বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তনের হাওয়া বইলেও অর্থনীতির আকাশে এখনো কালো মেঘ। আসছে নতুন নির্বাচিত সরকার একটি স্বস্তিদায়ক বা সাজানো অর্থনীতি পাচ্ছে না। বরং তাদের সামনে অপেক্ষা করছে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। একদিকে ডলার সংকট, অন্যদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সব মিলিয়ে নতুন সরকারকে শুরুতেই বড় ধরনের অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
ক্ষমতার শুরুতেই কেন বড় অর্থ সংকট
নতুন সরকার ক্ষমতায় বসেই বড় ধরনের অর্থ সংকটের মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে:
- রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি: বিগত সময়ে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় হয়নি।
- ব্যাংক খাতের নাজুক অবস্থা: লুটপাট ও অনিয়মের কারণে অনেক ব্যাংক এখন তারল্য সংকটে ভুগছে।
- বাড়তি খরচ: নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির কারণে সরকারের খরচ বাড়বে কয়েক গুণ।
আইএমএফ (IMF) ও বিশ্বব্যাংকের কঠিন শর্ত
নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (IMF) শর্তগুলো পূরণ করা। আইএমএফ বারবার চাপ দিচ্ছে ভর্তুকি কমাতে এবং ডলারের দাম বাজারভিত্তিক করতে।
- ভর্তুকি কমানোর ঝুঁকি: গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারের ভর্তুকি কমালে এগুলোর দাম বেড়ে যাবে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।
- টাকার মান: ডলারের বিপরীতে টাকার মান আরও কমলে আমদানিকৃত পণ্যের দাম বাড়বে, যা সরাসরি সাধারণ মানুষের পকেটে টান দেবে।
মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার: এক উভয় সংকট
সাধারণ মানুষের প্রধান সমস্যা এখন ‘মূল্যস্ফীতি’ বা দ্রব্যমূল্য। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি।
- ব্যবসায়ীদের দাবি: ব্যবসায়ীরা চাচ্ছেন ঋণের সুদের হার কমাতে যাতে বিনিয়োগ বাড়ে।
- কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান: কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে না নামলে সুদের হার কমানো যাবে না। এই দুইয়ের মাঝে পড়ে সরকার এক কঠিন পরিস্থিতির শিকার। সুদের হার কমালে মূল্যস্ফীতি বাড়বে, আর না কমালে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়বে।
বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোই কি মূল চাবিকাঠি
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে বিনিয়োগের দুয়ার খুলতে পারে। তবে তার জন্য কিছু কাজ করা জরুরি:
- গ্যাস-বিদ্যুতের নিশ্চয়তা: কলকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
- আমলাতান্ত্রিক জটিলতা: ব্যবসা শুরু বা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে।
- সুশাসন: ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করলে বিনিয়োগকারীরা আস্থা পাবেন না।
ব্যাংকিং খাতের ক্ষত ও পাচার হওয়া টাকা
বিগত সরকারের সময় ব্যাংকিং খাতে যে লুটপাট হয়েছে, তার প্রভাব এখনো কাটেনি। খেলাপি ঋণের পাহাড় ব্যাংকগুলোকে দুর্বল করে দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞের মত: বিআইডিএস-এর সাবেক মহাপরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকার বড় একটি ঘাটতি রেখে যাচ্ছে। এই ঘাটতি মেটাতে নতুন সরকারকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হবে, যা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ কমিয়ে দিতে পারে।
তবে আশার কথা হলো, বর্তমান সময়ে হুন্ডির প্রভাব কমেছে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছুটা ইতিবাচক। পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে অর্থনীতির চেহারা দ্রুত বদলে যেতে পারে, যদিও এটি সময়সাপেক্ষ।
নতুন সরকারের করণীয়: উত্তরণের পথ কী?
অর্থনীতিকে সচল করতে নতুন সরকারকে কিছু কঠোর কিন্তু কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে:
- রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা: সবার আগে দেশে ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
- রাজস্ব সংস্কার: কর আদায়ের পদ্ধতি আধুনিক করতে হবে যেন সরকারি আয় বাড়ে।
- চাঁদাবাজি বন্ধ: শিল্প ও ব্যবসা খাতে যেকোনো ধরনের চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট কঠোর হাতে দমন করতে হবে।
- বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ: প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স বাড়ানোর পাশাপাশি সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) উৎসাহিত করতে হবে।
নতুন সরকারের পথ হবে অনেকটা কাঁটাযুক্ত। একদিকে আইএমএফ-এর চাপ, অন্যদিকে জনগণের প্রত্যাশা এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে আসল কাজ। অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে সরকার যদি সাহসিকতার সাথে সংস্কার কাজগুলো চালিয়ে যায় এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে, তবে এই ভঙ্গুর অর্থনীতি আবারও ঘুরে দাঁড়াবে।








