খুলনা শহরের আড়ংঘাটায় কুয়েট আইটি গেট সংলগ্ন বিএনপির কার্যালয়ে রোববার রাতে ঘটে যায় এক ভয়াবহ ঘটনা। রাত সোয়া নয়টার দিকে মোটরসাইকেলে করে আসা দুর্বৃত্তরা কার্যালয়ে গুলি ও বোমা হামলা চালায়। মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়।
এ হামলায় নিহত হন ইমদাদুল হক (৫৫) নামে এক শিক্ষক। তিনি স্থানীয় বছিতলা নুরানি হাফিজিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন।
কীভাবে ঘটল হামলাটি
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার সময় যোগীপোল ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক ইউপি সদস্য মামুন শেখ স্থানীয় কয়েকজন কর্মীর সঙ্গে কার্যালয়ে বসে ছিলেন।
এ সময় হঠাৎ করে দুটি মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা অফিস লক্ষ্য করে পরপর দুটি বোমা ও চারটি গুলি ছোড়ে।
প্রথম গুলিটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে শিক্ষক ইমদাদুল হকের গায়ে লাগে, ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান।
পরে আবার গুলি চালালে মামুন শেখসহ আরও দুইজন গুলিবিদ্ধ হন। তাঁদের দ্রুত খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
নিহত শিক্ষকের পরিচয়
এলাকাবাসীর মতে, নিহত ইমদাদুল হক কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। তিনি একটি ধর্মীয় মাহফিলের অনুদান সংগ্রহের জন্য ওই রাতে বিএনপি কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত, তিনি গুলির আঘাতে প্রাণ হারান।
তার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা তার সদালাপী আচরণের প্রশংসা করে বলেন, “ইমদাদুল স্যার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, তিনি কেবল সমাজসেবক ছিলেন।”
পুলিশের বক্তব্য ও প্রাথমিক ধারণা
আড়ংঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খায়রুল বাসার জানান, মামুন শেখ প্রায়ই স্থানীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে কার্যালয়ে বসতেন। হামলার সময়ও তিনি সেখানে ছিলেন।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, তাঁকেই লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, “আমরা ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করেছি। হামলাকারীদের শনাক্ত ও আটক করার জন্য অভিযান চলছে।”
আহতদের অবস্থা ও চিকিৎসা
গুলিবিদ্ধ মামুন শেখসহ তিনজনকে দ্রুত খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাঁদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের এক চিকিৎসক বলেন, “দুইজনের শরীরে গুলি লেগেছে, একজনের অবস্থা বেশ জটিল। অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।”
এলাকায় আতঙ্ক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
হামলার পর পুরো আড়ংঘাটা এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়, স্থানীয়রা ঘরে ফিরে যান।
বিএনপি নেতারা অভিযোগ করেছেন, এটি একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক হামলা।
অন্যদিকে স্থানীয় প্রশাসন বলেছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং এলাকা টহল জোরদার করা হয়েছে।
তদন্তে কী বলছে পুলিশ
ওসি খায়রুল বাসার জানান, ঘটনাস্থল থেকে দুটি খালি কার্তুজ, বোমার অংশ এবং মোটরসাইকেলের টায়ারের চিহ্ন উদ্ধার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমরা ইতিমধ্যে কয়েকজন সন্দেহভাজনের নাম পেয়েছি। সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। হামলাকারীরা আইনের আওতায় আসবেই।”
স্থানীয়দের ক্ষোভ ও শোক
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সম্প্রতি এলাকায় রাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়ে গেছে।
একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, “রাতের বেলা এমন হামলা খুবই ভয়ংকর। মানুষ এখন আতঙ্কে আছে। আমরা শান্তি চাই।”
এদিকে নিহত শিক্ষক ইমদাদুল হকের জানাজা আজ সোমবার দুপুরে অনুষ্ঠিত হবে।
তাঁর পরিবার বলছে, “একজন নিরপরাধ মানুষকে এভাবে হারাতে হবে ভাবিনি। আমরা বিচার চাই।”
খুলনার এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করে রাজনৈতিক সহিংসতা কতটা ভয়ংকর রূপ নিতে পারে।
একজন সাধারণ শিক্ষক, যিনি কেবল অনুদান সংগ্রহে গিয়েছিলেন, তিনিই হয়ে গেলেন প্রাণহানির শিকার।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত তদন্ত ও কঠোর পদক্ষেপই পারে এমন নৃশংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে।








