আমাদের দৈনন্দিন জীবন এখন প্রচণ্ড ব্যস্ততা ও মানসিক চাপে ঘেরা। কাজের চাপ, দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা কিংবা একটানা একঘেয়েমি সব মিলিয়ে আমাদের মন ও মেজাজ অনেক সময়ই খারাপ হয়ে পড়ে। তবে মন ভালো করার জন্য সবসময় বড় কোনো বিরতি বা ছুটির প্রয়োজন নেই।
‘মাইক্রোপ্রাকটিস’ বইয়ের লেখক এলি সাসম্যানের মতে, খুব ছোট ছোট কিছু অভ্যাসের মাধ্যমে মাত্র ৩০ সেকেন্ডে আমাদের মেজাজ, মানসিক সুস্থতা এবং শরীরের শক্তির মাত্রা বাড়িয়ে তোলা সম্ভব।
আজ আমরা আলোচনা করব এমন কিছু সহজ কৌশল নিয়ে, যা আপনি অফিসে, বাড়িতে বা যেকোনো স্থানে খুব সহজেই অনুশীলন করতে পারবেন।
১. ৩০ সেকেন্ডে হাসি এবং কৃতজ্ঞতাবোধ প্রকাশের জাদু
হাসি হলো মন ভালো করার সবচেয়ে দ্রুত ও সহজ একটি মাধ্যম। কোনো কারণ ছাড়াই কৃত্রিমভাবে হাসলেও তা আমাদের মস্তিস্কে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এটি যেভাবে অনুশীলন করবেন
- গভীর শ্বাস নেওয়া: প্রথমে সোজা হয়ে বসুন, পেটের ওপর হাত রাখুন এবং পরপর তিনবার দীর্ঘ ও গভীর শ্বাস নিন।
- শব্দ করে হাসা: এবার ইচ্ছে করেই হাসতে শুরু করুন। যদি একা একা বা সরাসরি হাসতে অস্বস্তি লাগে, তবে মুখে উচ্চারণ করুন ‘হি হি হি, হা হা হা’। ধীরে ধীরে হাসির আওয়াজ কিছুটা বাড়াতে থাকুন।
- সত্যিকারের হাসিতে রূপান্তর: দেখা যায়, এই কৃত্রিম হাসিটিই একসময় সত্যিকারের হাসিতে পরিণত হয় এবং মন হালকা হয়ে যায়।
- কৃতজ্ঞ হওয়া: সবশেষে আবার একটি গভীর শ্বাস নিন এবং জীবনের যেসব ইতিবাচক বা সুন্দর বিষয়ের জন্য আপনি ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞ, সেগুলো স্মরণের চেষ্টা করুন।
আপনি যদি কারো সঙ্গে থাকেন, তবে একে অপরের হাসি নকল করার মাধ্যমেও আনন্দ দ্বিগুণ করে নিতে পারেন।
২. মাইক্রো ইয়োগা বা শরীর প্রসারিত করার নিয়ম
আমরা যারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কম্পিউটার বা মোবাইলের স্ক্রিনের সামনে বসে কাজ করি, তাদের শরীর ধীরে ধীরে কুঁকড়ে যায় এবং কাঁধ ও পিঠে চাপ পড়ে। এতে শারীরিক অস্বস্তির পাশাপাশি মানসিক ক্লান্তিও বাড়ে। সাসম্যান এই ক্লান্তি দূর করতে ‘মাইক্রো ইয়োগা’ অনুশীলনের পরামর্শ দেন।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১৫ মিনিট পর পর মাত্র ১৫ থেকে ৩০ সেকেন্ডের জন্য শরীর একটু প্রসারিত (Stretch) করলে কাজের দক্ষতা প্রায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।
কীভাবে করবেন এই সহজ স্ট্রেচিং?
১. আপনার পিঠের পেছনে দুই হাতের আঙুলগুলো একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে বা ইন্টারলক করুন।
২. শ্বাস নেওয়ার সাথে সাথে দুই হাত নিচের দিকে প্রসারিত করুন এবং বুকটা আলতো করে ওপরের দিকে তুলুন।
৩. এবার ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়ুন এবং শরীরকে শিথিল করে চাপের অনুভূতি হালকা হতে দিন।
৪. এভাবে ধীরগতিতে ২ থেকে ৩ বার গভীর শ্বাস নিন।
যখন আপনি স্ট্রেচিংয়ের সাথে গভীর শ্বাস যুক্ত করবেন, তখন তা মানসিক চাপ ও যন্ত্রণা কমাতে সাধারণ যোগব্যায়ামের চেয়েও বেশি কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে।
৩. ধীরগতির শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে স্নায়ু শান্ত করা
হঠাৎ খুব বেশি উদ্বেগ বা মানসিক চাপ অনুভব করলে শ্বাস-প্রশ্বাসের বিশেষ অনুশীলন আপনার স্নায়ুতন্ত্রকে দ্রুত শান্ত করতে সাহায্য করতে পারে। গবেষণায় প্রমাণিত যে, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম বিষণ্নতা ও দুশ্চিন্তা কমায়।
এটি করার নিয়ম:
- যেকোনো আরামদায়ক জায়গায় বসুন এবং চোখ বন্ধ করুন।
- প্রায় ১০ সেকেন্ড সময় নিয়ে ৩টি ধীর ও গভীর শ্বাস নিন।
- মনে রাখবেন, শ্বাস নেওয়ার চেয়ে শ্বাস ছাড়ার সময়কাল যেন দীর্ঘ হয়।
- বাতাস আপনার ফুসফুসে প্রবেশের সময় এবং বের হয়ে যাওয়ার অনুভূতির ওপর পুরোপুরি মনোযোগ দিন।
সারা দিনের মধ্যে যখনই মানসিক চাপ অনুভব করবেন, তখনই কয়েকবার এই অনুশীলনটি করে নিতে পারেন।
৪. আত্ম-সহানুভূতিশীল স্পর্শ বা সেলফ-সোদিং টাচ
মানুষের স্পর্শ মানুষের মনকে শান্ত করার জন্য অত্যন্ত কার্যকর। গবেষক সাসম্যানের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ২০ সেকেন্ডের জন্য নিজেকে আলতো করে স্পর্শ করা বা শান্ত করার অনুশীলনেও মন হালকা হয়ে যায়।
নিজের ওপর হাত রেখে বা নিজেকে জড়িয়ে ধরে কয়েক সেকেন্ড শান্তভাবে বসে থাকলে শরীরে এক ধরনের স্বস্তি ও নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে মানসিক সুফল দেয়।
৫. সচেতন জীবনযাপন এবং আপনার জন্য উপযুক্ত পদ্ধতি নির্বাচন
প্রতিদিন সব ধরনের নিয়ম একসঙ্গে চেষ্টা করার কোনো প্রয়োজন নেই। গবেষক ভ্যান ডার ওয়ালের মতে, পদ্ধতিগুলো নিজে পরখ করে দেখুন এবং আপনার জীবনযাত্রার সঙ্গে কোনটি সবচেয়ে সুন্দরভাবে মিলে যায় তা খুঁজে বের করুন।
একেক মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় অনুশীলনের মাত্রা একেক রকম হতে পারে। তাই যে উপায়ে আপনি সবচেয়ে বেশি স্বস্তি ও আনন্দ বোধ করবেন, সেটাই বেছে নিন।
মানসিক সুস্থতা ও ভালো মেজাজ বজায় রাখা জটিল কোনো কাজ নয়। প্রতিদিনের ব্যস্ততার ফাঁকে মাত্র ৩০ সেকেন্ড সময় বের করে নিজের যত্ন নিলেই সারাদিন সতেজ ও প্রাণবন্ত থাকা সম্ভব। আজ থেকেই শুরু করুন আপনার পছন্দের সহজ অনুশীলনটি!








