আজকাল ফিটনেস ও সুস্থ জীবনযাপনের একটি বড় ট্রেন্ড হয়ে উঠেছে টানা ২৪ ঘণ্টা না খেয়ে থাকা বা উপবাস করা। অনেকেই বিশ্বাস করেন, এই পদ্ধতির মাধ্যমে শরীরকে নতুন করে সতেজ করা, দ্রুত ওজন কমানো এবং মেটাবলিজম বা বিপাকীয় স্বাস্থ্য উন্নত করা সম্ভব।
কিন্তু আমরা যখন দীর্ঘ সময় খাবার থেকে দূরে থাকি, তখন শরীরের ভেতরে অভ্যন্তরীণ অনেক বড় বড় পরিবর্তন ঘটে। বিশেষ করে রক্তে শর্করার মাত্রা বা ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণ এবং শক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে শরীর সম্পূর্ণ নতুন এক পদ্ধতি বেছে নেয়। চলুন জেনে নেওয়া যাক, একটানা ২৪ ঘণ্টা না খেয়ে থাকলে আমাদের শরীরে ঠিক কী ঘটে।
শক্তি পাওয়ার পদ্ধতি যেভাবে বদলে যায়
আমরা যখন নিয়মিত খাবার খাই, শরীর সেই খাবার হজম করে সরাসরি গ্লুকোজ বা শর্করা থেকে শক্তি পায়। কিন্তু খাবার খাওয়া বন্ধ করে দিলে শরীর ধীরে ধীরে তার শক্তি পাওয়ার উৎস ও পদ্ধতি পরিবর্তন করতে শুরু করে।
এই প্রক্রিয়ায় শরীরে যা যা ঘটে:
- গ্লাইকোজেনের ব্যবহার: খাবার হজম হয়ে যাওয়ার পর রক্তে শর্করার মাত্রা কমতে থাকে। তখন শরীর রক্তে সুগারের স্বাভাবিক মাত্রা বজায় রাখতে লিভারে জমা থাকা ‘গ্লাইকোজেন’ নামক গ্লুকোজ ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদন করে।
- চর্বি গলে কিটোন তৈরি: লিভারের গ্লাইকোজেন শেষ হয়ে গেলে শরীর শক্তির জন্য জমা থাকা চর্বি বা ফ্যাট পোড়াতে শুরু করে। এই চর্বি ভেঙে লিভারে ‘কিটোন’ নামক এক ধরনের পদার্থ তৈরি হয়, যা শরীরে জ্বালানি হিসেবে কাজ করে।
- হরমোনের পরিবর্তন: এই সময়ে শরীরকে সচল রাখতে এবং জমানো শক্তি মুক্ত করতে ‘গ্লুকাগন’ নামক হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায় এবং ইনসুলিনের মাত্রা অনেকটাই কমে যায়।
প্রাথমিক কিছু শারীরিক সমস্যা বা উপসর্গ
একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীর এই পরিবর্তনগুলোর সাথে সহজেই মানিয়ে নিতে পারে। তবে যারা প্রথম প্রথম বা হুট করে এই অভ্যাস শুরু করেন, তারা বেশ কিছু হালকা সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন। যেমন: ১. তীব্র ক্ষুধা লাগা ও শরীর হালকা দুর্বল হওয়া ২. ক্লান্তি ও মনোযোগের অভাব ৩. মাথাব্যথা বা মাথা ঘোরানো ৪. মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া বা বিরক্তি বোধ করা।
সবার জন্য কি ২৪ ঘণ্টা না খেয়ে থাকা নিরাপদ?
সাধারণত বেশিরভাগ সুস্থ মানুষের জন্য একটানা ২৪ ঘণ্টা না খেয়ে থাকা বিপজ্জনক নয়। কারণ আমাদের লিভার বা যকৃত শরীর সচল রাখতে ক্রমাগত রক্তে গ্লুকোজ সরবরাহ করতে পারে। তবে সবার শারীরিক গঠন এক নয়। কিছু নির্দিষ্ট মানুষের জন্য এই অভ্যাস মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
যাদের জন্য দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকা বিপজ্জনক:
- ডায়াবেটিস রোগী: বিশেষ করে যারা নিয়মিত ইনসুলিন নেন বা রক্তে শর্করা কমানোর ওষুধ খান।
- গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মা: এই সময়ে মা ও শিশুর অতিরিক্ত পুষ্টির প্রয়োজন হয়।
- শিশু এবং দুর্বল বয়স্ক ব্যক্তি: এদের শরীরে জমানো শক্তির পরিমাণ কম থাকে।
- কম ওজনের মানুষ: যাদের ওজন এমনিতেই কম, তাদের জন্য এটি ক্ষতিকর।
এই ধরনের ব্যক্তিরা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে হাইপোগ্লাইসেমিয়া (রক্তে শর্করার মাত্রা অতিরিক্ত কমে যাওয়া), ডিহাইড্রেশন বা শরীরের পানি শূন্যতাসহ নানা জটিলতায় পড়তে পারেন।
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উপবাসের উপকারিতা ও ঝুঁকি
২০২৩ সালে ‘ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন’ (NCBI)-এ প্রকাশিত “ফিজিওলজি, ফাস্টিং” শিরোনামের একটি গবেষণায় উপবাসের বেশ কিছু চমকপ্রদ দিক উঠে এসেছে।
প্রধান উপকারিতাসমূহ:
- ইনসুলিন সংবেদনশীলতার উন্নতি: এটি শরীরকে মেটাবলিক সিনড্রোম এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিস থেকে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে।
- ওজন ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ: এই পদ্ধতি শরীরের বাড়তি চর্বি বা ফ্যাট কমাতে দারুণ কার্যকরী। একই সাথে এটি রক্তচাপ কমাতে এবং ক্ষতিকর লিপিড বা চর্বি হ্রাস করতে সাহায্য করে।
- ব্রেইনের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি: প্রাণীদের ওপর করা গবেষণায় দেখা গেছে, এই অভ্যাস আলঝেইমার এবং পারকিনসনের মতো মারাত্মক স্নায়বিক বা ব্রেইনের রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি ও সতর্কতা
উপবাসের যেমন উপকারিতা আছে, তেমনি এর কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে যে মাথাব্যথা হয়, তা মূলত ক্যাফেইন (চা-কফি) না খাওয়া, ডিহাইড্রেশন বা হাইপোগ্লাইসেমিয়ার কারণে হতে পারে।
তবে দীর্ঘ সময় বা ঘন ঘন না খেয়ে থাকলে শরীরে ‘কর্টিসেল’-এর মতো স্ট্রেস হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায়। এর ফলে শরীরের পেশী ক্ষয় (Muscle Loss) হতে পারে এবং উল্টো ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
২৪ ঘণ্টা না খেয়ে থাকার এই লাইফস্টাইলটি ওজন কমাতে বা শরীর ডিটক্স করতে সাহায্য করলেও, এটি সবার জন্য সমান নিরাপদ নয়। বিশেষ করে শিশু, কম ওজনের মানুষ এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে এর নিরাপত্তা নিয়ে এখনো পর্যাপ্ত তথ্য নেই। তাই এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদী উপবাস বা ডায়েট প্ল্যান শুরু করার আগে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।








