বিশ্ব ক্রিকেটে এক চরম নাটকীয় মোড় নিল আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সমীকরণ। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের বিপক্ষে বহুপ্রতীক্ষিত ম্যাচটি বয়কট করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে পাকিস্তান। তবে এই সিদ্ধান্ত ভারতের সাথে কোনো ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে নয়, বরং বাংলাদেশের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে এই নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিয়েছে পাকিস্তান সরকার।
রোববার রাতে পাকিস্তান সরকারের অফিশিয়াল এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে এই সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিশ্ব ক্রিকেটে ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্যের বিরুদ্ধে পাকিস্তান তাদের কঠোর অবস্থান পরিষ্কার করল।
কেন এই ম্যাচ বয়কট?
ঘটনার সূত্রপাত বাংলাদেশের বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে। নিরাপত্তা ইস্যুতে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নির্দেশে আইপিএল থেকে মুস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার পর থেকেই উত্তাপ শুরু হয়। এর প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের ম্যাচগুলো ভারত থেকে শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানায়। কিন্তু আইসিসি ভারতের চাপে সেই দাবি নাকচ করে দিলে বাংলাদেশ বিশ্বকাপ বয়কট করার সিদ্ধান্ত নেয়। বাংলাদেশের এই “অপমানজনক পরিস্থিতির” প্রতিবাদেই পাকিস্তান এবার ভারতের বিরুদ্ধে নির্ধারিত ম্যাচটি না খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
পিসিবি-র সাহসী সিদ্ধান্ত ও শাহবাজ শরিফের অনুমোদন
পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) সভাপতি মহসিন নাকভি প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে শাহবাজ শরিফের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। সেখানে চারটি ভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচনার মূল সুর ছিল, টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করা হবে ঠিকই, কিন্তু ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচ না খেলে একটি কড়া প্রতিবাদের বার্তা দেওয়া হবে।
পাকিস্তান সরকারের বার্তায় বলা হয়েছে:
“ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তান সরকার ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তান দলকে অংশগ্রহণের অনুমোদন দিয়েছে। তবে ১৫ ফেব্রুয়ারি ভারতের বিপক্ষে নির্ধারিত ম্যাচে পাকিস্তান দল মাঠে নামবে না।”
শাস্তি ও বিশাল আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি
বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচ বয়কট করা মানেই বিশাল অংকের আর্থিক ক্ষতি। আইসিসি এই কারণে পাকিস্তানকে বড় অংকের জরিমানা করতে পারে। এমনকি ম্যাচ থেকে অর্জিত লভ্যাংশও হারাতে হবে পিসিবি-কে। কিন্তু মহসিন নাকভি জানিয়েছেন, ক্রিকেটে ভারতের “দাদাগিরি” বন্ধ করতে এবং বাংলাদেশের মতো বন্ধুপ্রতিম দেশের পাশে দাঁড়াতে তারা যেকোনো আর্থিক ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত।
আইসিসির ‘দ্বিমুখী’ নীতির কঠোর সমালোচনা
পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড আইসিসিকে ‘দ্বিমুখী’ বা ‘হিপোক্রেট’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তাদের যুক্তি হলো, গত চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে নিরাপত্তা অজুহাতে ভারত পাকিস্তানে যায়নি এবং দুবাইয়ে বসে সব ম্যাচ খেলে শিরোপা জিতেছে। অথচ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই একই নিয়ম অনুসরণ করতে রাজি হয়নি আইসিসি। এই বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতিবাদে বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠেছে। এমনকি ভারতের জ্যেষ্ঠ ক্রীড়া সাংবাদিক শারদা উগ্রাও বিসিসিআই এবং আইসিসির এই দ্বিচারিতার কঠোর সমালোচনা করেছেন।
বিশ্ব ক্রিকেটে এর প্রভাব কী হবে?
তৃতীয় কোনো দেশের সমর্থনে বিশ্বকাপের ম্যাচ বয়কট করার ঘটনা ক্রিকেট ইতিহাসে এই প্রথম। বাংলাদেশের বদলে স্কটল্যান্ডকে বিশ্বকাপে অন্তর্ভুক্ত করার আইসিসির সিদ্ধান্ত যখন চারদিকে সমালোচিত হচ্ছে, ঠিক তখনই পাকিস্তানের এই ঘোষণা আইসিসি-কে এক বড়সড় ধাক্কা দিল। ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, এতে করে বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথ থেকে আসা আয়ের বিশাল অংশ হারাবে আইসিসি, যা সংস্থাটির ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করবে।
এখন দেখার বিষয়, পাকিস্তানের এই কঠোর অবস্থানের পর আইসিসি বা ভারত কোনো নমনীয় সিদ্ধান্ত নেয় কি না। তবে পাকিস্তান যে বিশ্ব ক্রিকেটের ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, তা এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়ে গেল।








