বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি, মাটির স্বাস্থ্য উন্নত করা এবং পরিবেশবান্ধব জৈব সবুজ সার উৎপাদনের লক্ষ্যে এক প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)। খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার বোয়ালিয়া বীজ উৎপাদন খামারে এবার ৬৫ একর জমিতে ধঞ্চে (Sesbania) চাষ করা হয়েছে। এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চলের মাটির কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা এবং রাসায়নিক সারের ওপর কৃষকদের নির্ভরশীলতা অনেকাংশে কমিয়ে আনা।
মাটির প্রাণ ফেরাতে ‘সবুজ সার’ ধঞ্চে
কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, ধঞ্চে একটি অত্যন্ত কার্যকরী সবুজ সার ফসল হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। একই জমিতে বারবার বিভিন্ন ফসলের চাষ করার ফলে মাটির স্বাভাবিক পুষ্টিগুণ ও জীবনীশক্তি কমে যায়। কিন্তু কচি ধঞ্চে গাছ চাষ করে তা আবার লাঙল দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিলে মাটির হারানো শক্তি দ্রুত ফিরে আসে।
এই খামারে মূলত ভিয়েতনামী জাতের ধঞ্চে চাষ করা হচ্ছে, যার শিকড়, কাণ্ড এবং পাতার নিচের অংশে ছোট দানার মতো গুটি বা নোডিউল দেখা যায়। এই গুটিগুলো বাতাস থেকে প্রাকৃতিকভাবে নাইট্রোজেন টেনে নিয়ে গাছের মধ্যে জমা করে। ফলে এই ধঞ্চে গাছ মাটির সাথে মিশিয়ে দিলে জমিতে আর বাড়তি ইউরিয়া সার ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে না।
এক নজরে ধঞ্চে চাষ প্রকল্পের বিবরণ
| উদ্যোগী প্রতিষ্ঠান | বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) HTML |
| প্রকল্পের স্থান | বোয়ালিয়া বীজ উৎপাদন খামার, পাইকগাছা, খুলনা |
| চাষের মোট পরিমাণ | ৬৫ একর জমি |
| ধঞ্চের জাত | ভিয়েতনামী জাত |
| মূল লক্ষ্য | উপকূলীয় মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি ও ইউরিয়া সারের ব্যবহার কমানো |
| গাছ মাটিতে মেশানোর সময় | দেড় থেকে পৌনে দুই মাস বয়স (উচ্চতা ৩-৪ ফুট হলে) |
চাষের নিয়ম ও মাটির গুণগত পরিবর্তন
বোয়ালিয়া বীজ উৎপাদন খামার সূত্র জানায়, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা ও জৈব সার তৈরির জন্য প্রতি বছরই এখানে ধঞ্চে চাষ করা হয়। পূর্ববর্তী বছরগুলোর মতো এবারও বর্ষাকালের শুরুতে ধঞ্চের বীজ বপন করা হয়েছিল, যাতে এটি বৃষ্টির পানিতে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে।
গাছগুলোর বয়স যখন দেড় থেকে পৌনে দুই মাস হয় এবং উচ্চতা ৩ থেকে ৪ ফুট পর্যন্ত পৌঁছায়, তখন এগুলোকে লাঙল দিয়ে চাষ করে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়। ধঞ্চের সবুজ পাতা ও কাণ্ড মাটিতে পচে গিয়ে প্রচুর পরিমাণে জৈব পদার্থ তৈরি করে। এটি মাটির ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক গঠন উন্নত করে এবং মাটিতে নাইট্রোজেন ধরে রেখে ভবিষ্যতের ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করে।
টেকসই কৃষি ও উৎপাদন খরচ হ্রাসের বড় সুযোগ
বোয়ালিয়া বীজ উৎপাদন খামারের সিনিয়র সহকারী পরিচালক ও কৃষিবিদ নাহিদুল ইসলাম মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে ধঞ্চের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “মাটিতে জৈব পদার্থ বাড়েতে ধঞ্চের কোনো বিকল্প নেই।” “এই ফসলটি মাটির সাথে মিশিয়ে দিলে জমির উর্বরতা যেমন বাড়ে, তেমনি রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের প্রয়োজন কমে যায়।”
তিনি আরও জানান যে, এই সবুজ সারের কারণে ফসলের রোগবালাই ও পোকার আক্রমণ অনেকটাই কমে যায়, যা কৃষকদের ফসল উৎপাদন খরচ কমাতে সরাসরি সাহায্য করে। বিএডিসি’র তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই ৬৫ একরের ধঞ্চে চাষ কর্মসূচি উপকূলীয় লবণাক্ত মাটির গুণগত মান উন্নত করার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত টেকসই ও পরিবেশবান্ধব সমাধান হিসেবে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।








