বছরের শেষ প্রান্তে এসে দেশের বাজারে আবারও সয়াবিন তেলের দাম বাড়তে যাচ্ছে। লিটারপ্রতি সয়াবিন তেলের দাম ৯ টাকা ২৭ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি)। সংস্থাটির মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের অস্থিরতা ও ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির কারণে এই সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয়েছে।
বিটিটিসির নতুন প্রস্তাব
সোমবার (১০ নভেম্বর) এক বিজ্ঞপ্তিতে বিটিটিসি জানায়, তেলের আমদানি ব্যয়, এলসি মূল্য, ইনবন্ড ও এক্সবন্ড খরচ এবং ডলারের দর বৃদ্ধির ফলে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, বোতলজাত সয়াবিন তেলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য হবে লিটারপ্রতি ১৯৮ টাকা ২৭ পয়সা, যা আগে ছিল ১৮৯ টাকা।
একই সঙ্গে খোলা সয়াবিন তেলের দাম ৮ টাকা ৮৫ পয়সা বাড়িয়ে লিটারপ্রতি ১৭৭ টাকা ৮৫ পয়সা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের অস্থিরতা
বিটিটিসির তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বরের শুরুতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন সয়াবিন তেলের দাম দাঁড়ায় ১,০৬২ ডলার, আর পাম তেলের দাম ১,০৩৭ ডলার। জুলাইয়ের পর থেকে তেলের আন্তর্জাতিক দরে উল্লেখযোগ্য ওঠানামা দেখা যায়।
এ অবস্থায় দেশীয় বাজারে দাম স্থিতিশীল রাখতে হলে পুনরায় মূল্য সমন্বয়ের প্রয়োজন পড়ে বলে মনে করছে কমিশন।
ডলারের দামও প্রভাব ফেলছে
বিটিটিসির প্রস্তাবে প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৬০ পয়সা হিসেবে ধরা হয়েছে। আমদানিকৃত সয়াবিন তেলের খরচ এই ডলারদরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তেলের দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়েছে।
আগে কত ছিল দাম
গত ২৭ জুলাই অনুষ্ঠিত তেলের মূল্য সমন্বয় সভায় সিদ্ধান্ত হয়, ৩ আগস্ট থেকে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১৮৯ টাকা লিটারপ্রতি বিক্রি করা যাবে। সে সময় আন্তর্জাতিক বাজার কিছুটা স্থিতিশীল ছিল। তবে আগস্টের পর থেকে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ফের বেড়ে যায়।
টিসিবির তথ্য
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে দেশে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ১৪ শতাংশ। টিসিবির সাপ্তাহিক বাজার প্রতিবেদনে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের মধ্যে খুচরা পর্যায়ে তেলের দামে ধীরে ধীরে ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে।
বাজারে প্রভাব পড়বে কেমন
বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলের দাম বাড়লে অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও প্রভাব পড়তে পারে। কারণ সয়াবিন তেল রান্নার অন্যতম প্রধান উপকরণ এবং খাদ্যশিল্পে এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে যদি তেলের দাম কিছুটা স্থিতিশীল হয় এবং ডলারের মান নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে দামের স্থিতি ফিরে আসতে পারে।
ভোক্তাদের উদ্বেগ
ভোক্তারা বলছেন, প্রায় প্রতিমাসেই তেলের দাম ওঠানামা করছে। এতে সাধারণ মানুষের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটি বড় চাপ তৈরি করছে।
ঢাকার খুচরা বাজারে দেখা গেছে, অনেক দোকান ইতোমধ্যেই আগের দরে তেল বিক্রি বন্ধ রেখেছে। তারা বলছে, নতুন দর কার্যকর হলে পুরোনো দরে বিক্রি করা সম্ভব হবে না।
সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, বিটিটিসির প্রস্তাবটি এখন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখানে অনুমোদন পেলে নতুন দাম দ্রুত কার্যকর করা হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের দিক বিবেচনা করেই সয়াবিন তেলের নতুন দাম নির্ধারণ করা হবে। একই সঙ্গে ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা হবে।
বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরবে কি?
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, যদি সরকার দ্রুত সমন্বয় করে এবং মজুদ নিশ্চিত রাখে, তবে আগামী বছর সয়াবিন তেলের বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে। তবে ডলারের মান ও আমদানি ব্যয়ই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যৎ দামের গতি।
বছরের শেষের দিকে এসে ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধি ভোক্তাদের জন্য নতুন চিন্তার কারণ হলেও, বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন এটি সাময়িক প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজার স্থিতিশীল হলে দামও স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।








