কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির উৎকর্ষতার এই যুগে কনটেন্ট তৈরিতে এসেছে বিশাল পরিবর্তন। বর্তমানে খুব সহজেই এআই দিয়ে ছবি, ভিডিও কিংবা গান তৈরি করা যাচ্ছে। এতদিন এআই দিয়ে তৈরি এসব কনটেন্টে একটি দৃশ্যমান ওয়াটারমার্ক বা লোগো যুক্ত থাকত, যা অনেক সময় মূল কনটেন্টের সৌন্দর্য নষ্ট করত।
তবে ব্যবহারকারীদের সুবিধার্থে এবার বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে গুগল। জেমিনির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি যেকোনো ছবি, ভিডিও এবং গান থেকে দৃশ্যমান ওয়াটারমার্ক সরিয়ে ফেলার সুযোগ দিচ্ছে এই টেক জায়ান্ট।
গুগলের এই পদক্ষেপের ফলে এআই কনটেন্ট ব্যবহারকারীরা অনেক বেশি স্বাধীনতা পাবেন। তবে দৃশ্যমান চিহ্ন সরিয়ে নেওয়া হলেও পেছনের গোপন প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুরোপুরি বহাল রাখবে প্রতিষ্ঠানটি।
নতুন সেটিং ও জেমিনির বিভিন্ন মডেলে ওয়াটারমার্ক অপসারণের নিয়ম
গুগল ইতোমধ্যে একটি বিশেষ সেটিং চালু করেছে, যার মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা তাদের পছন্দমতো দৃশ্যমান চিহ্ন নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। এই ফিচারের প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
- ন্যানো ব্যানানা মডেল: জেমিনির ‘ন্যানো ব্যানানা’ (Nano Banana) ইমেজ জেনারেশন মডেল দিয়ে তৈরি ছবির দৃশ্যমান ওয়াটারমার্ক খুব সহজেই সরিয়ে নেওয়া যাবে।
- জেমিনি ও ফ্লো প্ল্যাটফর্ম: বর্তমানে নির্দিষ্ট কিছু দেশের ব্যবহারকারীরা জেমিনি এবং ‘ফ্লো’ (Flow) প্ল্যাটফর্মে এই বিশেষ সুবিধাটি উপভোগ করতে পারছেন।
- সার্চ এআই মোড: খুব শিগগিরই গুগলের বহুল ব্যবহৃত ‘সার্চ এআই মোডেও’ এই সুবিধাটি যুক্ত হতে যাচ্ছে।
- ভিডিও ও অডিও কনটেন্ট: শুধু ছবিতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না এই নিয়ম। জেমিনি ‘ওমনি’ (Omni) দিয়ে তৈরি এআই ভিডিও এবং ‘লিরিয়া’ (Lyria) দিয়ে তৈরি গান থেকেও দৃশ্যমান ওয়াটারমার্ক সরানোর পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে গুগল।
স্থানীয় আইন ও ওয়াটারমার্ক অপসারণের নিয়মাবলী
সব দেশ বা অঞ্চলে কিন্তু এই সুবিধা একযোগে পাওয়া যাবে না। গুগল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, কোনো দেশ বা অঞ্চলের স্থানীয় আইনে যদি এআই-নির্মিত কনটেন্টে বাধ্যতামূলকভাবে দৃশ্যমান ওয়াটারমার্ক প্রদর্শনের নির্দেশ থাকে, তবে সেখানে এই ফিচারটি কার্যকর হবে না।
অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক আইন এবং নিজ নিজ দেশের সাইবার ও এআই নীতিমালার ওপর ভিত্তি করেই ব্যবহারকারীরা ওয়াটারমার্ক অপসারণের সুবিধাটি ব্যবহার করতে পারবেন।
দৃশ্যমান ওয়াটারমার্ক সরলেও কার্যকর থাকবে ‘সিন্থআইডি’ ও গোপন শনাক্তকারী
ছবি বা ভিডিওর ওপর থেকে দৃশ্যমান লোগো বা টেক্সট সরিয়ে ফেললেও কনটেন্টটি যে এআই দিয়ে তৈরি, তা পুরোপুরি গোপন থাকবে না। গুগল এর সুরক্ষায় দুটি শক্তিশালী ডিজিটাল মেটাডেটা প্রযুক্তি ব্যবহার করছে:
১. সিন্থআইডি (SynthID): এটি গুগলের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও অদৃশ্য ওয়াটারমার্ক প্রযুক্তি। কনটেন্টের ভেতরে পিক্সেল বা ডাটা লেভেলে এই চিহ্নটি কোড করা থাকে, যা খালি চোখে দেখা যায় না।
২. সিটুপিএ (C2PA) মেটাডেটা: এটি একটি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে কনটেন্টের মূল উৎস, তৈরির সময় এবং সম্পাদনার ইতিহাস সুনির্দিষ্টভাবে ট্র্যাক করা সম্ভব।
কীভাবে চিনবেন দৃশ্যমান চিহ্ন ছাড়া এআই কনটেন্ট?
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, দৃশ্যমান কোনো চিহ্ন না থাকলে কীভাবে বোঝা যাবে যে একটি ছবি বা ভিডিও আসল নাকি এআই দিয়ে তৈরি?
গুগলের দাবি অনুযায়ী, এটি খুঁজে বের করা একেবারেই সহজ। ব্যবহারকারীরা চাইলে সরাসরি জেমিনি এআইকেই যেকোনো সন্দেহজনক ছবি বা ফাইল দেখিয়ে জিজ্ঞেস করতে পারবেন। জেমিনির অ্যালগরিদম সঙ্গে সঙ্গে পেছনের লুকানো তথ্য বিশ্লেষণ করবে এবং ‘সিন্থআইডি’ শনাক্ত করে বলে দেবে যে কনটেন্টটি এআই দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত হয়েছে কি না।
এআই কনটেন্টের বিশ্বব্যাপী বিতর্ক ও গুগলের নতুন উদ্যোগ
বর্তমান সময়ে ডিপফেক, ভুয়া খবর এবং এআই দিয়ে তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক বিতর্ক চলছে। একদিকে সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহল চাচ্ছেন এআই কনটেন্ট যেন সহজে চেনা যায়। অন্যদিকে কনটেন্ট ক্রিয়েটররা চাচ্ছেন নিজেদের কাজ যেন পরিচ্ছন্ন ও দৃশ্যমান কোনো দাগ বা ওয়াটারমার্ক ছাড়া উপস্থাপন করা যায়।
গুগলের এই নতুন পদক্ষেপটি মূলত এই দুই দাবির মধ্যে একটি চমৎকার ভারসাম্য তৈরি করেছে। দৃশ্যমান ওয়াটারমার্ক সরানোর সুযোগ দিয়ে যেমন ক্রিয়েটরদের সন্তুষ্ট করা হয়েছে, ঠিক তেমনই গোপন ডিজিটাল ট্র্যাকিং প্রযুক্তি বহাল রেখে এআই কনটেন্টের অপব্যবহার রোধের ব্যবস্থাও জোরালো রাখা হয়েছে।








