প্রতিদিনের সকালের নাস্তায় ডিমের জুড়ি নেই। কিন্তু বাজার থেকে ডিম কেনার সময় বেশিরভাগ মানুষের মনেই একটি প্রশ্ন উঁকি দেয় বাদামি বা লাল ডিম নাকি সাদা ডিম, কোনটি বেশি পুষ্টিকর? আমাদের মধ্যে একটি সাধারণ ধারণা রয়েছে যে, বাদামি ডিম তুলনামূলকভাবে বেশি পুষ্টিকর, অর্গানিক এবং সুস্বাদু। আবার কেউ কেউ ভাবেন সাদা ডিমই বেশি পরিচ্ছন্ন।
তবে পুষ্টিবিদ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিমের খোসার রং দেখে তার পুষ্টিগুণ বিচার করা পুরোপুরি একটি ভুল ধারণা। খোসার রং যাই হোক না কেন, পুষ্টির বিচারে সাদা ও বাদামি ডিমের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে বিশেষ কোনো পার্থক্য নেই।
ডিমের খোসার রং কীভাবে নির্ধারিত হয়?
ডিমের খোসার রং সাদা হবে না বাদামি হবে, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে মুরগির জাত এবং তার বংশগত বৈশিষ্ট্যের ওপর।
- সাদা ডিম পাড়ে যে জাতের মুরগি: সাধারণত হোয়াইট লেগহর্ন, হোয়াইট রক ও কর্নিশ জাতের মুরগি সাদা রঙের ডিম দিয়ে থাকে।
- বাদামি বা লাল ডিম পাড়ে যে জাতের মুরগি: প্লাইমাউথ রক, নিউ হ্যাম্পশায়ার ও রোড আইল্যান্ড রেড জাতের মুরগি থেকে মূলত বাদামি ডিম পাওয়া যায়।
- অন্যান্য রঙের ডিম: দক্ষিণ আমেরিকার অ্যারোকানা বা আমেরিকানা জাতের কিছু মুরগি নীল বা নীলচে-সবুজ রঙের ডিমও পেড়ে থাকে।
মুরগির শরীরে তৈরি হওয়া প্রাকৃতিক রঞ্জক পদার্থের কারণেই ডিমের খোসায় এই রঙের বৈচিত্র্য দেখা যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, একই জাতের মুরগি হলেও তার বয়স, শারীরিক সুস্থতা এবং মানসিক চাপের ওপর নির্ভর করে ডিমের রং কিছুটা হালকা বা গাঢ় হতে পারে।
পুষ্টিগুণে কি সত্যিই কোনো পার্থক্য আছে?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (USDA) গবেষণা অনুযায়ী, ডিমের খোসা সাদা, লাল কিংবা অন্য যেকোনো রঙেরই হোক না কেন, তার মূল পুষ্টিগুণ একই থাকে।
একটি মাঝারি আকারের ডিমের পুষ্টি উপাদান নিচে তুলে ধরা হলো:
| উপাদান | আনুমানিক পরিমাণ |
| ক্যালরি | প্রায় ৬০ ক্যালরি (জাম্বো ডিমে ৯০ ক্যালরি) |
| প্রোটিন | প্রায় ৬ গ্রাম (জাম্বো ডিমে ৮ গ্রাম) |
| ভিটামিন ও খনিজ | ভিটামিন এ, বি-১২, ডি এবং আয়রন |
অনেকের ধারণা নীল বা বাদামি ডিমে কোলেস্টেরল কম থাকে, কিন্তু এর সপক্ষে পর্যাপ্ত কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এমনকি ডিমের স্বাদের ওপরও খোসার রঙের কোনো প্রভাব নেই। ডিম কতটা টাটকা এবং মুরগিকে কী খাবার দেওয়া হয়েছে—তার ওপরই ডিমের স্বাদ নির্ভর করে।
ডিমের আসল পুষ্টি আসলে কিসের ওপর নির্ভর করে?
ডিম কতটা পুষ্টিকর হবে তা খোসার রঙের ওপর নয়, বরং মুরগির খাবার ও পালন-পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে।
১. সূর্যের আলো ও উন্মুক্ত পরিবেশ: খাঁচায় না রেখে খোলা জায়গায় মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়ানো মুরগির ডিমে ভিটামিন ‘ডি’ অনেক বেশি থাকে।
২. বিশেষ খাবার: মুরগির খাবারে যদি তিসিবীজ বা ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ উপাদান মেশানো হয়, তবে সেই মুরগির ডিমে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ বাড়ে।
৩. ভিটামিনযুক্ত খাবার: ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার খেলে ডিমের পুষ্টিগুণও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
বাদামি ডিমের দাম বেশি কেন?
বাজারে সাধারণত দেখা যায় বাদামি বা লাল ডিমের দাম সাদা ডিমের চেয়ে কিছুটা বেশি। এর পেছনে পুষ্টির কোনো হাত নেই, বরং রয়েছে বাণিজ্যিক কারণ।
অতীতে বাদামি ডিম দেওয়া মুরগিগুলো আকারে অনেক বড় হতো। এগুলোকে লালন-পালন করতে বেশি খাবার লাগত এবং তারা তুলনামূলক কম ডিম দিত। ফলে লাল ডিম উৎপাদনে খরচ বেশি পড়ত বলে এর দামও বেশি রাখা হতো। বর্তমানে খামার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন হলেও, মানুষের ভুল ধারণা এবং অর্গানিক ডিম হিসেবে বাজারজাত করার কারণে এখনও বাদামি ডিমের দাম কিছুটা বেশি দেখা যায়।
ডিম কেনার সময় যেসব বিষয়ে নজর দিবেন
শুধু ডিমের খোসার রং না দেখে ডিম কেনার সময় নিচের দরকারি বিষয়গুলো খেয়াল রাখা উচিত:
- সতেজতা: ডিমের খোসা যাতে পরিষ্কার, ফাটলহীন ও অক্ষত থাকে সেদিকে খেয়াল রাখুন।
- সংরক্ষণ ব্যবস্থা: সঠিক তাপমাত্রায় এবং ঠান্ডা জায়গায় রাখা ডিম কেনা উচিত।
- মেয়াদ দেখে নিন: প্যাকেটজাত ডিম কেনার সময় অবশ্যই এর মেয়াদ এবং গুণগত মানের তথ্য দেখে নেবেন।
- মুরগির খাদ্যতালিকা: সম্ভব হলে অর্গানিক বা ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ ডিম বেছে নেওয়ার চেষ্টা করুন।
পরিশেষে বলা যায়, বাদামি ডিম মানেই বেশি পুষ্টিকর আর সাদা ডিম কম পুষ্টিকর এই ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। দুটি ডিমের পুষ্টিমূল্য প্রায় একই। তাই ডিমের বাইরের আবরণ বা রং না দেখে ডিম কতটা টাটকা এবং মুরগিটি কী পরিবেশে বড় হয়েছে সেটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।








