শীতের মৌসুম শুরু হলেও রাজধানীর বাজারে এখনও পর্যাপ্ত শীতের সবজি আসেনি। সরবরাহ কম হওয়ায় ফুলকপি, শিম, বাঁধাকপি, মুলা সব কিছুর দামই বেড়ে গেছে। অধিকাংশ সবজির কেজি এখন ৮০ টাকার ওপরে, কিছু সবজি এমনকি ১০০ টাকাও ছাড়িয়েছে।
বিক্রেতারা বলছেন, আগাম সবজি আসতে এবার তুলনামূলকভাবে দেরি হয়েছে। এর ফলে পুরো অক্টোবরজুড়ে বাজারে সবজির দাম ছিল চড়া।
দেরিতে বাজারে আসছে আগাম শীতের সবজি
সাধারণত প্রতি বছর সেপ্টেম্বর–অক্টোবরের দিকেই শীতের আগাম সবজি বাজারে আসা শুরু করে। তখন দামও ধীরে ধীরে কমতে থাকে।
কিন্তু এ বছর পরিস্থিতি ভিন্ন। বিক্রেতারা জানাচ্ছেন, অক্টোবরের শুরুতেই যেসব সবজি বাজারে থাকার কথা ছিল, সেগুলো এসেছে মাসের শেষের দিকে।
তবে গত কয়েক দিনে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। রাজধানীর বাজারে ফুলকপি, শিম, টমেটোসহ কিছু শীতের সবজি দেখা যাচ্ছে। এসব সবজির কেজি প্রতি দামও ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত কমেছে।
আবহাওয়ার কারণে দেরি, বলছেন কৃষকরা
যশোরের সদর উপজেলার নোঙরপুর গ্রামের কৃষক বদরুল আলম বলেন, “এ বছর আগাম সবজি চাষ করতে একটু দেরি হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় বীজ রোপণ দেরিতে করতে হয়েছে। এতে খেত থেকে সবজি তুলতেও দেরি হয়েছে।”
তিনি জানান, লম্বা সময় ধরে টানা বৃষ্টি হওয়ায় অনেক কৃষক ঝুঁকি নিতে চাননি। ফলে আগাম চাষ বিলম্বিত হয়েছে।
কৃষকরা বলছেন, আগে যেসব জমিতে সেপ্টেম্বরেই ফসল ওঠত, সেখানে এবার অক্টোবরের শেষের দিকে সবজি তুলতে পেরেছেন। এতে বাজারে সরবরাহ কমে গেছে, যার প্রভাব পড়েছে দামে।
টানা বৃষ্টির প্রভাব: সবজির চাষে দেরি
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ বলেন, “বাংলাদেশের কৃষি এখনও প্রকৃতিনির্ভর। গত কয়েক বছরে বৃষ্টির ধরন অনেক বদলে গেছে, কখনো অতিরিক্ত বৃষ্টি, কখনো কম।
এ বছর সেপ্টেম্বরে টানা বৃষ্টি হয়েছে, ফলে কেউ আগাম সবজি চাষের ঝুঁকি নেননি। এ কারণেই শীতের সবজি বাজারে দেরিতে এসেছে।”
তিনি আরও বলেন, “এটি শুধু একটি মৌসুমি সমস্যা নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট প্রভাব। ভবিষ্যতেও এমন ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।”
ব্যবসায়ীদের দাবি: চাষাবাদ দেরি, সরবরাহও কম
বাংলাদেশ কাঁচামাল আড়ত মালিক সমিতির সভাপতি ইমরান মাস্টার বলেন, “সেপ্টেম্বর–অক্টোবরের ভারী বৃষ্টিতে কৃষকরা সময়মতো জমিতে নেমে আগাম সবজি চাষ করতে পারেননি। এর ফলেই সবজি দেরিতে এসেছে এবং দাম বেড়েছে।”
তিনি জানান, সাধারণত এ সময়ে রাজধানীর বাজারে যশোর, বগুড়া, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের দিক থেকে আগাম সবজি আসে। কিন্তু এবার সেই প্রবাহ অনেক ধীর ছিল।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভিন্ন মত
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (DAE) কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, “চাষে উল্লেখযোগ্য দেরি হয়নি।”
সংস্থাটির সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, “ব্যবসায়ীরা দাম বাড়াতে এমন দাবি করেন। আমাদের তথ্য বলছে, দেশের প্রায় সব বাজারেই এখন আগাম সবজি পাওয়া যাচ্ছে, দামও ধীরে ধীরে কমছে।”
তিনি আরও জানান, “চলতি বছর অতিবৃষ্টির কারণে কিছু এলাকায় ক্ষতি হয়েছে ঠিকই, তবে সার্বিকভাবে পরিস্থিতি সহনীয়। শীতকালীন সবজির চাষ গত বছরের তুলনায় তেমন কম হয়নি।”
তথ্য যা বলছে কৃষি বিভাগ
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসেবে, আগস্টে টানা ১৮ দিনের বৃষ্টিতে প্রায় ৩৫১ হেক্টর জমির সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি আরও ১৫ দিনের বৃষ্টিতে ১২৪ হেক্টর জমির ক্ষতি হয়।
এতে আগাম ফসল তোলার সময় পেছাতে হয়েছে।
তবুও চলতি বছর রবি মৌসুমে প্রায় ৬ লাখ ৩৫ হাজার হেক্টর জমিতে সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে ১ লাখ ২৯ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে ইতোমধ্যে আগাম সবজি চাষ সম্পন্ন হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনই মূল কারণ, বলছেন বিশেষজ্ঞরা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টির ধরনে অস্বাভাবিকতা দেখা দিচ্ছে। কখন বৃষ্টি হবে, কত হবে, এটা এখন অনিশ্চিত।
এই অনিশ্চয়তা কৃষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
তাঁরা মনে করেন, কৃষিতে এখন সময় এসেছে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের।
বিশেষ করে যেসব জমি এক ফসলি, সেগুলোকে দুই বা তিন ফসলি করা এবং পলিথিন শেড বা গ্রীনহাউস পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানো জরুরি।
করণীয় কী: বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ বলেন, “আমাদের এখন প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিতে যেতে হবে। কম খরচে পলিথিন শেডে শাকসবজি, টমেটো, বেগুন, মরিচসহ নানা ফসল উৎপাদন সম্ভব। এতে আবহাওয়ার প্রভাব কম পড়ে, উৎপাদনও স্থিতিশীল থাকে।”
তিনি আরও বলেন, “যদি উৎপাদন স্থিতিশীল থাকে, তাহলে বাজারে সরবরাহ ঠিক থাকবে। কৃষক ন্যায্য দাম পাবেন, আর ভোক্তারাও স্বস্তি পাবে।”
রাজধানীর বাজারে শীতের সবজির দাম এখনো স্বাভাবিক হয়নি। সরবরাহ ধীরে ধীরে বাড়লেও দাম কমতে সময় লাগবে।
কৃষক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃতির পরিবর্তনই এর পেছনের বড় কারণ।
অন্যদিকে সরকার দাবি করছে, পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে আসছে।
তবে ভবিষ্যতে এমন সংকট এড়াতে প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদ ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থার বিকল্প নেই।








