পবিত্র ঈদুল আজহা আমাদের দ্বারে কড়া নাড়ছে। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে পশু জবেহ করার এই মহান ইবাদতকে কেন্দ্র করে মুসলিম উম্মাহর মাঝে বিরাজ করছে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা। আমাদের দেশে সাধারণত গরু, মহিষ বা উটের মতো বড় পশূগুলোতে একাধিক ব্যক্তি শরিক বা অংশীদার হয়ে কুরবানি দিয়ে থাকেন। কিন্তু শরিকানা কুরবানির ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন প্রায়ই আমাদের মনে উঁকি দেয় যদি কুরবানির কোনো শরিক মাদকসেবী হন কিংবা মাদকের ব্যবসার সাথে জড়িত থাকেন, তবে কি অন্য শরিকদের কুরবানি কবুল হবে?
ইসলাম একদিকে যেমন সমাজ থেকে মাদক দূর করার জন্য কঠোর নির্দেশ দিয়েছে, অন্যদিকে ইবাদত কবুল হওয়ার জন্যও কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম নির্ধারণ করে দিয়েছে। তাই এই বিষয়ে কোনো মনগড়া বা আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত না নিয়ে, পবিত্র কুরআন, হাদিস এবং ফিকহ শাস্ত্রের আলোকে সঠিক বিধানটি জানা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
মাদক ও হারাম উপার্জনের বিষয়ে ইসলামের কঠোর অবস্থান
ইসলামি শরিয়তে মাদক সেবন এবং এর ব্যবসা করা পুরোপুরি হারাম বা নিষিদ্ধ। মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন:
“হে মুমিনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমা ও ভাগ্য নির্ধারণের শরসমূহ শয়তানের অপবিত্র কাজ। অতএব এগুলো থেকে দূরে থাকো।” (সুরা আল-মায়িদাহ: আয়াত ৯০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) মাদক ও এর সাথে জড়িত ব্যক্তিদের ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন:
“প্রত্যেক নেশাজাতীয় বস্তু হারাম।” (সহিহ মুসলিম)
অন্য একটি হাদিসে এসেছে, আল্লাহর রাসুল (সা.) মদের সাথে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে জড়িত দশ শ্রেণির মানুষের ওপর অভিশাপ বা লানত দিয়েছেন। এর মধ্যে মদ তৈরি করা, বিক্রি করা, এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বহন করা এবং তা পান করা সবই অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং, ইসলামের দৃষ্টিতে মাদক ব্যবসা বা মাদক সেবন করা অনেক বড় একটি কবিরা গুনাহ।
মাদকসেবী বা মাদক কারবারির সাথে শরিকে কুরবানি: ফিকহবিদদের মতামত
ইসলামি ফিকহ বা আইনশাস্ত্রের আলোতে এই বিষয়টিকে দুটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। মাদকসেবী বা প্রকাশ্য গুনাহগার ব্যক্তির সাথে শরিক হলে কুরবানি সহিহ হবে কি না, তা মূলত নির্ভর করে তার আয়ের উৎস এবং নিয়তের ওপর।
১. যখন কুরবানি সহিহ বা বৈধ হবে
যদি কোনো ব্যক্তি ব্যক্তিগত জীবনে মাদকাসক্ত বা অন্য কোনো বড় গুনাহে লিপ্ত থাকেন, কিন্তু তিনি একজন মুসলমান এবং কুরবানি করার সঠিক নিয়ত রাখেন, তবে তার এই ব্যক্তিগত পাপের কারণে অন্য শরিকদের কুরবানি বাতিল হবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওই ব্যক্তির কুরবানির টাকা যদি হালাল বা বৈধ উপার্জনের হয়, তবে তার সাথে শরিকে কুরবানি করলে সাধারণভাবে সবার কুরবানিই সহিহ হয়ে যাবে। অর্থাৎ, তার পাপের দায়ভার সম্পূর্ণ তার নিজের, এর জন্য অন্য শরিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না।
২. যখন কুরবানি পুরোপুরি বাতিল বা নষ্ট হয়ে যাবে
এখানেই রয়েছে সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা। যদি কোনো মাদক কারবারি বা প্রকাশ্য ফাসেক ব্যক্তির আয়ের একমাত্র উৎস হয় হারাম পথ, যেমন— মাদক ব্যবসা, সুদ, ঘুষ কিংবা চাঁদাবাজি এবং তিনি যদি সেই হারামের টাকা দিয়ে কুরবানির শরিক হন, তবে পুরো কুরবানিটিই বাতিল হয়ে যাবে।
যে পশুর মধ্যে সাতজন শরিক আছেন, তাদের মধ্যে মাত্র একজন শরিকের টাকাও যদি সম্পূর্ণ হারাম উৎস থেকে আসে, তবে বাকি ছয়জনের হালাল টাকা থাকা সত্ত্বেও কারো কুরবানিই আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। এর কারণ হলো, কুরবানি একটি একক ইবাদত এবং এর কোনো একটি অংশ অপবিত্র হলে পুরো ইবাদতটিই নষ্ট হয়ে যায়। এই প্রসঙ্গে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন:
“নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি কেবল পবিত্র জিনিসই গ্রহণ করেন।” (সহিহ মুসলিম)
কাদের সাথে শরিকে কুরবানি করা থেকে বিরত থাকা উচিত?
কুরবানি যেহেতু একটি মহান আর্থিক ও শারীরিক ইবাদত, তাই এর পবিত্রতা রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। সমাজে ইবাদতের সঠিক মর্যাদা বজায় রাখতে এবং কোনো রকম সন্দেহের অবকাশ না রাখতে নিম্নোক্ত ব্যক্তিদের সাথে শরিকে কুরবানি না করাই উত্তম:
- প্রকাশ্য মাদক ব্যবসায়ী: যাদের আয়ের মূল উৎসই হলো যুবসমাজকে ধ্বংসকারী মাদকের কারবার।
- হারাম আয়ের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তি: যারা সুদ, ঘুষ, জুয়া বা জবরদখলের টাকার ওপর জীবন যাপন করেন।
- শুধুমাত্র গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্যে শরিক হওয়া ব্যক্তি: যাদের মনে আল্লাহর সন্তুষ্টির কোনো নিয়ত নেই, বরং লোক দেখানো বা কেবল গোশত খাওয়াই একমাত্র লক্ষ্য।
- দ্বীনের মৌলিক বিধান নিয়ে উপহাসকারী: যারা ইসলামের প্রধান বিধানগুলোকে অবজ্ঞা বা উপহাস করে।
ইসলামিক স্কলারদের মতে, এসব মানুষের সাথে শরিক হলে কুরবানি যদি কোনোভাবে সহিহ-ও হয়ে যায়, তাও তা ইবাদতের গাম্ভীর্য ও মর্যাদা নষ্ট করে এবং সমাজে একটি নেতিবাচক বার্তা দেয়।
শেষ কথা: তাকওয়া ও হালাল উপার্জনের গুরুত্ব
সংক্ষেপে বলতে গেলে, কোনো মাদকসেবী বা গুনাহগার ব্যক্তি যদি মুসলমান হন, সঠিক নিয়ত রাখেন এবং তার কুরবানির টাকা হালাল উপার্জনের হয়, তবে তার সাথে কুরবানি করলে অন্য সবার কুরবানি সহিহ হয়ে যাবে। কিন্তু তার টাকা যদি মাদক ব্যবসা বা অন্য কোনো হারাম আয়ের হয়, তবে কারো কুরবানিই হবে না।
তাই যেকোনো ধরনের ঝুঁকি ও সন্দেহ থেকে বাঁচতে সবসময় সৎ, দ্বীনদার এবং তাকওয়াবান মানুষের সাথে শরিকে কুরবানি করাই সবচেয়ে নিরাপদ ও সর্বোত্তম পন্থা। মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে হালাল উপার্জন, পবিত্র নিয়ত এবং সঠিক বুঝের সাথে কুরবানি আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।








