বাংলা সিনেমার ইতিহাসে কবরী শুধু একজন অভিনেত্রী নন, তিনি ছিলেন এক যুগের আবেগ, এক প্রজন্মের প্রেরণা। ঢাকাই চলচ্চিত্রের সোনালি সময়ে অসংখ্য জনপ্রিয় সিনেমায় অভিনয় করে দর্শকের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছিলেন তিনি। তবে কবরীর জীবনের শেষ প্রজেক্ট ‘এই তুমি সেই তুমি’ যেন হয়ে উঠেছে এক অসমাপ্ত স্বপ্নের প্রতীক। ২০২১ সালে মৃত্যুর আগে তিনি শুরু করেছিলেন এই সিনেমার শুটিং, কিন্তু শেষ করতে পারেননি। এখন প্রশ্ন কবরীর শেষ সিনেমা কি অবশেষে মুক্তি পাবে?
ভালোবাসার গল্প ও সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি
‘এই তুমি সেই তুমি’ কেবল একটি চলচ্চিত্র নয়, এটি কবরীর নিজের জীবনবোধ, ভালোবাসা ও স্বাধীনতার প্রতি অঙ্গীকারের প্রতিফলন। সিনেমাটির গল্পে রয়েছে দুই প্রজন্মের সংযোগ, একটি মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল, অন্যটি বর্তমান সময়ের গল্প।
দুটি ভিন্ন সময়ের মানুষ, দুটি প্রেমের গল্প কিন্তু একই মাটির আবেগে বাঁধা। কবরীর নিজস্ব হাতে লেখা চিত্রনাট্য ও সংলাপে ফুটে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, নারীর শক্তি ও জীবনের অনিবার্য পরিবর্তন।
নায়িকা সালওয়া ও নায়ক রায়হান, কবরীর পছন্দেই নির্বাচিত
সিনেমাটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন নিশাত নাওয়ার সালওয়া ও রায়হান রিয়াদ। কবরী নিজেই তাদের নির্বাচন করেছিলেন। নতুন প্রজন্মের এই দুই শিল্পীকে তিনি বিশ্বাস করতেন তার কাহিনির আবেগ সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারবেন।
শুটিংয়ের সময় কবরী ছিলেন অত্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ প্রতিটি দৃশ্য, সংলাপ, এমনকি পোশাক নির্বাচনেও তার ব্যক্তিগত তদারকি ছিল।
তবে মাত্র দুই দিনের শুটিং বাকি থাকতেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ২০২১ সালে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
ছেলের হাত ধরে অসমাপ্ত কাজের পরিসমাপ্তি
কবরীর মৃত্যুর পর তার ছেলে শাকের চিশতী দায়িত্ব নেন সিনেমাটি শেষ করার। আবেগের সঙ্গে দায়িত্বের ভারও ছিল বিশাল।
তিনি বলেন, “আম্মুর অসমাপ্ত কাজ শেষ করাই আমার জন্য ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আমি শুধু কাজটা শেষ করতে চেয়েছি, যেন তার স্বপ্নটা অপূর্ণ না থাকে।”
২০২৩ সালের শেষের দিকে শাকের চিশতী সিনেমাটির সম্পাদনা, ডাবিং ও সংগীতের কাজ সম্পন্ন করেন। কবরীর রেখে যাওয়া নোট, স্ক্রিপ্ট ও নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি দৃশ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন।
ফলে সিনেমার মূল মেজাজ ও কবরীর ভাবনার প্রতি শ্রদ্ধা অক্ষুণ্ণ থাকে।
সাবিনা ইয়াসমিনের হাত ধরে এক নস্টালজিক স্পর্শ
‘এই তুমি সেই তুমি’ সিনেমার সংগীত পরিচালনা করেছেন দেশের কিংবদন্তি শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন। কবরী নিজেই একটি গান লিখেছিলেন সিনেমার জন্য, যা এই সিনেমাকে আরও আবেগঘন করে তুলেছে।
এই গানগুলোর মাধ্যমে কবরী যেন নিজের জীবনের শেষ অনুভূতিগুলো প্রকাশ করেছেন প্রেম, হারানো সময়, এবং দেশের প্রতি এক নিঃশেষ ভালোবাসা।
দেশে নয়, প্রথম প্রদর্শনী বিদেশে
শাকের চিশতী জানিয়েছেন, সিনেমাটি ইতোমধ্যে কয়েকটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে জমা দেওয়া হয়েছে।
তাঁর ভাষায়, “দেশের বাইরে কিছু বড় উৎসবে প্রদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে। সেসব প্রদর্শনী শেষে দেশে মুক্তির পরিকল্পনা করব।”
অর্থাৎ, কবরীর শেষ সিনেমার প্রথম প্রদর্শনী হবে বিদেশে— যা কবরীর আন্তর্জাতিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
বাংলা সিনেমার জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত
যদি সবকিছু ঠিক থাকে, তবে ‘এই তুমি সেই তুমি’ হবে বাংলা চলচ্চিত্র ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী সংযোজন।
এটি শুধু কবরীর শেষ কাজ নয়, বরং তাঁর জীবনের শেষ বার্তা।
এই সিনেমার মাধ্যমে দর্শকরা আবারও অনুভব করবেন তাঁর সংলাপের কোমলতা, চোখের ভাষায় গল্প বলার ক্ষমতা এবং শিল্পের প্রতি ভালোবাসা।
কেন এই সিনেমার মুক্তি এত গুরুত্বপূর্ণ
বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি যুগের শেষ প্রজন্মের প্রতিনিধি ছিলেন কবরী। তাঁর হাতে গড়া সিনেমা ‘এই তুমি সেই তুমি’ মুক্তি পাওয়া মানে হলো সেই সময়ের গৌরবকে আবার ফিরিয়ে আনা।
এটি তরুণ প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেবে সিনেমা শুধু বিনোদন নয়, এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আবেগের প্রতিফলন।
কবরীর প্রতি এক অনন্ত শ্রদ্ধাঞ্জলি
সিনেমা জগতে কবরী ছিলেন এক জীবন্ত কিংবদন্তি। তাঁর অভিনয়, হাসি, সংলাপ সবকিছুই বাংলা চলচ্চিত্রের অংশ হয়ে গেছে।
‘এই তুমি সেই তুমি’ যদি মুক্তি পায়, তাহলে সেটি হবে তাঁর প্রতি জাতির পক্ষ থেকে এক আন্তরিক শ্রদ্ধাঞ্জলি।
প্রেম, সংগ্রাম ও মাতৃত্বের এই গল্পে আবারও বেঁচে থাকবেন আমাদের চিরচেনা কবরী।








