বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারী, বিভিন্ন দেশের সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নিজেদের অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। মার্কিন ডলার ও যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন আর্থিক ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের আধিপত্য নিয়ে এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে সংশয় ও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশাল অঙ্কের ঋণের বোঝা, পররাষ্ট্রনীতিতে অর্থনীতিক নিষেধাজ্ঞার অতিরিক্ত প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এই ভয় বাড়ছে।
রিজার্ভে কেন কমছে মার্কিন ডলারের অংশ?
দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলার প্রধান মুদ্রা হিসেবে কাজ করলেও আন্তর্জাতিক রিজার্ভে এর প্রভাব একটু একটু করে হ্রাস পাচ্ছে:
- রিজার্ভের হিসেব: ২০১৫ সালে বিশ্বের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মোট গচ্ছিত রিজার্ভের প্রায় ৬৪ শতাংশ ছিল ডলারে, যা কমতে কমতে বর্তমানে ৫৬ শতাংশে এসে নেমেছে।
- ডলারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার: আর্থিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে কোনো কোনো দেশকে কোণঠাসা করার নীতি থেকে বাঁচতে অনেক দেশই এখন ডলারের বাইরে অন্য সম্পদে বিনিয়োগ সরিয়ে নিচ্ছে।
- ঋণের ভয় ও উচ্চ সুদহার: যুক্তরাষ্ট্রের ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়ানো ঋণের উদ্বেগে ট্রেজারি বন্ডে সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় নরওয়ের মতো আন্তর্জাতিক সার্বভৌম তহবিলগুলোও মার্কিন ঋণে বিনিয়োগ কমানোর ঘোষণা দিয়েছে।
ডলারের বিকল্প হিসেবে যে উদ্যোগগুলো দেখা যাচ্ছে
বিশ্বের ক্ষমতাধর ও উঠতি অর্থনীতির দেশগুলো এখন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর পুরোপুরি ভরসা না করে বিকল্প পথ তৈরিতে জোর দিচ্ছে:
১. নতুন ডিজিটাল মুদ্রা ও পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম
চীন, হংকং, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব যৌথভাবে ‘এমব্রিজ’ নামে এক নতুন আন্তঃসীমান্ত ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবস্থার উন্নয়ন করছে। এর লক্ষ্য হলো চিরাচরিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা এড়িয়ে আরও দ্রুত এবং কম খরচে লেনদেন সম্পন্ন করা। পাশাপাশি রাশিয়া ও ভারত তাদের নিজস্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চালানোর পরিকল্পনা করছে।
২. আন্তর্জাতিক রিজার্ভে স্বর্ণের রেকর্ড জোয়ার
ডলারের ওপর ঝুঁকি কমাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন আবার স্বর্ণ জমানোর দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। প্রথমবারের মতো সরকারি কোষাগারে রাখা স্বর্ণের আর্থিক মূল্য বিদেশে সংরক্ষিত মার্কিন ট্রেজারি সিকিউরিটিজকে ছাড়িয়ে গেছে। এমনকি ভল্ট নিরাপদ রাখতে নেদারল্যান্ডস ও ফ্রান্স তাদের গচ্ছিত ১০০ টনেরও বেশি স্বর্ণ মার্কিন ব্যাংক থেকে নিজেদের দেশে ফিরিয়ে এনেছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে বর্তমান অবস্থান ও ভবিষ্যৎ
আন্তর্জাতিক মুদ্রা লেনদেনের প্রায় ৯০ শতাংশ এখনো মার্কিন ডলারে হলেও এর ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে দোলাচল। প্রযুক্তি খাত ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিনিয়োগের কারণে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগের গন্তব্য। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক নীতি তাদের নিজস্ব স্বার্থে ব্যবহৃত হতে পারে—এই আশঙ্কা থেকে বিশ্ব এখন থেকেই একটি বিকল্প আর্থিক সুরক্ষাকবচ তৈরি করতে চাইছে।








