বিশ্বজুড়ে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা টিকটকের মতো বিদেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর আমাদের নির্ভরতা অনেক পুরোনো। কিন্তু এসব প্ল্যাটফর্মে নিজেদের মনের ভাব পুরোপুরি ফুটিয়ে তোলা, সঠিক রিচ পাওয়া কিংবা মনিটাইজেশন থেকে আয় করা সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের নিজস্ব একটি পরিচয় তৈরি করতে রংপুর থেকে যাত্রা শুরু করেছে দেশীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ফ্রিডার’ (Freeder)।
‘নিজেদের কণ্ঠ, নিজেদের প্ল্যাটফর্ম’ এই উদ্দীপনামূলক স্লোগানকে সামনে রেখে বাজারে আসা এই অ্যাপটি ইতোমধ্যে তথ্যপ্রযুক্তিপ্রেমী ও তরুণদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। মূলত এটি বাংলাদেশিদের নিজস্ব গল্প, খবর, স্বাধীন মতামত ও সৃজনশীলতা ফুটিয়ে তোলার একটি নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল মাধ্যম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা জেনে নেব দেশীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফ্রিডার কী, এটি কীভাবে কাজ করে এবং তরুণ কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য এতে কী কী সুবিধা থাকছে।
ফ্রিডার (Freeder) আসলে কী?
সহজ কথায়, ফ্রিডার হলো সম্পূর্ণ বাংলাদেশে তৈরি একটি সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং অ্যাপ বা প্ল্যাটফর্ম। এর মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের মানুষের অনুভূতি, সংস্কৃতি ও চিন্তাভাবনা নিজেদের মতো করে প্রকাশ করার সুযোগ করে দেওয়া।
উদ্যোক্তাদের মতে, ফ্রিডার শুধু আর দশটি সাধারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মতো ছবি বা ভিডিও শেয়ার করার অ্যাপ নয়। বরং এটি বাংলাদেশিদের সৃজনশীলতাকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার একটি উন্মুক্ত মঞ্চ। খবর প্রকাশ করা, মুক্ত মতামত দেওয়া এবং নিজেদের দৈনন্দিন জীবনের নানা গল্প ফুটিয়ে তোলার জন্য এতে রয়েছে বিশেষ সুবিধা।
১ হাজার ফলোয়ারেই আয়ের দারুণ সুযোগ!
ফ্রিডার প্ল্যাটফর্মটির সবচেয়ে বড় ও আকর্ষণীয় ফিচার হলো এর সহজ মনিটাইজেশন ব্যবস্থা।
বর্তমান সময়ে ফেসবুক বা ইউটিউবে কনটেন্ট তৈরি করে আয় করা বেশ কঠিন বিষয়। অনেক শর্ত পূরণ, হাজার হাজার ঘণ্টা ওয়াচটাইম এবং লাখ লাখ ভিউ না হলে মনিটাইজেশন পাওয়া যায় না। কিন্তু ফ্রিডার তরুণ প্রজন্ম ও নতুন কনটেন্ট নির্মাতাদের উৎসাহিত করতে এনেছে একদম ভিন্ন নিয়ম।
মনিটাইজেশনের শর্ত ও সুবিধা
- স্বল্প ফলোয়ারে সুযোগ: ফ্রিডারে মাত্র ১,০০০ (এক হাজার) ফলোয়ার পূর্ণ হলেই কনটেন্ট নির্মাতারা মনিটাইজেশনের জন্য আবেদন করতে পারবেন।
- দ্রুত আয়ের সম্ভাবনা: জনপ্রিয় হওয়ার জন্য ক্রিয়েটরদের আর বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে না। মানসম্মত কনটেন্ট বানিয়ে অল্প সংখ্যক অনুসারী নিয়েই তারা আয়ের সুযোগ পাবেন।
- নতুন ক্রিয়েটরদের জন্য আশীর্বাদ: যারা নতুন কাজ শুরু করছেন কিন্তু অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে সুযোগ পাচ্ছেন না, তাদের জন্য ফ্রিডার হতে পারে ঘুরে দাঁড়ানোর সেরা মাধ্যম।
রংপুর থেকে দেশ সেরা হওয়ার স্বপ্ন
সাধারণত যেকোনো বড় তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোগ বা স্টার্টআপ ঢাকা কেন্দ্রিক হয়ে থাকে। তবে ‘ফ্রিডার’-এর ব্যতিক্রমী দিক হলো এর যাত্রা শুরু হয়েছে রংপুরের মাটি থেকে। মফস্বলের তরুণ উদ্যোক্তাদের এই সাহসী পদক্ষেপ দেশের আইটি খাতকে এক নতুন বার্তাই দিচ্ছে ইচ্ছা আর প্রযুক্তিজ্ঞান থাকলে প্রান্তিক অঞ্চল থেকেও বৈশ্বিক মানের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা সম্ভব।
রংপুরের মাটি থেকে শুরু হওয়া এই দেশীয় উদ্যোগ পুরো বাংলাদেশে কতটা সাড়া ফেলতে পারে এবং তরুণদের মনে কতটুকু জায়গা করে নিতে পারে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
কেন ব্যবহার করবেন দেশীয় এই সোশ্যাল মিডিয়া?
আমাদের স্মার্টফোনে ফেসবুক বা অন্যান্য অ্যাপ থাকা সত্ত্বেও ফ্রিডার ব্যবহারের মূল কারণগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. নিজের দেশের প্ল্যাটফর্ম: বিদেশি অ্যাপগুলোর অ্যালগরিদমের ওপর নির্ভর না করে দেশের মানুষের তৈরি অ্যাপ ব্যবহারে দেশীয় অর্থনীতি ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত শক্তিশালী হবে।
২. তথ্য নিরাপত্তা ও স্বকীয়তা: দেশীয় ব্যবহারকারীদের তথ্যের সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশি কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে এই প্ল্যাটফর্ম।
৩. সহজ কনটেন্ট পলিসি: নিজেদের মতামত প্রকাশে নিরপেক্ষ ও স্বাধীন পরিবেশ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
৪. নতুনদের মূল্যায়ন: ছোট ও নতুন কনটেন্ট ক্রিয়েটররা এখানে তুলনামূলক দ্রুত পরিচিতি ও রিচ পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
কীভাবে যুক্ত হবেন ফ্রিডারে?
ফ্রিডার ব্যবহারে যুক্ত হওয়া অত্যন্ত সহজ। স্মার্টফোনের অ্যাপ স্টোর থেকে অ্যাপটি ডাউনলোড করে আপনার মোবাইল নম্বর বা ইমেইল দিয়ে সহজেই একটি অ্যাকাউন্ট তৈরি করে নিতে পারেন। এরপর আপনার ছবি, পছন্দ ও তথ্য দিয়ে প্রোফাইল সাজিয়েই প্রকাশ করতে পারেন আপনার প্রথম পোস্ট!
যেকোনো দেশীয় উদ্যোগ সফল হওয়া নির্ভর করে দেশের সাধারণ মানুষের ভালোবাসার ওপর। ভারতের নিজস্ব অনেক জনপ্রিয় অ্যাপ যেমন সফল হয়েছে, ঠিক তেমনি সঠিক পথচলা ও মানসম্মত ফিচার বজায় রাখতে পারলে ফ্রিডারও আমাদের জাতীয় গর্বে পরিণত হতে পারে। প্রযুক্তির দুনিয়ায় বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করতে এবং নিজেদের কণ্ঠ বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দিতে ফ্রিডারের এই উদ্যোগকে সুস্বাগতম।








