যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার এক মাস পেরিয়ে গেলেও ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এখনও কঠিন হয়ে পড়েছে। জাতিসংঘ জানাচ্ছে, ইসরাইল বিভিন্নভাবে ত্রাণ প্রবেশে বাধা দিচ্ছে, যার ফলে লাখো মানুষ এখনো চরম খাদ্য, ওষুধ ও পানির সংকটে ভুগছে।
মঙ্গলবার (১১ নভেম্বর) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তর (OCHA) জানিয়েছে, ইসরাইলের আরোপিত প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা, সীমিত প্রবেশপথ এবং জটিল অনুমতি প্রক্রিয়া ত্রাণ কার্যক্রমকে বারবার বাধাগ্রস্ত করছে।
জাতিসংঘের মুখপাত্রের বক্তব্য
জাতিসংঘের মুখপাত্র ফারহান হক সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন,
“যুদ্ধবিরতির এক মাস পেরিয়ে গেলেও গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। নানা জটিল প্রক্রিয়া, নিরাপত্তাহীনতা এবং ইসরাইলি অনুমতির বাধার কারণে ত্রাণ কার্যক্রম নিয়মিতভাবে ব্যাহত হচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, অনেক সময় জাতিসংঘের দলগুলোকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে গেলেও প্রতিবার ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় ঘন্টার পর ঘন্টা সময় নষ্ট হচ্ছে, ফলে ত্রাণ বিলম্বিত হচ্ছে।
ত্রাণ পাঠানোর আটটি প্রচেষ্টার মধ্যে ছয়টি ব্যর্থ
জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, গত সপ্তাহে গাজায় ত্রাণ পাঠানোর আটটি প্রচেষ্টা চালানো হয়। এর মধ্যে কেবল দুটি প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ অনুমোদন পায়, বাকিগুলো বাধাগ্রস্ত হয় বা অনুমতি না পেয়ে বন্ধ হয়ে যায়।
ফারহান হক বলেন, “একটি ক্ষেত্রে আমাদের দলকে অনুমতি পেতে ১০ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে জরুরি ত্রাণ পৌঁছানো কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ছে।”
জাতিসংঘ জানিয়েছে, চলমান প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও তারা সহায়তা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এবং প্রতিটি সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।
সীমান্তপথ ও প্রশাসনিক জটিলতা বড় বাধা
গাজায় বর্তমানে কয়েকটি সীমিত প্রবেশপথ খোলা আছে, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাফাহ সীমান্ত। কিন্তু সেটিও নিয়মিতভাবে বন্ধ বা সীমিতভাবে খোলা থাকে। এর ফলে খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানি ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সময়মতো পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।
জাতিসংঘের মুখপাত্র বলেন, “আমরা ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয়ের চেষ্টা করছি, যাতে আরও সীমান্তপথ খোলা যায়। কিন্তু ইসরাইল এখনো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়নি।”
এই বিলম্বের কারণে গাজার অভ্যন্তরে মানবিক পরিস্থিতি দিন দিন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
মানবিক পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে
জাতিসংঘের মানবিক সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজায় এখন সবচেয়ে বড় সংকট খাদ্য ও চিকিৎসা সরঞ্জামে। হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও জ্বালানি না থাকায় চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। অনেক হাসপাতাল আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) জানিয়েছে, গাজায় বসবাসকারী জনগণের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ এখন পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছে না। শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে অপুষ্টি বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
ইসরাইলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বিশ্বসংস্থা
বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা বলছে, ইসরাইল মানবিক সহায়তার পথে বাধা সৃষ্টি করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘন করছে।
জাতিসংঘের কর্মকর্তারা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, “ত্রাণ পাঠানোর বাধা শুধুমাত্র প্রশাসনিক নয়, বরং এটি মানবিক সংকটকে আরও গভীর করছে।”
তারা বলেন, যুদ্ধবিরতির পরও যদি ত্রাণ সহজে পৌঁছাতে না পারে, তবে এটি যুদ্ধবিরতির উদ্দেশ্যকেই ব্যর্থ করে দিচ্ছে।
ইসরাইলি হামলায় হতাহতদের সংখ্যা ভয়াবহ
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি আগ্রাসনে এখন পর্যন্ত ৬৯ হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে হাজারো ঘরবাড়ি, হাসপাতাল ও স্কুল। অনেক পরিবার এখন আশ্রয় নিয়েছে অস্থায়ী ত্রাণ শিবিরে, যেখানে মৌলিক চাহিদাগুলোও পূরণ করা যাচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও মানবিক আহ্বান
জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আরব লীগসহ বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা গাজার মানবিক সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা ইসরাইলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, যেন অবিলম্বে সীমান্তপথ খুলে দেওয়া হয় এবং মানবিক সহায়তা নির্বিঘ্নে প্রবেশ করতে পারে।
এছাড়া বিশ্বনেতারাও বলছেন, গাজায় খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা পাঠানো কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নয়, এটি মানবতার প্রশ্ন। তাই সব পক্ষের উচিত মানবিকতার স্বার্থে সহযোগিতা করা।
জাতিসংঘের চলমান প্রচেষ্টা
সব বাধা সত্ত্বেও জাতিসংঘ ও এর সহযোগী সংস্থাগুলো যেমন রেড ক্রস, ইউনিসেফ, ডব্লিউএফপি সবাই মাঠে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তারা সীমিত সম্পদ নিয়েও আক্রান্তদের মাঝে খাদ্য, পানি, ওষুধ ও চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছে দিতে সচেষ্ট।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, গাজায় প্রতিদিন অন্তত ৫০০ ট্রাক ত্রাণ পাঠানো জরুরি, কিন্তু বাস্তবে তার ২০ শতাংশও পৌঁছাতে পারছে না।
গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা শুধু একটি প্রশাসনিক সমস্যা নয়, এটি এখন লাখো মানুষের জীবনের প্রশ্ন।
যুদ্ধবিরতির পরও যদি সাধারণ মানুষ খাদ্য, পানি ও ওষুধ না পায়, তাহলে সেই যুদ্ধবিরতির বাস্তব মূল্য হারিয়ে যায়।
জাতিসংঘ বলেছে, তারা ইসরাইলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এই সংকট কাটাতে চেষ্টা চালাচ্ছে, কিন্তু যতদিন পর্যন্ত প্রবেশপথ উন্মুক্ত না হয়, ততদিন গাজার মানুষের দুঃখ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই।








