জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় পরিত্যক্ত জলাশয়গুলোতে এবার কোটি টাকার পানিফল চাষ হয়েছে। যেসব জায়গায় আগে কৃষিজ ফসল ফলানো সম্ভব ছিল না, সেসব জায়গাই এখন রূপ নিচ্ছে অর্থকরী ফসলের ক্ষেত্র হিসেবে।
চলতি মৌসুমে শুধু দেওয়ানগঞ্জ উপজেলাতেই প্রায় পাঁচ কোটি টাকার পানিফল উৎপাদন হয়েছে। এর ফলে স্থানীয় কৃষকদের ভাগ্যের চাকা ঘুরে গেছে। অনেকে এই ফল চাষ করে এখন স্বাবলম্বী হয়েছেন।
কৃষিবিদের আশাবাদ
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রতন মিয়া জানান, পানিফলে প্রচুর পরিমাণে শর্করা ও প্রাকৃতিক গ্লুকোজ রয়েছে। এটি থেকে সহজেই প্রক্রিয়াজাত করে গ্লুকোজ তৈরি করা সম্ভব।
তার মতে, যদি সরকারি সহায়তা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপন করা যায়, তাহলে পানিফল চাষ বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন অধ্যায় খুলে দিতে পারে।
উৎপাদনের পরিসংখ্যান
কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ফসল জন্মায় না এমন ৪০ হেক্টর পরিত্যক্ত জমিতে এই বছর পানিফল চাষ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে মোট ৩২০ টন ফল, অর্থাৎ প্রতি হেক্টরে প্রায় ৮ টন ফলন পাওয়া গেছে।
বর্তমানে কাঁচা পানিফল বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা মনদরে, আর পাকা পানিফল বিক্রি হচ্ছে ১,১০০ থেকে ১,২০০ টাকা মনদরে। এই হিসেবে চলতি মৌসুমে প্রায় ১ কোটি ৫ লাখ ৬০ হাজার টাকার পানিফল বিক্রি হয়েছে।
‘শিঙাড়া’ নামের মজার এই ফল
স্থানীয়ভাবে পানিফলকে বলা হয় ‘শিঙাড়া’। দেখতে দোকানের ভাজা শিঙাড়ার মতো হওয়ায় এর এমন নামকরণ। এর খোসা গাঢ় সবুজ বা খয়েরি রঙের, ভেতরের শাঁস দুধের মতো সাদা।
ফলটি খেতে মিষ্টি, কোমল ও ঠান্ডা স্বাদের হওয়ায় এটি সকালের নাস্তায় সিদ্ধ করে খাওয়া হয়। এছাড়া রোদে শুকিয়ে এর আটা তৈরি করে রুটি হিসেবেও খাওয়া হয়। অনেক পরিবার এখন এ ফল দিয়ে সবজি, হালুয়া, পিঠা ও বিভিন্ন খাবার তৈরি করছে।
কৃষকের মুখে হাসি
দেওয়ানগঞ্জের পানিফল চাষি করিম মিয়া বলেন, “আমি আগে দিনমজুর ছিলাম। এখন নিজের জলাশয়ে পানিফল চাষ করে সংসারের অভাব ঘুচাতে পেরেছি।”
তিনি আরও জানান, খুব বেশি পুঁজি ছাড়াই এই চাষ করা যায়। শুধু কাদাযুক্ত অগভীর পানি ও কিছু যত্নই যথেষ্ট। ফলে এলাকার অনেক বেকার যুবক এখন পানিফল চাষের দিকে ঝুঁকছেন।
চাষ পদ্ধতি ও মৌসুম
কৃষকদের তথ্য অনুযায়ী, চৈত্র মাসে কাদাপানিতে পানিফলের চারা রোপণ করা হয়। বর্ষায় জলাশয়গুলো পানিতে ভরে গেলে গাছগুলো দ্রুত বেড়ে ওঠে।
কার্তিক মাস থেকে শুরু হয়ে পৌষ মাস পর্যন্ত ফল সংগ্রহ করা যায়। তবে এবছর বৃষ্টি ও পানির ঘাটতির কারণে কার্তিক মাসেই বেশিরভাগ চাষ শেষ হয়ে গেছে।
বাজারে পানিফলের বেচাকেনা
প্রতিদিন ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত দেওয়ানগঞ্জ রেলস্টেশনের পেছনে পানিফলের জমজমাট বাজার বসে। ঢাকা, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা আসেন এই ফল কিনতে।
তারা প্রতিদিন ট্রাকে করে টনকে টন পানিফল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠিয়ে দেন। এতে স্থানীয় অর্থনীতি এখন বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠেছে।
সংরক্ষণের সংকট
তবে, চাষিদের মুখে হাসি থাকলেও কিছু সমস্যাও রয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সংরক্ষণের অভাব।
চাষি ফরহাদ মিয়া বলেন, “আমাদের এলাকায় কোনো হিমাগার নেই। ফলে পানিফল ২–৩ দিনের বেশি রাখা যায় না। অনেক সময় বিক্রি না হলে পচে নষ্ট হয়ে যায়।”
তিনি আরও জানান, রেলের লোকাল ট্রেন বন্ধ থাকায় পাইকাররা আসতে পারছেন না। তাই এখন তারা অতিরিক্ত খরচে ট্রাকে করে ফল পরিবহন করছেন, এতে খরচ বাড়ছে এবং লাভ কমছে।
নতুন সম্ভাবনার দ্বার
পানিফল শুধু খাওয়ার উপযোগী নয়, এটি স্বাস্থ্যসম্মত ও পুষ্টিকর ফল হিসেবেও পরিচিত। এতে প্রাকৃতিক শর্করা, ক্যালসিয়াম ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যা শরীর ঠান্ডা রাখে এবং শক্তি জোগায়।
কৃষিবিদরা বলছেন, সরকারি উদ্যোগে যদি পানিফল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলা যায়, তাহলে এখান থেকে গ্লুকোজ, সিরাপ, এমনকি বায়ো-প্যাকেজিং উপাদান তৈরি করা সম্ভব। এতে বিদেশে রপ্তানিরও সুযোগ তৈরি হবে।
পানিফল এখন শুধু গ্রামের জলাশয়ের ফল নয়, এটি হয়ে উঠছে গ্রামীণ অর্থনীতির সম্ভাবনাময় ফসল। দেওয়ানগঞ্জের কৃষকদের সফলতা দেশের অন্যান্য জেলাকেও অনুপ্রাণিত করছে।
যথাযথ সংরক্ষণ ব্যবস্থা, বাজার সম্প্রসারণ ও সরকারি সহায়তা পেলে এই ফল বাংলাদেশের কৃষি ও অর্থনীতিতে নতুন এক অধ্যায় যোগ করবে এমনটাই আশা করছেন স্থানীয় কৃষক ও কৃষিবিদরা।








