সন্তান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বাবা-মায়ের জন্য এক বিশাল আমানত এবং পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিয়ামত। প্রতিটি বাবা-মা চান তাদের সন্তান যেন নেককার, সুস্থ এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের অধিকারী হয়। কিন্তু বর্তমান যুগে নৈতিক অবক্ষয় এবং নানা চ্যালেঞ্জের মুখে সন্তানকে সঠিক পথে পরিচালনা করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। এই কঠিন কাজটি সহজ করার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হলো সন্তানের জন্য দোয়া।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তিনটি দোয়া নিঃসন্দেহে কবুল হয়, যাতে কোনো সন্দেহ নেই। তার মধ্যে একটি হলো সন্তানের জন্য পিতা-মাতার দোয়া।” (সুনানে ইবনে মাজাহ)। তাই সন্তানের ইহকাল ও পরকালের মুক্তির জন্য কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত দোয়াগুলো জানা এবং নিয়মিত আমল করা প্রতিটি অভিভাবকের দায়িত্ব। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা পবিত্র কুরআন ও হাদিস থেকে সন্তানের জন্য শ্রেষ্ঠ দোয়া, নেক সন্তান লাভের আমল, জেদ কমানোর উপায় এবং বদনজর থেকে রক্ষার দোয়াগুলো বিস্তারিত জানবো।
পবিত্র কুরআনে বর্ণিত সন্তানের জন্য শ্রেষ্ঠ দোয়াগুলো
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা এমন কিছু দোয়া শিখিয়ে দিয়েছেন, যা নবীরা তাদের সন্তানদের জন্য করেছিলেন। এই দোয়াগুলো যেমন শক্তিশালী, তেমনি অর্থবহ। আমরা যদি এই আয়াতগুলো দিয়ে আল্লাহর কাছে চাই, তবে ইনশাআল্লাহ আল্লাহ আমাদের সন্তানদের হেফাজত করবেন।
নেক সন্তান লাভের দোয়া (হযরত জাকারিয়া আ.-এর দোয়া)
অনেক দম্পতি আছেন যারা দীর্ঘ দিন ধরে সন্তান লাভের আশায় আছেন, কিন্তু সন্তান হচ্ছে না। তাদের জন্য হযরত জাকারিয়া (আ.)-এর দোয়াটি অত্যন্ত কার্যকরী। বৃদ্ধ বয়সে যখন তিনি সন্তান লাভের আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছিলেন, তখন আল্লাহকে ডেকে এই দোয়াটি করেছিলেন। নেককার ছেলে সন্তান লাভের দোয়া নিচে দেয়া হলো:
সন্তান লাভের দোয়া আরবি: رَبِّ هَبْ لِي مِن لَّدُنْكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً إِنَّكَ سَمِيعُ الدُّعَاء
সন্তানের জন্য বাবা মায়ের দোয়া আরবি বাংলা উচ্চারণ: রাব্বি হাবলি মিল্লাদুনকা জুররিয়্যাতান ত্বয়্যিবাহ, ইন্নাকা সামিউদ দুআ।
সন্তান লাভের দোয়া বাংলা অর্থ: “হে আমার প্রতিপালক! আপনি আপনার পক্ষ থেকে আমাকে পবিত্র সন্তান দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি প্রার্থনা শ্রবণকারী।” (সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ৩৮)
সন্তান লাভের আমল: সন্তান লাভের নিয়তে স্বামী-স্ত্রী উভয়ই প্রতি ওয়াক্ত নামাজের পর এবং তাহাজ্জুদের সময় এই আয়াতটি বেশি বেশি পাঠ করবেন।
সন্তানকে নামাজি ও নেককার বানানোর দোয়া (হযরত ইব্রাহিম আ.-এর দোয়া)
সন্তান যেন বড় হয়ে দ্বীনদার হয় এবং নিয়মিত নামাজ আদায় করে, সেই চিন্তা সব বাবা-মায়ের থাকে। মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) নিজের এবং নিজের সন্তানদের নামাজি হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে বিশেষভাবে ফরিয়াদ করেছিলেন।
সন্তানের জন্য দোয়া আরবি: رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلاَةِ وَمِن ذُرِّيَّتِي رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاء
বাংলা উচ্চারণ: রাব্বিজ আলনি মুকিমাস সালাতি ওয়া মিন জুররিয়্যাতি, রব্বানা ওয়া তাকাব্বাল দুআ।
সন্তানের জন্য দোয়া বাংলা অর্থ: “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে নামাজ কায়েমকারী করুন এবং আমার সন্তানদের মধ্য থেকেও। হে আমাদের রব! আমার দোয়া কবুল করুন।” (সূরা ইব্রাহিম, আয়াত: ৪০)
সন্তানের জন্য আমল: এই দোয়াটি নামাজের শেষ বৈঠকে (আত্তাহিয়াতু ও দরুদের পর) এবং মোনাজাতে নিয়মিত পাঠ করলে সন্তান নামাজি হয়।
স্ত্রী ও সন্তানের চক্ষুশীতলতার দোয়া
একটি সুখী পরিবারের মূল ভিত্তি হলো নেককার স্ত্রী এবং অনুগত সন্তান। আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দাদের শিখিয়ে দিয়েছেন কিভাবে পরিবারের শান্তির জন্য দোয়া করতে হয়। এটি সূরা ফুরকানের একটি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আয়াত।
শান্তির জন্য দোয়া আরবি: رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
বাংলা উচ্চারণ: রব্বানা হাবলানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া জুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ’ইউন, ওয়াজআলনা লিল মুত্তাকিনা ইমামা।
শান্তির জন্য দোয়া বাংলা অর্থ: “হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমাদের এমন স্ত্রী ও সন্তানাদি দান করুন যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দিন।” (সূরা ফুরকান, আয়াত: ৭৪)
শান্তির জন্য আমল: মাগরিবের নামাজের পর বা রাতে ঘুমানোর আগে সপরিবারে এই দোয়াটি পাঠ করা উত্তম।
সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ও সন্তানের মেধা বৃদ্ধির দোয়া
সন্তানের পড়াশোনা, মেধা বিকাশ এবং ক্যারিয়ার নিয়ে দুশ্চিন্তা করা স্বাভাবিক। তবে চেষ্টার পাশাপাশি আল্লাহর সাহায্য চাওয়া জরুরি। মেধা বৃদ্ধি এবং তোতলামি বা জড়তা কাটানোর জন্য কুরআনে চমৎকার সব আমল রয়েছে।
জ্ঞান ও মেধা বৃদ্ধির দোয়া
পড়াশোনায় মন বসে না বা পড়া মনে থাকে না—এমন অভিযোগ অনেক সন্তানের। মেধা ও জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য আল্লাহ তাআলা রাসূল (সা.)-কে এই দোয়াটি শিক্ষা দিয়েছেন।
মেধা বৃদ্ধির দোয়া আরবি: رَّبِّ زِدْنِي عِلْمًا
বাংলা উচ্চারণ: রাব্বি যিদনি ইলমা।
মেধা বৃদ্ধির দোয়া বাংলা অর্থ: “হে আমার প্রতিপালক! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দিন।” (সূরা ত্ব-হা, আয়াত: ১১৪)
মেধা বৃদ্ধির আমল: সন্তান যখন পড়তে বসবে, তখন তাকে এই দোয়াটি ৩ বার, ৭ বার বা ১১ বার পাঠ করার অভ্যাস করান। এতে স্মৃতিশক্তি প্রখর হয়।
সন্তানের মুখের জড়তা দূর করার দোয়া
অনেক শিশু কথা বলতে দেরি করে অথবা কথা বলার সময় তোতলায় বা আটকে যায়। হযরত মুসা (আ.) যখন ফেরাউনের কাছে দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি নিজের মুখের জড়তা দূর করার জন্য আল্লাহর কাছে এই দোয়াটি করেছিলেন।
মুখের জড়তা দূর করার দোয়া আরবি: رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِّن لِّسَانِي يَفْقَهُوا قَوْلِي
জড়তা দূর করার দোয়া বাংলা উচ্চারণ: রাব্বিশ রাহলি সদরি, ওয়া ইয়াসসির লি আমরি, ওয়াহলুল উকদাতাম মিল লিসানি, ইয়াফকাহু কওলি।
মুখের জড়তা দূর করার দোয়া বাংলা অর্থ: “হে আমার রব! আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন। আমার কাজ সহজ করে দিন। এবং আমার জিহ্বার জড়তা দূর করে দিন, যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।” (সূরা ত্ব-হা, আয়াত: ২৫-২৮)
মুখের জড়তা দূর করার আমল: শিশুর মুখের জড়তা দূর করতে এবং পরীক্ষার ভাইভা বা প্রেজেন্টেশনের আগে এই দোয়াটি পড়া অত্যন্ত কার্যকরী।
অবাধ্য সন্তানকে বাধ্য করার দোয়া ও আমল
বর্তমান সময়ে বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় কষ্টের কারণ হলো সন্তানের অবাধ্যতা, জেদ এবং কথা না শোনা। অবাধ্য সন্তানকে বাগে আনতে শাসন বা মারধরের চেয়ে আধ্যাত্মিক আমল অনেক বেশি শক্তিশালী।
সন্তানের জেদ কমানোর আমল
যেসব শিশু অতিরিক্ত জেদ করে বা রাগান্বিত হয়ে যায়, তাদের শান্ত করতে আল্লাহর গুণবাচক নাম বা ‘আসমাউল হুসনা’র আমল করা যেতে পারে।
আমল: আল্লাহর পবিত্র নাম “ইয়া শাহিদু” (یَا شَهِیدُ)। সন্তানের কপালে হাত রেখে অথবা ফজরের নামাজের পর এই নামটি ২১ বার পাঠ করে সন্তানের বুকে বা খাবারে ফুঁ দিলে ইনশাআল্লাহ সন্তানের জেদ কমে যাবে এবং সে শান্ত হবে।
সঠিক পথে ফেরানোর জন্য সূরা ফুরকানের আমল
সন্তান যদি অসৎ সঙ্গে মেলামেশা করে বা দ্বীন থেকে দূরে সরে যায়, তবে তাদের হেদায়েতের জন্য সূরা ফুরকানের ৭৪ নম্বর আয়াতটি (যা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে) তাহাজ্জুদের নামাজে সিজদায় গিয়ে বেশি বেশি পাঠ করবেন। চোখের পানি ফেলে আল্লাহর কাছে সন্তানের নাম ধরে দোয়া করবেন।
কপালে হাত রেখে সন্তানের জন্য বিশেষ দোয়া
সন্তান যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখন তার মাথার কাছে বসে আলতো করে কপালে হাত রেখে সূরা আশ-শূরা এর ১৯ নম্বর আয়াতটি পাঠ করা অত্যন্ত ফলপ্রসূ।
সন্তানের জন্য বিশেষ দোয়া আরবি : اللَّهُ لَطِيفٌ بِعِبَادِهِ يَرْزُقُ مَن يَشَاءُ ۖ وَهُوَ الْقَوِيُّ الْعَزيزُ
সন্তানের জন্য বিশেষ দোয়া বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহু লাতিফুম বি-ইবাদিহি ইয়ারযুকু মাইয়্যাশা-উ, ওয়া হুয়াল কাবিয়্যুল আযিয।
এই আমলটি নিয়মিত করলে সন্তানের স্বভাব নম্র হয় এবং সে বাবা-মায়ের অনুগত হয়।
সন্তানের রোগমুক্তি ও বদনজর থেকে বাঁচার দোয়া
বাচ্চাদের শরীর খুব নাজুক হয় এবং খুব সহজেই তাদের ওপর বদনজর বা ‘নজর লাগা’র প্রভাব পড়ে। রাসূল (সা.) বদনজরকে সত্য বলেছেন এবং তা থেকে বাঁচার জন্য দোয়া শিখিয়েছেন।
বদনজর বা নজর লাগা থেকে মুক্তির দোয়া
আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর দুই নাতি হযরত হাসান (রা.) ও হযরত হোসাইন (রা.)-এর নিরাপত্তার জন্য এই দোয়াটি পড়ে ফুঁ দিতেন।
আরবি দোয়া: أُعِيذُكُمَا بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لاَمَّةٍ
বাংলা উচ্চারণ: উইজুকুমা বি-কালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন কুল্লি শায়তানিন ওয়া হাম্মাতিন, ওয়া মিন কুল্লি আইনিন লাম্মাহ।
বাংলা অর্থ: “আমি তোমাদের উভয়কে আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ কালেমাগুলোর মাধ্যমে প্রত্যেক শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী এবং প্রত্যেক কুদৃষ্টি (বদনজর) থেকে আল্লাহর আশ্রয়ে দিচ্ছি।” (সহীহ বুখারী)
আমল: সকাল ও সন্ধ্যায় এই দোয়াটি পড়ে বাচ্চার গায়ে ফুঁ দিন।
অসুস্থ সন্তানের সুস্থতার জন্য দোয়া
সন্তান অসুস্থ হলে চিকিৎসার পাশাপাশি সূরা ফাতিহা পড়ে ফুঁ দেওয়া হলো সবচেয়ে বড় ‘রুকইয়াহ’ বা ঝাড়ফুঁক। সূরা ফাতিহাকে ‘সূরাতুশ শিফা’ বা রোগমুক্তির সূরা বলা হয়।
এছাড়াও রাসূল (সা.) শিখিয়ে দেওয়া এই দোয়াটি পড়ে সন্তানের ব্যথানেশক স্থানে বা শরীরে হাত বুলিয়ে দিন:
বাচ্চার সুস্থতার জন্য দোয়া আরবি: আল্লাহুম্মা রাব্বান-নাসি আজহিবিল বা’সা, ইশফি আনতাশ-শাফি, লা শিফা’আ ইল্লা শিফা’উকা, শিফা’আন লা ইউগাদিরু সাকামা।
সন্তানের সুস্থতার জন্য বাবা মায়ের দোয়া অর্থ: হে আল্লাহ! মানুষের প্রতিপালক, কষ্ট দূর করে দিন। আরোগ্য দান করুন, আপনিই আরোগ্যদানকারী। আপনার আরোগ্য ছাড়া কোনো আরোগ্য নেই, এমন আরোগ্য দান করুন যা কোনো রোগ অবশিষ্ট রাখে না।
গর্ভাবস্থায় সন্তানের জন্য মায়ের দোয়া ও করণীয়
মায়ের গর্ভ থেকেই সন্তানের প্রাথমিক শিক্ষা ও গঠন শুরু হয়। গর্ভাবস্থায় মা যা করেন, যা ভাবেন, তার প্রভাব সন্তানের ওপর পড়ে।
১. কুরআন তিলাওয়াত: গর্ভাবস্থায় বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করা উচিত। বিশেষ করে সূরা ইউসুফ (সন্তানের সৌন্দর্য ও গঠনের জন্য), সূরা মারিয়াম (প্রসব সহজ হওয়ার জন্য) এবং সূরা লুকমান (সন্তানের হেকমত বা প্রজ্ঞার জন্য) তিলাওয়াত করা ভালো।
২. হালাল খাবার: সন্তানকে নেককার বানাতে হলে গর্ভাবস্থায় মাকে অবশ্যই হারাম খাবার থেকে দূরে থাকতে হবে এবং হালাল রিজিক গ্রহণ করতে হবে।
৩. বেশি বেশি ইস্তেগফার: আস্তাগফিরুল্লাহ পাঠ করলে আল্লাহ রিজিক ও সন্তান-সন্ততিতে বরকত দান করেন।
সন্তানের জন্য দোয়া করার সঠিক সময়
দোয়া কবুলের কিছু বিশেষ সময় আছে, যখন দোয়া করলে আল্লাহ তাআলা তা ফিরিয়ে দেন না। সন্তানের জন্য এই সময়গুলোকে কাজে লাগান:
- তাহাজ্জুদের সময়: শেষ রাতে আল্লাহ প্রথম আসমানে নেমে আসেন এবং বান্দার ডাক শোনেন।
- ফরজ নামাজের পর: বিশেষ করে সিজদায় থাকা অবস্থায়।
- বৃষ্টির সময়: যখন বৃষ্টি পড়ে, তখন দোয়া কবুল হয়।
- ইফতারের পূর্ব মুহূর্তে: রোজাদারের দোয়া আল্লাহ ফিরিয়ে দেন না।
- জুম্মার দিন: আসর থেকে মাগরিবের মধ্যবর্তী সময়ে।
সন্তানের জন্য বদদোয়া করা থেকে বিরত থাকুন
রাগের মাথায় অনেক বাবা-মা সন্তানকে অভিশাপ দিয়ে ফেলেন বা বলেন, “তোর ধ্বংস হোক”, “তুই মরে যা”। এটি মারাত্মক ভুল। রাসূল (সা.) কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন নিজের বা সন্তানের বিরুদ্ধে দোয়া করতে। কারণ, হতে পারে সেই সময়টি ছিল দোয়া কবুলের সময়।
রাসূল (সা.) বলেছেন: “তোমরা নিজেদের বিরুদ্ধে, তোমাদের সন্তানদের বিরুদ্ধে এবং তোমাদের সম্পদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করো না। এমন যেন না হয় যে, তোমরা এমন কোনো মুহূর্তে দোয়া করলে যখন আল্লাহর কাছে যা চাওয়া হয়, তিনি তাই কবুল করেন।” (সহীহ মুসলিম)
তাই রাগ হলেও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করুন এবং বদদোয়ার পরিবর্তে হেদায়েতের দোয়া করুন। বলুন, “আল্লাহ তোমাকে হেদায়েত দিন” বা “আল্লাহ তোমাকে মানুষ হওয়ার তৌফিক দিন”।
সন্তান পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ, আর এই সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব বাবা-মায়ের। সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ, ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির জন্য সন্তানের জন্য দোয়া করার কোনো বিকল্প নেই। আমরা উপরে যেসব কুরআনি আয়াত ও হাদিসের দোয়া আলোচনা করেছি, সেগুলো নিয়মিত আমল করলে ইনশাআল্লাহ আমাদের সন্তানরা মানুষের মতো মানুষ হবে।
শুধু দোয়াই নয়, পাশাপাশি সন্তানদের দ্বীনি পরিবেশে বড় করা, তাদের সঙ্গ (Friends circle) লক্ষ্য রাখা এবং তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলাও জরুরি। আল্লাহ আমাদের সকলকে আমাদের সন্তানদের চোখের শীতলতা হিসেবে কবুল করুন এবং তাদের সকল প্রকার অনিষ্ট থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
সন্তানের জন্য দোয়া সম্পর্কিত প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
প্রশ্ন: সন্তানের জেদ কমানোর দোয়া কোনটি?
উত্তর: সন্তানের জেদ কমানোর জন্য আল্লাহর গুণবাচক নাম “ইয়া শাহিদু” (Ya Shahidu) ২১ বার পাঠ করে সন্তানের কপালে বা বুকে ফুঁ দিলে জেদ কমে। এছাড়াও সূরা আলে-ইমরানের ১৩৪ নম্বর আয়াত পাঠ করা উপকারী।
প্রশ্ন: অবাধ্য সন্তানকে বাধ্য করার আমল কী?
উত্তর: সন্তান ঘুমানোর পর তার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে সূরা আশ-শূরা এর ১৯ নম্বর আয়াত (আল্লাহু লাতিফুম বি-ইবাদিহি…) পাঠ করে তার কপালে আলতো করে ফুঁ দিলে সন্তান ধীরে ধীরে বাধ্য ও শান্ত হয়।
প্রশ্ন: নেক সন্তান লাভের শ্রেষ্ঠ দোয়া কোনটি?
উত্তর: নেক সন্তান লাভের শ্রেষ্ঠ দোয়া হলো হযরত জাকারিয়া (আ.)-এর দোয়াটি: “রাব্বি হাবলি মিল্লাদুনকা জুররিয়্যাতান ত্বয়্যিবাহ, ইন্নাকা সামিউদ দুআ।” (সূরা আলে-ইমরান: ৩৮)।
প্রশ্ন: সন্তানের মেধা বৃদ্ধির জন্য কোন দোয়া পড়ব?
উত্তর: সন্তানের মেধা ও জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে ছোট ও কার্যকরী দোয়া হলো: “রাব্বি যিদনি ইলমা” (হে প্রভু! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন)। এটি পড়ার সময় পড়ার আগে ও পরে দরুদ শরীফ পড়ে নেওয়া ভালো।
প্রশ্ন: বাচ্চার নজর লাগলে কোন দোয়া পড়তে হয়?
উত্তর: বাচ্চার নজর লাগলে মহানবী (সা.)-এর শেখানো দোয়াটি পড়তে হয়: “উইজুকুমা বি-কালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন কুল্লি শায়তানিন ওয়া হাম্মাতিন, ওয়া মিন কুল্লি আইনিন লাম্মাহ।”
প্রশ্ন: গর্ভাবস্থায় ছেলে সন্তান লাভের দোয়া আছে কি?
উত্তর: ইসলামে ছেলে বা মেয়ে নির্দিষ্ট করে চাওয়ার চেয়ে সুস্থ ও নেক সন্তান চাওয়া উত্তম। তবে আল্লাহর কাছে মনে মনে নির্দিষ্ট লিঙ্গ চাওয়া বৈধ। দোয়ার ক্ষেত্রে “রাব্বি হাবলি মিনাস সালিহীন” (সূরা সাফফাত: ১০০) পড়া যেতে পারে।
প্রশ্ন: সন্তান কথা না শুনলে কি করণীয়?
উত্তর: সন্তান কথা না শুনলে তার সাথে রাগারাগি না করে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করুন। পাশাপাশি নামাজের সিজদায় সূরা ফুরকানের ৭৪ নম্বর আয়াতটি বেশি বেশি পাঠ করুন এবং আল্লাহর কাছে কাঁদুন।
প্রশ্ন: সন্তানের তোতলামি দূর করার দোয়া কোনটি?
উত্তর: সন্তানের মুখের জড়তা বা তোতলামি দূর করতে সূরা ত্ব-হা এর ২৫-২৮ নম্বর আয়াত (রাব্বিশ রাহলি সদরি…) পাঠ করা অত্যন্ত কার্যকরী।
প্রশ্ন: সন্তানকে নামাজি বানানোর আমল কী?
উত্তর: সন্তানকে নামাজি বানাতে হলে ছোটবেলা থেকে তাকে সাথে নিয়ে নামাজ পড়ুন এবং হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর দোয়াটি (রাব্বিজ আলনি মুকিমাস সালাতি…) নিয়মিত পাঠ করুন।
প্রশ্ন: সন্তানের জন্য বদদোয়া করলে কি তা কবুল হয়?
উত্তর: হ্যাঁ, হাদিস অনুযায়ী বাবা-মায়ের বদদোয়া সন্তানের জন্য কবুল হয়ে যেতে পারে। তাই রাগের মাথায় কখনোই সন্তানের জন্য ধ্বংস বা ক্ষতির দোয়া করা উচিত নয়, বরং হেদায়েতের দোয়া করা উচিত।








