গ্রীষ্মের ছুটিতে কোথাও বেড়াতে গেলে বা ঘরে বসে থাকলেও দেখা যায়, একই জায়গায় থাকা একাধিক মানুষের মধ্যে একজন মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছেন, অথচ পাশের মানুষটিকে মশা একটিও কামড়াচ্ছে না! অনেকে রসিকতা করে বলেন, যার রক্ত ‘বেশি মিষ্টি’ তাকেই নাকি মশা বেশি কামড়ায়।
তবে বিবিসি-র একটি তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি কেবল রসিকতা নয়, এর পেছনে রয়েছে নিখাদ বৈজ্ঞানিক কারণ। মানুষের শরীর থেকে প্রতিনিয়ত নির্গত কিছু ‘জৈবিক উপাদান’ বা বায়োলজিক্যাল মার্কার মশার আকর্ষণ নির্ধারণ করে।
সহজ কথায়, কিছু মানুষের শারীরিক গঠন ও উপাদানের কারণে তারা মশাদের কাছে ‘মশার চুম্বক’ (Mosquito Magnet) হয়ে ওঠেন। চলুন জেনে নেওয়া যাক বিজ্ঞানীরা কী বলছেন এই বিষয়ে।
১. কার্বন ডাই-অক্সাইডের সংকেতে মশার হানা
মানুষের রক্ত চুষে খায় মূলত স্ত্রী মশা। কারণ ডিম উৎপাদনের জন্য তাদের প্রোটিনের প্রয়োজন হয়। মশা প্রায় ৩৩ ফুট দূর থেকেই মানুষের উপস্থিতি টের পেতে পারে।
- নিশ্বাসের ভূমিকা: মানুষ নিশ্বাসের সঙ্গে যে কার্বন ডাই-অক্সাইড বের করে, তা মশাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে।
- প্রাপ্তবয়স্কদের ঝুঁকি: ছোট শিশুদের চেয়ে বড় বা বয়স্ক মানুষেরা বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করেন। তাই মশা শিশুদের চেয়ে বড়দের বেশি কামড়ায়।
- ভারী শরীর: যাদের শরীরের গঠন বড়, তারা বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত করায় মশারা তাদের দ্রুত টার্গেট করে।
২. শরীরের বাড়তি তাপ ও আর্দ্রতা
মশারা শরীরের উত্তাপ ও ঘামের আর্দ্রতার প্রতি তীব্রভাবে আকৃষ্ট হয়। শরীরে তাপমাত্রা বাড়লে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনও বাড়ে।
গর্ভবতী নারীরা কেন বেশি মশার কামড় খান?
যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টিভ লিন্ডসের মতে, গর্ভবতী নারীদের শরীরের মেটাবলিজম ও শ্বাস-প্রশ্বাসের হার বেশি থাকে। ফলে তাদের শরীর সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি উত্তপ্ত থাকে এবং তারা দ্বিগুণ মশার কামড়ের শিকার হন।
একই কারণে যারা ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রম করেন, তাদের শরীর গরম ও ঘামাক্ত থাকায় ব্যায়ামের সময় ও পরে মশারা তাদের বেশি আক্রমণ করে।
৩. ত্বকের নিজস্ব গন্ধ ও ব্যাকটেরিয়া
মানুষের রক্ত মিষ্টি কি না—তা মশার কাছে কোনো বিষয় নয়। মশা আকর্ষণ করার মূল খেলাটি খেলে ত্বকের নিজস্ব গন্ধ।
বিজ্ঞানীরা জানান, মানুষের ত্বকে থাকা ‘মাইক্রোবায়োম’ বা অণুজীবগুলো ত্বকের বিভিন্ন উপাদান ভেঙে ‘উদ্বায়ী জৈব যৌগ’ তৈরি করে।
- কার্বক্সিলিক অ্যাসিড: রকেফেলার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের ত্বকে ‘কার্বক্সিলিক অ্যাসিড’ বেশি থাকে, মশারা তাদের দিকে ১০০ গুণ বেশি আকৃষ্ট হয়!
- ত্বকের ব্যাকটেরিয়া: ত্বকের ব্যাকটেরিয়ার ধরন যার শরীরে যেমন, তার শরীরের গন্ধও তেমন। ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্য কম হলে শরীরের গন্ধ এমন হয় যা মশাকে দ্রুত আকর্ষণ করে।
সবচেয়ে বড় কথা, এই বংশগত বা জিনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে মশাদের কাছে আপনার এই আকর্ষণ সারাজীবন একই রকম থাকে।
মিথ বনাম বাস্তবতা: মশার কামড় নিয়ে ভুল ধারণা
| প্রচলিত ভুল ধারণা (Myth) | বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা (Fact) |
| রক্ত বেশি মিষ্টি হলে মশা কামড়ায় | রক্তের মিষ্টির সঙ্গে মশার কোনো সম্পর্ক নেই, খেলাটি ত্বকের গন্ধের |
| মিষ্টি বা চকলেট খেলে মশা বেশি আসে | খাবারের চেয়ে শরীরের তাপ ও নিশ্বাসের কার্বন ডাই-অক্সাইড প্রধান |
| সবাইকে মশা সমান কামড়ায় | মানুষভেদে মশার আকর্ষণ ১০০ গুণ পর্যন্ত কম-বেশি হতে পারে |
সবাই কেন মশার কামড়ের সমান প্রতিক্রিয়া অনুভব করেন না?
মশা সবাইকে কামড়ালেও সবার শরীরে একই রকম প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না।
গবেষকদের মতে, মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও জিনের পার্থক্যের কারণে মশার কামড়ের প্রতিক্রিয়া আলাদা হয়। কারও শরীরে মশা কামড়ালে তীব্র চুলকানি ও বড় লাল চাকা হয়ে যায়, আবার কারও শরীরে সাধারণ একটা বিন্দুর মতো হয়ে মিলিয়ে যায়। যাদের প্রতিক্রিয়া বেশি হয়, তারা মনে করেন তাদেরই মশা বেশি কামড়াচ্ছে!
আপনি জৈবিকভাবে মশার সহজ লক্ষ্যবস্তু হন বা না হন মশার কামড় থেকে কেউই শতভাগ নিরাপদ নন। তাই মশার কামড় এড়াতে মশারি ব্যবহার করা, শরীর ঢেকে রাখা এবং মশা তাড়ানোর স্প্রে বা ক্রিম ব্যবহার করা উচিত।








