বিশ্বজুড়ে যখন সুপেয় পানির হাহাকার তুঙ্গে, ঠিক তখনই আশার আলো দেখালেন ২০২৫ সালের রসায়নে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী অধ্যাপক ওমর ইয়াগি। তার আবিষ্কৃত এক বিশেষ প্রযুক্তি এখন বাতাস থেকে টেনে আনবে বিশুদ্ধ পানি। খরা কিংবা প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে যখন মূল পানির লাইন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন এই যন্ত্রটি হয়ে উঠবে সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষাকারী কবচ।
কীভাবে কাজ করে এই জাদুকরী যন্ত্র
অধ্যাপক ইয়াগির প্রতিষ্ঠিত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাটোকো’ (Atoco) এই যন্ত্রটি তৈরি করেছে। এতে ব্যবহার করা হয়েছে বিজ্ঞানের এক বিশেষ শাখা, যার নাম ‘রেটিকুলার কেমিস্ট্রি’।
সহজ কথায় বলতে গেলে, এই যন্ত্রে এমন কিছু আণবিক উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে যা স্পঞ্জের মতো বাতাস থেকে আর্দ্রতা শুষে নিতে পারে। এমনকি মরুভূমির মতো অতি শুষ্ক পরিবেশেও এটি বাতাস থেকে পানি বের করে আনতে সক্ষম। ২০ ফুট লম্বা একটি শিপিং কনটেইনারের সমান এই যন্ত্রটি চালাতে খুব সামান্য তাপশক্তির প্রয়োজন হয়।
দুর্যোগেও থামবে না পানির সরবরাহ
ঘূর্ণিঝড় ‘বেরিল’ বা ‘মেলিসা’র মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে যখন বিদ্যুৎ ও পানির পাম্প অকেজো হয়ে পড়ে, তখন মানুষ দিশেহারা হয়ে যায়। অধ্যাপক ইয়াগি জানান:
- এই যন্ত্রটি লোকালয়ে বসিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১,০০০ লিটার পর্যন্ত বিশুদ্ধ পানি উৎপাদন করা সম্ভব।
- এটি সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব এবং এতে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের কোনো ক্ষতি হয় না।
- দুর্গম দ্বীপরাষ্ট্র বা খরাপ্রবণ এলাকায় যেখানে পানি পৌঁছানো কঠিন, সেখানে এই প্রযুক্তি হবে সেরা সমাধান।
কেন এই আবিষ্কার এত গুরুত্বপূর্ণ
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, পৃথিবী এখন ‘বৈশ্বিক পানি দেউলিয়াত্বের যুগে’ প্রবেশ করেছে। বিশ্বের প্রায় ২২০ কোটি মানুষ এখনো নিরাপদ পানির সংকটে ভুগছেন। সমুদ্রের পানিকে লবণমুক্ত করার প্রচলিত পদ্ধতিগুলো বেশ ব্যয়বহুল এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। সেই তুলনায় অধ্যাপক ইয়াগির এই ‘বায়বীয় পানি সংগ্রহ’ পদ্ধতি অনেক বেশি টেকসই এবং সাশ্রয়ী।
বিজ্ঞানীর শৈশবের লড়াই থেকে এই উদ্ভাবন
অধ্যাপক ওমর ইয়াগির এই আবিষ্কারের পেছনে রয়েছে তার জীবনের এক করুণ গল্প। তিনি জর্ডানের এক উদ্বাস্তু শিবিরে বড় হয়েছেন, যেখানে বিদ্যুৎ বা পানির কোনো ব্যবস্থা ছিল না। সপ্তাহে মাত্র একদিন পানি আসত, আর সেই পানি ধরে রাখার জন্য ছোটবেলায় তাকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটতে হতো। শৈশবের সেই পানির অভাবই তাকে আজ এমন এক যন্ত্র তৈরির অনুপ্রেরণা দিয়েছে, যা সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের তৃষ্ণা মেটাবে।
দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জন্য নতুন আশা
ক্যারিবীয় অঞ্চলের দেশ গ্রেনাডা বা ক্যারিয়াকো দ্বীপের বাসিন্দারা প্রতিবছর খরা ও ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়েন। তাদের অনেক সময় মূল ভূখণ্ড থেকে চড়া দামে পানি আমদানি করতে হয়। স্থানীয় পরিবেশকর্মীদের মতে, অধ্যাপক ইয়াগির এই প্রযুক্তি তাদের পানি আমদানির খরচ কমাবে এবং দুর্যোগের সময় জীবন বাঁচাতে সাহায্য করবে।
অধ্যাপক ওমর ইয়াগি বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিজ্ঞানের এই অগ্রগতিকে কাজে লাগিয়ে বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ার। তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই কঠিন সময়ে শুধু কার্বন কমানো নয়, বরং মানুষের মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য সাহসের সাথে বিজ্ঞানের নতুন সব শাখাকে আলিঙ্গন করতে হবে।








