মিরপুর জাতীয় চিড়িয়াখানার বহুল আলোচিত অ্যালবিনো বা সাদা মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’-এর খাঁচার সামনের পরিচিতি ফলকে নামের বানান ভুল লেখা এবং এটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টির জেরে শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। চিড়িয়াখানার কিউরেটর ডা. মো. আতিকুর রহমানকে তার পদ থেকে আকস্মিক বদলি করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (২৮ মে) মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রাণিসম্পদ-৪ শাখা থেকে জারি করা এক সরকারি প্রজ্ঞাপনে এই আদেশ দেওয়া হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, জনস্বার্থে এই রদবদল কার্যকর করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের নামের মহিষের নামকরণ এবং পরবর্তীতে সেখানে বানান ভুলের বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ের নজরে আসার পরই এই দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হলো।
কেন বদলি করা হলো চিড়িয়াখানার কিউরেটরকে?
জাতীয় চিড়িয়াখানার ভেতরের সূত্র এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঘটনাটি শুধু একটি সাধারণ বানান ভুলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত এবং প্রভাবশালী একজন বিদেশি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নামে পশুর নামকরণ করা এবং তা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা শুরু থেকেই প্রশাসনিক মহলে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
পরবর্তীতে যখন মহিষটির খাঁচার সামনে পরিচিতি ফলক বা নেমপ্লেট বসানো হয়, তখন সেখানে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ বানানের জায়গায় ভুল করে লেখা হয় ‘ডোনাল্ড ট্টাম্প’ (ট-এর নিচে ট)। এই ভুলের ছবি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। সরকারি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন ভুল এবং আন্তর্জাতিকভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বেশ ক্ষুব্ধ হন। এরই ধারাবাহিকতায় কিউরেটর ডা. মো. আতিকুর রহমানকে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (সমমান) পদে বদলি করে অধিদপ্তরের লিভ, ডেপুটেশন অ্যান্ড ট্রেনিং রিজার্ভ (এলডিটিআর) পদে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় চিড়িয়াখানার নতুন কিউরেটর কে?
মন্ত্রণালয়ের একই প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জাতীয় চিড়িয়াখানার নতুন কিউরেটরের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এলডিটিআর পদে কর্মরত জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (সমমান) ডা. মো. হাবিবুর রহমানকে মিরপুর জাতীয় চিড়িয়াখানার নতুন কিউরেটর হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাকে অবিলম্বে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে চিড়িয়াখানার প্রশাসনিক কাজে কোনো ধরনের স্থবিরতা তৈরি না হয়।
কীভাবে আলোচনায় এলো এই ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ মহিষ?
এই ঘটনার সূত্রপাত কিন্তু বেশ কিছুদিন আগে। পবিত্র ঈদুল আজহার কোরবানির পশুর হাট মাতাতে কেরানীগঞ্জের একটি খামার থেকে ঢাকার হাটে আনা হয়েছিল প্রায় ৭০০ কেজি ওজনের এই বিরল প্রজাতির অ্যালবিনো মহিষটি। সাধারণত আমাদের দেশে কালো রঙের মহিষ দেখা গেলেও এই মহিষটির গায়ের রঙ ছিল সম্পূর্ণ সাদা ও গোলাপি। এর চোখগুলো ছিল হালকা নীলচে।
এরকম অদ্ভুত ও আকর্ষণীয় শারীরিক বৈশিষ্ট্যের কারণে খামারিরা শখ করে এবং ক্রেতাদের আকর্ষণ করতে এর নাম রেখেছিলেন মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। কোরবানির হাটে মহিষটি ওঠার পর থেকেই এটি দেখার জন্য প্রতিদিন শত শত মানুষ ভিড় করতে থাকেন। খুব দ্রুতই দেশীয় মূলধারার গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়াতেও এই মহিষটিকে নিয়ে খবর প্রকাশিত হয়, যা রাতারাতি একে সারা দেশে ভাইরাল করে তোলে।
মহিষটিকে যেভাবে চিড়িয়াখানায় আনা হলো
- কোরবানির হাটে ব্যাপক আলোচনার পর সরকার এই বিরল প্রজাতির সাদা মহিষটিকে সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়।
- খামারির কাছ থেকে সরকারি অর্থ পরিশোধ করে মহিষটি কিনে নেওয়া হয়।
- কেরানীগঞ্জ মডেল থানা পুলিশের বিশেষ সহায়তায় মহিষটিকে সম্পূর্ণ নিরাপদভাবে মিরপুর জাতীয় চিড়িয়াখানায় হস্তান্তর করা হয়।
বানান ভুল ও নাম পরিবর্তনের ভেতরের গল্প
চিড়িয়াখানায় আসার পর সাধারণ দর্শনার্থীদের কাছে এই মহিষটি ছিল অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। প্রতিদিন হাজারো মানুষ এটি দেখতে ভিড় জমাতেন। দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে মহিষটির খাঁচার সামনে একটি পরিচিতি বোর্ড ঝুলানো হয়েছিল। কিন্তু সেই বোর্ডে বড় বড় অক্ষরে লেখা হয় ‘ডোনাল্ড ট্টাম্প’।
নেটিজেনরা এই ভুলের ছবি তুলে ফেসবুকে শেয়ার করলে মুহূর্তের মধ্যে তা ট্রোলে পরিণত হয়। সচেতন নাগরিকরা প্রশ্ন তোলেন, একটি রাষ্ট্রীয় বিনোদন ও গবেষণা কেন্দ্রে কীভাবে এত বড় ভুল নজর এড়িয়ে গেল? তীব্র সমালোচনার মুখে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ দ্রুত সেই ফলকটি সংশোধন করে। কিন্তু ততক্ষণে বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ভুল বার্তা যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
পরবর্তীতে কোনো ঝুঁকি না নিয়ে এবং বিতর্ক এড়াতে প্রাণিটির নাম পুরোপুরি পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বর্তমানে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নাম বাদ দিয়ে খাঁচার সামনে সাধারণ এবং সহজ নাম ‘সাদা মহিষ’ লিখে দেওয়া হয়েছে।
কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া
নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বলেন, “একটি প্রাণীর নাম মার্কিন প্রেসিডেন্টের নামে রাখা এবং তা সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রদর্শন করা শুরু থেকেই বেশ সংবেদনশীল ও বিতর্কিত ছিল। এরপর আবার সেখানে বানান ভুল করা পুরো পরিস্থিতিকে আরও বেশি বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দেয়। এটি মূলত প্রশাসনিক গাফিলতির একটি বড় উদাহরণ।”
মন্ত্রণালয়ের অন্য একজন কর্মকর্তা জানান, পুরো ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করেই এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির নাম এভাবে ব্যবহার এবং পরবর্তীতে ভুলভাবে উপস্থাপন করার দুটি বিষয়ই বিদায়ী কিউরেটরের বদলির পেছনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। ভবিষ্যতে যাতে সরকারের কোনো প্রতিষ্ঠানে এমন খামখেয়ালিপনা না ঘটে, সেজন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
সাধারণ দর্শনার্থীদের প্রতিক্রিয়া ও বর্তমান পরিস্থিতি
বর্তমানে মিরপুর জাতীয় চিড়িয়াখানায় এই সাদা মহিষটিকে দেখতে আসা দর্শনার্থীদের ভিড় কমেনি। তবে অনেকেই খাঁচার সামনে এসে আগের সেই পরিচিত ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামটি না দেখে কিছুটা অবাক হচ্ছেন।
চিড়িয়াখানায় ঘুরতে আসা এক দর্শনার্থী জানান, “আমরা ফেসবুক ও টিভিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প নামের মহিষটির কথা শুনে দেখতে এসেছিলাম। এখানে এসে দেখছি নামের বোর্ড পরিবর্তন করে শুধু সাদা মহিষ লেখা হয়েছে। নাম যাই হোক না কেন, এত বড় এবং সুন্দর মহিষ সচরাচর দেখা যায় না, দেখে খুব ভালো লাগল।” চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমানে মহিষটি সম্পূর্ণ সুস্থ আছে এবং নিয়ম মেনে এর যত্ন নেওয়া হচ্ছে।
একটি পশুর খামারিদের দেওয়া শখের নাম যে শেষ পর্যন্ত একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তার বদলির কারণ হয়ে দাঁড়াবে, তা হয়তো কেউ ভাবেনি। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, সরকারি যেকোনো কাজে এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ের সাথে জড়িত ক্ষেত্রে কতটা সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। কিউরেটর বদলির মাধ্যমে মন্ত্রণালয় একটি কঠোর বার্তা দিল যে, দায়িত্বে অবহেলা এবং দেশকে বিব্রত করার মতো কোনো ভুল হালকাভাবে নেওয়া হবে না। আশা করা যাচ্ছে, নতুন কিউরেটরের তত্ত্বাবধানে জাতীয় চিড়িয়াখানার ব্যবস্থাপনা আরও সুন্দর ও নিখুঁত হবে।








