ধারাবাহিক লোকসান এবং বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পারার কারণে ২০২০ সালের ১ জুলাই বিজেএমসির আওতাধীন ২৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে বর্তমানে সেসব বন্ধ মিল আবার চালুর জন্য দীর্ঘমেয়াদে (৫ থেকে ২০ বছর) বেসরকারি খাতে ইজারা বা লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়া পুরোদমে এগিয়ে চলেছে।
সরকারের এই নতুন উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে সারাদেশে প্রায় ৫০ হাজার বেকার মানুষের নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
১. ইতোমধ্যে চালু হওয়া পাটকলগুলোর বর্তমান অবস্থা
ইতোমধ্যে ইজারা দেওয়া ১৭টি পাটকলের মধ্যে ৯টিতে আনুষ্ঠানিকভাবে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে।
- এসব চালু হওয়া মিলে বর্তমানে প্রায় ৯ হাজার ৫০০ জনের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়েছে।
- সরকারের এই উদ্যোগে একদিকে যেমন অব্যবহৃত সম্পদ আবার কাজে আসছে, অন্যদিকে তেমনি নতুন বিনিয়োগও আকৃষ্ট হচ্ছে।
এছাড়াও আরও তিনটি পাটকলকে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় লিজ দেওয়ার কাজ চলছে। এগুলো হলো:
১. সীতাকুণ্ডের এমএম জুটমিল
২. রাঙ্গুনিয়ার কেএফডি লিমিটেড
৩. নরসিংদীর পলাশের কো-অপারেটিভ জুটমিল
২. বড় দুটি কোম্পানির সাথে নতুন ইজারা চুক্তি
সম্প্রতি দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় দুটি শিল্প গ্রুপের সাথে তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল ইজারা দেওয়ার চুক্তি সম্পন্ন করেছে সরকার। এর ফলে বাজারে নতুন করে বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ আসতে চলেছে।
প্রাণ-আরএফএল (PRAN-RFL Group)
- জাতীয় জুট মিলস (সিরাজগঞ্জ): এখানে প্রায় ১৫৭ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে। চালু হলে প্রায় ৫,২৩৮ জনের কর্মসংস্থান হবে এবং এর বার্ষিক টার্নওভার হবে আনুমানিক ৫০০ কোটি টাকা।
- স্টার জুট মিলস (দিঘলিয়া, খুলনা): এই মিলে ২৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে। এখানেও ৫,২৩৮ জনের কাজের সুযোগ মিলবে এবং বছরে ৫০০ কোটি টাকা টার্নওভারের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
হ্যামকো গ্রুপ (Hamko Group)
- প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিলস (খালিশপুর, খুলনা): এখানে প্রায় ২১২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে তারা। এতে ১,১৫৩ জনের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হবে এবং সম্ভাব্য বার্ষিক টার্নওভার হবে ১৭৫ কোটি টাকা।
এই তিনটি মিল চালুর মাধ্যমে একসাথে ১১,৬২৯ জনের কর্মসংস্থান এবং প্রায় ৬১৯ কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগ যুক্ত হবে।
৩. অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন ও অন্যান্য মিলের আপডেট
অবশিষ্ট পাঁচটি মিলের মধ্যে ঢাকার ডেমরার করিম জুট মিলস লিমিটেড ও লতিফ বাওয়ানী জুট মিলস লিমিটেডকে ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ’ (BEZA)-এর কাছে হস্তান্তরের কাজ চলছে। এই জমিগুলোতে নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার বড় পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যান্য মিলের চিত্র:
- চট্টগ্রামের বিডিসিএফ বাগদাদ-ঢাকা কার্পেট ফ্যাক্টরি এবং খুলনার আলিম জুটমিলস নিয়ে আইনি বা আইনি মামলা চলছে।
- অন্যদিকে সীতাকুণ্ডের আমিন জুটমিলস ফেরত পাওয়া গেছে, যেখানে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই উৎপাদন কাজ শুরু হতে পারে।
৪. পাট শিল্পের পুনরুজ্জীবনে সরকারি উদ্যোগ ও সহায়তা
বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী জানান, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) পদ্ধতিতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করতেই স্বচ্ছ দরপত্রের মাধ্যমে এই মিলগুলো লিজ দেওয়া হচ্ছে।
পরিবেশবান্ধব পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে পাটের বহুমাত্রিক ব্যবহার বাড়াতে সরকার কিছু বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করছে:
- ঋণ সুবিধা ও প্রণোদনা: পাট ও পাটজাত পণ্য উৎপাদনে আগ্রহীদের জন্য ঋণসহ প্রয়োজনীয় আর্থিক সাহায্য দেওয়া হচ্ছে।
- জেডিপিসি (JDPC) এর ভূমিকা: জুট ডাইভার্সিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার দেশ-বিদেশে বিভিন্ন প্রদর্শনী আয়োজন করছে।
- আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ: বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোর সাহায্যে পাট পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার বড় করার চেষ্টা চলছে।
বন্ধ পাটকলগুলো পুনরায় চালু হওয়া বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চাকা নতুন করে ঘোরার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এটি কেবল পাটের সোনালী দিনকেই ফিরিয়ে আনবে না, বরং বিশাল বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে দেশকে এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে।








