বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) বলেছে, এক কেজি পেঁয়াজের দাম সর্বোচ্চ ১১০ টাকা ছাড়িয়েছে, তাই দ্রুত আমদানির অনুমতি দেওয়া উচিত।
প্রতিবছর অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মাসে পেঁয়াজের দাম বাড়ে এবছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
গত বৃহস্পতিবার বিটিটিসি বাণিজ্যসচিব ও কৃষিসচিবকে চিঠি পাঠিয়ে এই সুপারিশ করেছে।
চিঠিতে বলা হয়, স্থানীয় বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে,
“উচ্চ দামের সুবিধা কৃষক পাচ্ছেন না, বরং মধ্যস্বত্বভোগীরা বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।”
তাদের মতে, আমদানির সুযোগ দিলে বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে, ফলে দাম কমে আসবে এবং ভোক্তারা যৌক্তিক মূল্যে পেঁয়াজ কিনতে পারবেন।
কারা বাড়াচ্ছে দাম?
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিবছর এই সময় অসাধু ব্যবসায়ী ও মজুতদারদের সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়।
তারা ইচ্ছাকৃতভাবে পেঁয়াজ মজুত করে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দেয়, যাতে দাম বাড়ানো যায়।
গত মৌসুমে কৃষকরা ন্যায্য দাম না পেয়ে দ্রুত পেঁয়াজ বিক্রি করে ফেলেছেন।
এখন বাজারে যেসব পেঁয়াজ আছে, সেগুলো মূলত মজুতদারদের দখলে।
তারা আবারও সরকারের কাছে আমদানির অনুমতি চাইছে, যাতে বিদেশি পেঁয়াজ এনে বাজারে নতুন করে প্রভাব তৈরি করা যায়।
ক্যাবের অভিযোগ: কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) মনে করছে, বাজারে এখন কোনো প্রকৃত সংকট নেই। সংকট তৈরি করা হচ্ছে ইচ্ছাকৃতভাবে।
ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন,
“আড়তদার, কমিশন এজেন্ট ও দাদন ব্যবসায়ীরা কারসাজি করে পেঁয়াজ মজুত করছে। তারা বাজারে ছাড়ছে না, যাতে দাম আরও বাড়ে। এভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে আমদানির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা চলছে।”
তিনি সতর্ক করেন, এখন আমদানি শুরু হলে দেশীয় কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, কারণ তাদের নতুন ফসল বাজারে আসতে আর দেরি নেই।
এখনই সরকারের উচিত বাজারে নজরদারি বাড়ানো, যাতে ভোক্তার পকেট রক্ষা পায়।
দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন ও মজুত পরিস্থিতি
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী,
বাংলাদেশে বছরে পেঁয়াজের মোট চাহিদা প্রায় ৩৫ লাখ টন,
আর গত মৌসুমে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩৮ লাখ টন।
এছাড়া, এবার সংরক্ষণ ব্যবস্থাও ভালো ছিল।
তাই কৃষি কর্মকর্তারা মনে করেন, দেশে কোনো ঘাটতি নেই।
বরং পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও কিছু গোষ্ঠী ‘ইমপোর্ট পারমিট (আইপি)’ পাওয়ার জন্য মরিয়া।
এখন পর্যন্ত প্রায় ২,৮০০ আবেদন জমা পড়েছে আইপি নিতে,
যদিও মাত্র এক মাস পরই নতুন দেশীয় পেঁয়াজ বাজারে আসবে, যা দাম আরও কমাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আমদানি নির্ভরতা: ভারতের প্রভাব বেশি
ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
বাংলাদেশের পেঁয়াজ আমদানির ৯৯ শতাংশই আসে ভারত থেকে।
এ ছাড়া অল্প পরিমাণে আমদানি হয় তুরস্ক, পাকিস্তান, মিয়ানমার, চীন ও মিসর থেকে।
গত অর্থবছরে মোট ৪ লাখ ৮৩ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে।
বর্তমানে পেঁয়াজ আমদানির ওপর ১০ শতাংশ শুল্ককর প্রযোজ্য।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আমদানির ওপর এত বেশি নির্ভরতা দেশের বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে।
ভারত যদি হঠাৎ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়, তাহলে আবারও দেশে সংকট তৈরি হয় যার পুরো চাপ পরে ভোক্তার ওপর।
এখন বাজারে দাম কত?
শুক্রবার (৮ নভেম্বর) রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে
প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ১১০–১২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
কিছু এলাকায় দাম আরও বেশি।
বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারি বাজারে দাম বাড়ায় খুচরাতেও প্রভাব পড়েছে।
তবে ভোক্তাদের আশা যদি সরকার দ্রুত আমদানির অনুমতি দেয়, তাহলে ১৫–২০ টাকার মধ্যে দাম কমে আসতে পারে।
অন্যদিকে কৃষক ও কৃষিবিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই আমদানি নয়, বরং বাজার নিয়ন্ত্রণে কড়া নজরদারি ও মজুতদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই সমাধান।
বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশ্ন একটাই আমদানির সুপারিশে কি সত্যিই দাম কমবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাময়িকভাবে দাম কিছুটা কমতে পারে, তবে টেকসই সমাধান নয়।
মূল সমস্যা হলো বাজারে সিন্ডিকেট ও নজরদারির অভাব।
যদি সরকারের তত্ত্বাবধান ও বাজার নিয়ন্ত্রণ কার্যকর হয়,
তাহলে কৃষক ও ভোক্তা উভয়ের স্বার্থ রক্ষা সম্ভব।
অন্যথায় আমদানির সুযোগ আবারও মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফার হাতিয়ার হয়ে উঠবে।








