পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের ‘আল্লাহর রঙে’ (صِبْغَةَ اللَّهِ) রঙিন হতে আহ্বান জানিয়েছেন। আর এই স্বর্গীয় রঙে নিজেকে রাঙিয়ে তোলার একমাত্র পথ হলো আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর প্রিয় হাবিব রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পছন্দনীয় সুমহান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো নিজের জীবনে ধারণ করা। প্রতিটি মানুষের আত্মিক বিকাশ ও রবের সান্নিধ্য অর্জনের জন্য নিজের ভেতর নৈতিক গুণের চর্চা অত্যন্ত জরুরি। যে বান্দা এই গুণাবলী দিয়ে নিজের মন ও জীবনকে সাজাতে পারে, সে-ই উভয় জগতে পরম সফলতা লাভ করে। নিচে এমন আটটি বিশেষ গুণ ও বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হলো, যা একজন সাধারণ মানুষকেও আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পরম প্রিয়পাত্রে পরিণত করে
১. তাকওয়া বা পরম আল্লাহভীতি
সর্বাবস্থায় আল্লাহ তাআলার উপস্থিতি অনুভব করা, তাঁর নির্দেশাবলী মেনে চলা এবং নিষেধ থেকে নিজেকে বিরত রাখার নামই তাকওয়া। মুমিনের চরিত্রের সবচেয়ে মজবুত ভিত হলো এই তাকওয়া। যে মানুষের অন্তরে আল্লাহভীতি থাকে, সে কখনো কোনো অন্যায় বা পাপে লিপ্ত হতে পারে না। তাকওয়াপূর্ণ জীবন মানুষকে সব ধরনের অপরাধ ও কলুষতা থেকে মুক্ত রাখে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন,
وَاتَّقُوا اللَّهَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ
‘আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যদি তোমরা ইমানদার হয়ে থাকো।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়জাত ১৭৫)
তাকওয়াবান বান্দাকে জান্নাতি শুভসংবাদ দিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
اتَّقُوا اللَّهَ رَبَّكُمْ وَصَلُّوا خَمْسَكُمْ وَصُومُوا شَهْرَكُمْ وَأَدُّوا زَكَاةَ أَمْوَالِكُمْ وَأَطِيعُوا ذَا أَمْرِكُمْ تَدْخُلُوا جَنَّةَ رَبِّكُمْ
‘তোমাদের প্রভু আল্লাহ তাআলাকে ভয় কর, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় কর, রমজানের রোজা রাখ, সম্পদের জাকাত দাও এবং নেতৃত্বদানকারীদের আনুগত্য কর; তবেই প্রতিপালকের জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।’ (তিরমিজি ৬১৬)
২. কঠিন বিপদে ধৈর্য ও সহনশীলতা
যুগে যুগে আম্বিয়ায়ে কেরাম ও মহান মনীষীদের জীবনের প্রধান ভূষণই ছিল সবর বা ধৈর্য। বর্তমানের উন্মাদের মতো অস্থির সমাজে ধৈর্য ধারণ করার মানসিকতা তৈরি করা আত্মশুদ্ধির অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে বাধা-বিপত্তি ও পরীক্ষা আসবেই; কিন্তু যারা রবের ওপর আস্থা রেখে ধৈর্য ধরে, আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন।
ধৈর্যশীলদের অভিবাদন জানিয়ে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন,
سَلَامٌ عَلَيْكُم بِمَا صَبَرْتُمْ ۚ فَنِعْمَ عُقْبَى الدَّارِ
‘তোমাদের ধৈর্যধারণের কারণে তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক! আর তোমাদের এই শেষ ঠিকানা কতই-না চমৎকার!’ (সুরা আর-রাদ: আয়াত ২৪)
৩. কাজের ধীরস্থিরতা ও দূরদর্শিতা
যেকোনো কাজে অযথা তাড়াহুড়ো করলে ভুলের আশঙ্কা বাড়ে এবং কাজের ভেতরের বরকত নষ্ট হয়ে যায়। ধীরস্থিরতা মানুষের মধ্যে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দূরদর্শিতা তৈরি করে। ইসলামে প্রতিটি কাজ চিন্তা-ভাবনা করে সুন্দরভাবে শেষ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবি হজরত আশাজ্জ ইবনে কায়স (রা.)-কে লক্ষ্য করে একটি সুসংবাদ শুনিয়ে বলেছিলেন,
إِنَّ فِيكَ خَصْلَتَيْنِ يُحِبُّهُمَا اللَّهُ: الْحِلْمُ، وَالأَنَاةُ
‘নিশ্চয়ই তোমার ভেতর এমন দুটি স্বভাব রয়েছে, যা আল্লাহ তাআলা ভালোবাসেন প্রজ্ঞা (সহনশীলতা) ও ধীরস্থিরতা।’ (মুসলিম ১৭)
অন্য হাদিসে প্রিয় নবী (সা.) আরও স্মরণ করিয়ে দেন,
‘ধীরস্থিরতা আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে, আর তাড়াহুড়ো হলো শয়তানের পক্ষ থেকে।’ (বাইহাকি)
৪. সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ
মানুষ মহান আল্লাহর সৃষ্টির সেরা জীব। আল্লাহর অনন্য সৃষ্টি ও সহজীবের প্রতি অনুকম্পা ও দয়া দেখানো বান্দার পরম সওয়াবের কাজ। যে বান্দা সৃষ্টির প্রতি দয়ালু হয়, তার ওপর স্রষ্টার রহমত বর্ষিত হয়। মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানো, দুর্বলদের সাহায্য করা এবং জীবজন্তুর প্রতি সদয় হওয়া ঈমানের অঙ্গ।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেন,
وَأَحْسِنُوا ۛ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
‘আর মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ অনুগ্রহকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৯৫)
৫. অনুশোচনা ও বেশি বেশি তওবা
মানুষ মাত্রই অনিচ্ছাকৃত ভুল-ত্রুটি হতে পারে। কিন্তু ভুলের পর অহংকার না করে রবের দরবারে অনুতপ্ত ও বিনীত হয়ে ফিরে আসাই প্রকৃত মুমিনের অনন্য সৌন্দর্য। শয়তানের প্ররোচনায় পাপ হলেও খাঁটি মনে তওবা করলে আল্লাহ বান্দার সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন।
আল্লাহ তাআলা খাঁটি তাওবাকারিদের ভালোবাসার কথা ঘোষণা দিয়ে বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারিদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে তাদেরও ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত: ২২২)
হাদিসে পাকে প্রিয় নবী (সা.) মানবজীবনের এই বাস্তবতাকে তুলে ধরে ইরশাদ করেছেন,
كُلُّ بَنِي آدَمَ خَطَّاءٌ وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ
‘সব আদম সন্তানই গুনাহগার (ভুলকারী)। আর গুনাহগারদের মধ্যে তারাই উত্তম, যারা বেশি বেশি তাওবা করে।’ (ইবনে মাজাহ ৪২৫)
৬. আল্লাহর ওপর অকৃত্রিম ভরসা (তাওয়াক্কুল)
জীবন যেমনই হোক না কেন কখনো আনন্দের জোয়ার, কখনো বা কষ্টের ঘনঘটা কোনো অবস্থাতেই হতাশ হতে নেই। জীবনের সব ঝড়-ঝাপটায় নিজেকে সামলে নিয়ে মহান সৃষ্টিকর্তার ওপর অটল বিশ্বাস ও গভীর ভরসা রাখার নামই হলো তাওয়াক্কুল। বান্দা যখন সর্বোচ্চ চেষ্টা করে ফলাফল রবের হাতে সঁপে দেয়, আল্লাহ নিজেই তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান।
আল্লাহ তাআলা সুরা আল-ইমরানে নির্দেশ দিয়েছেন,
فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
‘অতঃপর যখন তুমি কোনো কাজের সংকল্প বা সিদ্ধান্ত নিয়ে নাও, তখন আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ (তাঁর ওপর) ভরসাকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৫৯)
৭. বিচারে ও বিবাদে চরম সুবিচার
ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও জাতীয় জীবনে পূর্ণ সুবিচার কায়েম করা প্রতিটি মুমিনের পবিত্র আমানত। বিবাদের ক্ষেত্রে রাগ-অনুরাগ ভুলে নিরপেক্ষ ও ন্যায়সঙ্গত রায় দেওয়া ইমানের দাবি। আত্মীয় বা শত্রুর ক্ষেত্রেও সত্য ও সুবিচারের নীতি থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না।
সুবিচারকারীদের সুসংবাদ দিয়ে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَإِنْ حَكَمْتَ فَاحْكُم بَيْنَهُم بِالْقِسْطِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
‘আর যদি ফয়সালা বা বিচার করেন, তবে তাদের মধ্যে ন্যায়ভাবে ফয়সালা করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সুবিচারকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-মায়েদা: আয়াত ৪২)
৮. চিরন্তন সত্যবাদিতা
সত্য মানুষকে সত্যের পথ ধরে মুক্তির দিকে নিয়ে যায়, আর মিথ্যা মানুষকে ধাবিত করে ধ্বংসের অতল গহ্বরে। কথা ও কাজে সত্যবাদী হওয়া মুমিনের অপরিহার্য গুণ। সত্যবাদিতার কারণে সমাজে যেমন বিশ্বাস তৈরি হয়, তেমনি পরকালেও মেলে জান্নাতের সুসংবাদ।
কুরআন মাজিদে সত্যবাদীদের প্রতিদান ও মর্যাদা সম্পর্কে বলা হয়েছে,
وَالصَّادِقِينَ وَالصَّادِقَاتِ … أَعَدَّ اللَّهُ لَهُم مَّغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا
‘…সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদিনী নারী… এদের জন্য মহান আল্লাহ ক্ষমা ও মহাপ্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন।’ (সুরা আল-আহজাব: আয়াত ৩৫)
আমরা কেবল বাহ্যিক পোশাক বা আনুষ্ঠানিকতায় ইসলামের চর্চা সীমাবদ্ধ রাখব না; বরং পারিবারিক, সামাজিক ও আত্মিক গুণাবলী প্রতিদিনের ব্যবহারে ফুটিয়ে তোলাই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। তাকওয়া, ধৈর্য, ধীরস্থিরতা, দয়া, তওবা, তাওয়াক্কুল, সুবিচার এবং সত্যবাদিতার মতো স্বর্গীয় গুণাবলী যখন আমাদের চরিত্রে মিশে যাবে, তখনই আমরা প্রকৃত অর্থে আল্লাহর রঙে রঙিন হতে পারব। আসুন, নিজেদের চরিত্রকে এই সৌন্দর্যমণ্ডিত গুণে সাজিয়ে আল্লাহ ও তাঁর প্রিয় রাসুল (সা.)-এর প্রিয়পাত্র হওয়ার তৌফিক কামনায় নিজেদের প্রস্তুত করি।








