বা দ্বিতীয়ার্ধে। আর্জেন্টিনার দিয়াগো সিমিওনের সাথে একটি ধাক্কাধাক্কির জেরে মাটিতে শুয়ে থেকেই সিমিওনেকে লাথি মারেন ইংল্যান্ডের তরুণ তারকা ডেভিড বেকহ্যাম।
রেফারি সাথে সাথে বেকহ্যামকে লাল কার্ড দেখান। ১০ জনের ইংল্যান্ড ম্যাচটিকে টাইব্রেকার পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেলেও শেষ রক্ষা হয়নি। টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে জয় পায় আর্জেন্টিনা, যা ইংলিশ সমর্থকদের জন্য আজও এক বড় কষ্টের স্মৃতি।
৫. ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ ও শতাব্দীর সেরা গোল (১৯৮৬)
আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড দ্বৈরথের সবচেয়ে সোনালী এবং বিতর্কিত অধ্যায় হলো ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিটার শিলটনের সাথে লাফিয়ে উঠে হাত দিয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনা। রেফারি বিষয়টিকে হেড ভেবে গোলের সিদ্ধান্ত দেন, যা পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে পরিচিতি পায়।
“গোলটি যদি হাত দিয়ে হয়ে থাকে, তবে সেটি ছিল আল্লাহর হাত।” দিয়েগো ম্যারাডোনা
এই গোলের ঠিক চার মিনিট পরেই ম্যারাডোনা ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর গোলটি করেন। নিজের অর্ধেক মাঠ থেকে বল নিয়ে চোখের পলকে একে একে ৫ জন ইংলিশ ডিফেন্ডার ও গোলরক্ষককে কাটিয়ে তিনি বল জালে পাঠান। এই গোলটিকেই পরবর্তীতে ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ বা শতাব্দীর সেরা গোল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে ম্যাচটি জিতে নেয় এবং সেবার বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয়।








