মানুষের চোখকে ফাঁকি দিয়ে সম্পূর্ণ গায়েব হয়ে যেতে পারে এমন এক অবিশ্বাস্য ও অভিনব ড্রোন উদ্ভাবন করেছেন বিজ্ঞানীরা। প্রযুক্তিভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এনগ্যাজেট-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ড্রোনটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘ফ্যান্টম টুইস্ট’ (Phantom Twist)।
এই বিশেষ ড্রোনটি আকাশে ওড়ার সময় প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২৫ বার পর্যন্ত ঘুরতে বা স্পিন করতে পারে। ড্রোনটির এই ঘূর্ণন গতি এতটাই তীব্র যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে খালি চোখে এটিকে স্পষ্ট দেখা এক প্রকার অসম্ভব।
দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা এমন রোবট ও ড্রোন তৈরির চেষ্টা করছেন, যা যুদ্ধক্ষেত্র বা বনে নজরদারির সময় সাধারণ মানুষের বা পশুপাখির চোখে পড়বে না। এতদিন আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে মিশে যাওয়ার জন্য স্বচ্ছ উপাদান কিংবা আলোর গতিপথ পরিবর্তনের পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো। তবে এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অভিনব এক কৌশল অবলম্বন করেছেন গবেষকরা।
কিভাবে কাজ করে এই অদৃশ্য ড্রোন?
নতুন এই ড্রোনে কোনো বিশেষ মেকআপ বা জটিল কেমোফ্লেজ উপাদান ব্যবহার করা হয়নি। বরং ড্রোনটিকে লুকিয়ে ফেলতে কাজে লাগানো হয়েছে এর অবিশ্বাস্য ঘূর্ণন গতিকে।
- গতির জাদু: তীব্র গতিতে ঘোরার কারণে ড্রোনের শক্ত অবয়বটি চোখের সামনে আবছা ধোঁয়া বা কুয়াশার মতো দেখায়।
- পরিবেশের সাথে মিশ্রণ: ড্রোনটির বেশিরভাগ অংশ স্বচ্ছ হওয়ায় এবং ঘূর্ণনের কারণে হালকা কুয়াশার মতো তৈরি হওয়ায় এটি মুহূর্তেই পেছনের পরিবেশের (Background) সঙ্গে মিশে যায়।
- দৃষ্টিশক্তির সীমাবদ্ধতা: মানুষের চোখ যেকোনো সংকেত বা ছবি গ্রহণ করতে যে সামান্য সময় নেয়, বিজ্ঞানীরা সেই স্বাভাবিক সীমাবদ্ধতাকেই নিখুঁতভাবে কাজে লাগিয়েছেন।
গবেষণার নেতৃত্ব দেওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি’র বিজ্ঞানী মাইকেল রুবেনস্টাইন বলেন, “অধিকাংশ গবেষক ড্রোনকে আশপাশের রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু আমরা চিন্তা করলাম, মানুষের গতি অনুভবের সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে ড্রোন অদৃশ্য করা যায়। অনবরত ঘূর্ণন গতির মাধ্যমে দৃশ্যমানতা প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনার এই চিন্তাটি একদমই নতুন।”
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কম্পিউটেশনাল মডেলের ব্যবহার
ড্রোনটি ওড়ার সময় যাতে ভারসাম্য না হারায় এবং নিখুঁতভাবে গায়েব হতে পারে, তার জন্য বিজ্ঞানীদের প্রচুর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও কম্পিউটেশনাল মডেল ব্যবহার করতে হয়েছে।
গবেষকরা প্রায় ১০০টি ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবসম্মত ব্যাকগ্রাউন্ডের সামনে ড্রোনটির কৃত্রিম ওড়ানোর পরীক্ষা (Simulation) চালান। মানুষের চোখের মডেল তৈরি করে পরীক্ষা করার পর যখন নিশ্চিত হওয়া গেছে যে এটি আস আসলেই দেখা যাচ্ছে না, তখনই বিজ্ঞানীরা এর চূড়ান্ত রূপ তৈরি করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়টির কম্পিউটার ভিশন বিশেষজ্ঞ এমা আলেকজান্ডার বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, “আমাদের চোখ ক্যামেরার এক্সপোজার টাইমের মতো কাজ করে। কোনো বস্তু মাত্রাতিরিক্ত দ্রুত ঘুরলে চোখ সেটিকে কেবল আবছা ধোঁয়া হিসেবে দেখে। ফলে তার সুনির্দিষ্ট আকার বোঝা যায় না।”
প্রথাগত অদৃশ্য ড্রোন ও ফ্যান্টম টুইস্ট-এর পার্থক্য
| বৈশিষ্ট্য | প্রথাগত ড্রোন | ফ্যান্টম টুইস্ট ড্রোন |
| লুকানোর পদ্ধতি | স্বচ্ছ গ্লাস বা আলোর গতিপথ পরিবর্তনের চেষ্টা | তীব্র ঘূর্ণন গতি (Spinning) ব্যবহার |
| কার্যকারিতা | কেবল নির্দিষ্ট আলো ও পরিবেশেই কিছুটা কার্যকর | যে কোনো ব্যাকগ্রাউন্ডের সামনে দ্রুত মিশে যায় |
| প্রযুক্তি | জটিল এবং ব্যয়বহুল মেটেরিয়াল | মানুষের চোখের সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগানো প্রযুক্তি |
কোন কোন ক্ষেত্রে ব্যবহার হবে এই ড্রোন?
সামরিক খাত এবং বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে এই ড্রোন বড় ধরনের বিপ্লব আনবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
১. বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণ: সাধারণত ক্যামেরা বা ড্রোন দেখলে বনের পশুপাখি ভয় পায় বা তাদের প্রাকৃতিক আচরণ বদলে যায়। অদৃশ্য এই ড্রোনের কারণে পশুপাখিরা টেরও পাবে না যে তাদের ওপর নজর রাখা হচ্ছে।
২. সামরিক নজরদারি: শত্রুঘাঁটিতে বা যুদ্ধক্ষেত্রে নিঃশব্দে নজরদারি চালাতে এই প্রযুক্তি সেনাবাহিনীকে বিশাল সুবিধা এনে দেবে।
৩. পরিবেশগত গবেষণা: প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও কঠিন আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ করতে এটি নিরাপদ ভূমিকা পালন করবে।
বর্তমান সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা
যদিও ড্রোনটি খালি চোখে অদৃশ্য হতে পেরেছে, তবুও এটি এখনও ১০০% নিখুঁত নয়। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ওড়ার সময় ড্রোনটি থেকে এখনও কিছুটা শব্দ উৎপন্ন হয়, যা গোপন নজরদারির ক্ষেত্রে বড় এক বাধা।
গবেষকরা এখন ড্রোনটির নতুন সংস্করণ তৈরির কাজ করছেন। তারা আশা করছেন, আগামী সংস্করণে শব্দ কমানোর জন্য শান্ত প্রপালশন সিস্টেম এবং দৃশ্যমান ছোট ছোট অংশগুলো দূর করতে আরও উন্নত স্বচ্ছ মেটেরিয়াল ব্যবহার করা হবে।
বিজ্ঞান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ছোঁয়ায় অসম্ভবকে সম্ভব করার আরও একটি দুর্দান্ত উদাহরণ এই অদৃশ্য ড্রোন। সামরিক বা বৈজ্ঞানিক গবেষণা—সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির এই নতুন উদ্ভাবন ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যাচ্ছে।








