গ্রীষ্ম কিংবা বর্ষা আমাদের দেশে এই রোদ এই বৃষ্টির লুকোচুরি খেলা বারো মাসের গল্প। তবে যখন আকাশ কালো করে ঝুম বৃষ্টি নামে, তখন নাগরিক জীবনের ব্যস্ততা যেন কিছুটা থমকে দাঁড়ায়। এই রিমঝিম বৃষ্টির দিনে ঘরের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতে কার না ভালো লাগে! আর এই রকম চমৎকার মেঘলা আবহাওয়ায় যদি সাথে থাকে ধোঁয়া ওঠা গরম গরম উপাদেয় কিছু খাবার, তবে তো কথাই নেই। ভালো লাগার সাথে যোগ হয় জিভে জল আনা এক ভিন্ন স্বাদ।
বাঙালি আর খাওয়া-দাওয়া যেন একই সুতোয় গাঁথা, আর বৃষ্টির দিন হলে তো ভোজনরসিকদের আনন্দের কোনো সীমাই থাকে না। ঘরে বসে ঝুম বৃষ্টি উপভোগ করার পাশাপাশি তৃপ্তি ও স্বাদের কথা মাথায় রেখে এই দিনে আপনি কোন কোন মজাদার খাবার খেতে পারেন, তা নিয়েই আমাদের আজকের এই বিশেষ আয়োজন।
১. ঐতিহ্যবাহী ভুনা খিচুড়ি ও মাংসের কষা ভুনা
মেঘ-বৃষ্টির দিনগুলোতে খিচুড়ি ছাড়া কি বাঙালি জীবন চলে? বর্ষার এই সময়ে বৃষ্টির শব্দের সাথে গরম খিচুড়ির সুবাস যেন এক স্বর্গীয় অনুভূতি। বৃষ্টির দিনে পেট ও মন দুই-ই ভালো রাখতে চাল ও মুগ ডালের সংমিশ্রণে তৈরি ধোঁয়া ওঠা ভুনা খিচুড়ি সবচেয়ে সেরা পছন্দ।
খিচুড়ির সাথে যদি থাকে মুচমুচে বেগুন ভাজা, ডিম ভাজি কিংবা গরুর মাংসের কষা ভুনা, তবে পুরো আয়োজনটাই জমে ক্ষীর! ঘরে যদি গরুর মাংস না থাকে, তবে ডিম ভাজি বা নানা পদের ভর্তা দিয়েও নরম খিচুড়ি বা সবজি দিয়ে নিরামিষ খিচুড়ি রান্না করে নিতে পারেন। আর ফ্রিজে যদি থাকে ইলিশ মাছ, তবে তো কথাই নেই—ঝুম বৃষ্টির দিনে ইলিশ-খিচুড়ির কোনো তুলনা হয় না।
২. ধোঁয়া ওঠা চা, কফি ও ঝালমুড়ি
ঝুম বৃষ্টিতে জানালার পাশে বসে এক মগ ধোঁয়া ওঠা হট কফি বা আদা-তুলসী চা আপনার শরীরে এনে দেবে এক চনমনে ভাব। বৃষ্টির দিনে ভাপ ওঠা এক কাপ চা কিংবা কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে গল্পের বই পড়া কিংবা পুরোনো দিনের কিছু বাংলা গান শোনার মুহূর্তটা সত্যিই অসাধারণ।
অনেকে আবার চায়ের সাথে গরম শিঙাড়া খেতে ভীষণ পছন্দ করেন। তবে কাঁচামরিচ, পেঁয়াজ আর খাঁটি সরিষার তেলে মাখানো ঝালমুড়ি ও চানাচুর কিন্তু বৃষ্টি বিলাসের চিরন্তন সঙ্গী। চা বা কফিতে রয়েছে প্রচুর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা বৃষ্টির এই স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় শরীরকে সতেজ রাখে। তাই মোবাইল-ফেসবুক অফ করে প্রিয়জনের সাথে বসে বৃষ্টি দেখতে দেখতে চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার সময়টা হাতছাড়া করবেন না।
৩. ঝটপট গরম নুডলস
রিমঝিম বৃষ্টিতে চারপাশের আবহাওয়া যখন কিছুটা ঠান্ডা হয়ে আসে, তখন মন প্রাকৃতিকভাবেই একটু ঝাল ও গরম কিছু খেতে চায়। স্বাদের এই ভিন্নতা আনতে বৃষ্টির দিনে খুব ঝটপট রান্না করে ফেলতে পারেন নুডলস।
বৃষ্টির দিনে শুকনো নুডলসের চেয়ে ধোঁয়া ওঠা ঝোল করা নুডলস বা সুপি নুডলস বেশি ভালো লাগে। নুডলসের সাথে ডিম, কুচানো পেঁয়াজ, টমেটো আর এক মুঠো তাজা ধনেপাতা মিশিয়ে দিলে এর স্বাদ যেমন বাড়ে, ঠিক তেমনি গন্ধটাও হয় জিভে পানি আনার মতো। নুডলস যেহেতু খুব কম সময়ে তৈরি করা যায়, তাই এই অলস আবহাওয়ায় এটি পেটের জন্য যেমন হালকা, তেমনি মুখের জন্যও দারুণ সুস্বাদু।
৪. পুষ্টিগুণে ভরপুর হালকা স্যুপ
বৃষ্টির শীতল দিনে শরীরকে কিছুটা উষ্ণতা জোগাতে এক বাটি পুষ্টিকর স্যুপ হতে পারে আপনার সেরা সঙ্গী। গরম গরম চিকেন বা ভেজিটেবল স্যুপ শরীরকে তাৎক্ষণিক আরাম দেয়।
বর্ষার এই সময়ে ঘরে ঘরে সর্দি-কাশি বা ফ্লুর প্রকোপ দেখা দেয়। নিজেকে এসব রোগবালাই থেকে দূরে রাখতে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে মাশরুম, সবজি বা মুরগির মাংস দিয়ে ঝটপট হেলদি স্যুপ তৈরি করে নিতে পারেন। এটি যেমন আপনাকে উষ্ণ রাখবে, তেমনি বৃষ্টির দিনে মুখরোচক নাশতা হিসেবেও দারুণ কাজ করবে।
৫. মুচমুচে পাকোড়া ও পপকর্ন
ঝুম বৃষ্টির দিনে বিকেলের নাশতায় মুচমুচে পাকোড়ার চেয়ে সুস্বাদু আর কী হতে পারে? পেঁয়াজু, আলুর চপ বা সবজি পাকোড়ার সাথে একটু টমেটো কেচআপ আর পুদিনা পাতার চাটনি হলে তো আর কিছুই লাগে না। আর পাকোড়া খাওয়ার পর যদি এক কাপ গরম চা পাওয়া যায়, সেটা তো একদম বোনাস পাওনা!
এ ছাড়া যারা হালকা কিছু খেতে চান, তাদের জন্য পপকর্ন হতে পারে সময় কাটানোর চমৎকার মাধ্যম। সিনেমা দেখতে দেখতে বা পরিবারের সবার সাথে আড্ডা দিতে দিতে পপকর্ন খাওয়া তরুণ প্রজন্মের কাছে বেশ জনপ্রিয়। ভুট্টা থেকে তৈরি এই পপকর্নে প্রচুর পরিমাণে আঁশ বা ফাইবার থাকে, যা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। পাশাপাশি এতে আছে নানা ধরনের ভিটামিন ও খনিজ উপাদান।
মিষ্টিমুখে বর্ষা উদযাপন
ঝুম বৃষ্টির শেষে বা সন্ধ্যার দিকে একটু মিষ্টিমুখ না হলে কি চলে? গরম গরম জিলাপি কিংবা সুজি ও গাজরের হালুয়া হতে পারে রিমঝিম বৃষ্টিতে বিকেলের ভোজ শেষ করার দারুণ এক উপায়।
তবে একটি বিষয় সবসময় মাথায় রাখা জরুরি যতই বৃষ্টি হোক না কেন, রাস্তার খোলা বা বাসি খাবার সবসময় এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন। সুস্থ থাকতে ঘরে তৈরি তাজা ও গরম খাবার খাওয়ার অভ্যাস করুন। আর এই আবহাওয়ায় সর্দি-কাশি থেকে বাঁচতে আদা, হলুদ ও গোলমরিচ দিয়ে চা অথবা কুসুম গরম পানি পান করুন। সুস্থ থাকুন, নিরাপদে থাকুন আর উপভোগ করুন চমৎকার এই বর্ষার দিন!








