ঈদের আনন্দ আর কুরবানির আমেজ ঢাকাবাসীর মনে এখনো সতেজ। তবে এই উৎসবের পরপরই ঢাকার রাস্তায় জমে থাকা কুরবানির পশুর বর্জ্য এবং আসন্ন বর্ষায় ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ। এই উদ্বেগের মাঝেই দেশের জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় এক যুগান্তকারী ও কঠোর পদক্ষেপ নিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিজে সশরীরে তদারকি করতে কোনো রকম পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই রাস্তায় নেমে পড়েন তিনি। ঢাকার রাস্তাঘাটের প্রকৃত চিত্র দেখার পর, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকার সব ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে চূড়ান্ত সময়সীমা বা ডেডলাইন বেঁধে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
নিজেই গাড়ি চালিয়ে ঢাকা পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
গত শুক্রবার, ঈদের দ্বিতীয় দিনে এক নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী হলো ঢাকাবাসী। রাজধানীর কুরবানির বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম ঠিকঠাক চলছে কি না, তা সরাসরি দেখার জন্য বিকাল ৪টার দিকে প্রধানমন্ত্রী নিজেই গাড়ি চালিয়ে গুলশানের বাসা থেকে বের হন। প্রধানমন্ত্রীর সাথে গাড়িতে ছিলেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমসহ মাত্র কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।
প্রধানমন্ত্রীর এই ঝটিকা সফরের বিষয়ে আগে থেকে কর্মকর্তাদের কোনো পূর্বধারণা ছিল না। প্রধানমন্ত্রী নিজেই স্টেয়ারিং হাতে নিয়ে গুলশান, হাতিরঝিল, রামপুরা, মালিবাগ, বাসাবো, কমলাপুর, সায়দাবাদ, যাত্রাবাড়ী, ধোলাইখাল, গুলিস্তান, শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, নিউ মার্কেট, ধানমন্ডি, ফার্মগেট, বিজয় সরণি ও মহাখালীসহ ঢাকার প্রায় প্রতিটি প্রধান সড়ক ও অলিগলি ঘুরে দেখেন। সাধারণ নাগরিকের মতো ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে গাড়ি থামিয়ে তিনি শহরের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।
বর্জ্য অপসারণ ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যর্থতার দায়ে দুই কর্মকর্তা বরখাস্ত
সরেজমিনে পরিদর্শনের সময় রাজধানীর বেশিরভাগ এলাকায় কুরবানির বর্জ্য অপসারণের কাজ চললেও, কিছু কিছু জায়গায় দায়িত্বে চরম অবহেলার চিত্র দেখতে পান প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে হাতিরপুল, এলিফ্যান্ট রোড, গ্রিনরোড, ফার্মগেট এবং কারওয়ানবাজার এলাকায় রাস্তায় ময়লার স্তূপ জমে থাকতে দেখে তিনি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
সামান্য বৃষ্টির পানিতে এই বর্জ্য মিশে ডেঙ্গু মশার প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে এমন জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে দায়িত্বহীনতার দায়ে দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করার নির্দেশ দেন। বরখাস্তকৃত এই কর্মকর্তাদের অবিলম্বে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
কর্মকর্তাদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কড়া বার্তা: ৪৮ ঘণ্টার ডেডলাইন
স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, প্রধানমন্ত্রী ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এবং প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন।
“আগামী ৩০ ও ৩১ মে (শনিবার ও রোববার) এই ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকার প্রতিটি কোণ থেকে কুরবানির পশুর সব ময়লা-আবর্জনা সম্পূর্ণ পরিষ্কার করতে হবে। একই সাথে পানি নিষ্কাশনের পথগুলো সচল করে ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশা নিধনের কার্যকর ওষুধ ছিটানোর ব্যবস্থা করতে হবে।” প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, এই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যদি ঢাকার বর্জ্য অপসারণ ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে দৃশ্যমান এবং সন্তোষজনক পরিবর্তন না আসে, তবে সংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বর্ষার আগে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জিরো টলারেন্স
সামনে বর্ষা মৌসুম, আর এই সময়ে ঢাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ মারাত্মক রূপ নেয়। কুরবানির পশুর বর্জ্য যদি সময়মতো ও সঠিকভাবে পরিষ্কার করা না হয়, তবে বৃষ্টির পানি জমে সেখানে এডিস মশার লার্ভা জন্মাবে। এতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
জনস্বাস্থ্যের এই বিশাল ঝুঁকি মাথায় রেখে প্রধানমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, জনগণের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে কোনো ধরনের শিথিলতা বা অবহেলা সহ্য করা হবে না। সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের মাঠ পর্যায়ে নেমে কাজ করার এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রতিটি ওয়ার্ডে চিরুনি অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সফল পরিচ্ছন্নতায় জনগণের দায়িত্ব ও সচেতনতা
কেবল সরকারের কঠোর নির্দেশনা বা সিটি করপোরেশনের কর্মীদের দিয়ে পুরো ঢাকা শহরকে রাতারাতি ডেঙ্গুমুক্ত বা পরিচ্ছন্ন করা সম্ভব নয়। এই কার্যক্রমে সাধারণ নাগরিকদের সচেতনতা ও সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।
নাগরিক হিসেবে আমাদের করণীয়
- আপনার বাড়ির আশেপাশে কোথাও কুরবানির বর্জ্য বা রক্ত জমে থাকলে তা দ্রুত পানি ও ব্লিচিং পাউডার দিয়ে পরিষ্কার করুন।
- বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, টায়ার বা ভাঙা প্লাস্টিকের পাত্রে যেন ৩ দিনের বেশি পানি জমে না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
- সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাজে সহযোগিতা করুন এবং নির্ধারিত স্থানে ময়লা ফেলুন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই ঝটিকা সফর এবং বর্জ্য অপসারণ ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেশের সাধারণ মানুষের মনে আশার আলো জাগিয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। এখন দেখার বিষয়, প্রধানমন্ত্রীর এই কড়া নির্দেশনার পর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রাজধানীকে কতটা পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ করতে পারে। জনস্বার্থে এই পরিচ্ছন্নতা অভিযান সফল হওয়া এখন সময়ের দাবি।








