দেশের সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সেবার সবচেয়ে বড় ভরসাস্থল হলো সরকারি হাসপাতাল। তবে প্রায় সময়ই রোগীদের অভিযোগ থাকে অনিয়ম, চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি এবং সেবার নিম্নমান নিয়ে। এবার এই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন আনতে এবং সরকারি হাসপাতালের সেবা, কর্মদক্ষতা ও জবাবদিহিতা শতভাগ নিশ্চিত করতে এক ঐতিহাসিক ও কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, এখন থেকে প্রতি মাসে সরকারি হাসপাতালগুলোর কাজের মান মূল্যায়ন করা হবে। সবচেয়ে ভালো কাজ করা ৫ শতাংশ হাসপাতাল ও প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হবে বিশেষ প্রণোদনা বা পুরস্কার। অন্যদিকে, চিকিৎসায় অবহেলা ও কর্মদক্ষতায় পিছিয়ে থাকা ৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গ্রহণ করা হবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা।
সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ও কাজের মান বাড়াতে নতুন নির্দেশনা
সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় পরিদর্শনের সময় কর্মকর্তা ও চিকিৎসকদের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় সরকারি হাসপাতালগুলোর সেবার মান নিশ্চিত করতে বেশ কিছু কঠোর ও ইতিবাচক দিকনির্দেশনা প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর এই নতুন দিকনির্দেশনার আলোকেই দেশের সকল সরকারি হাসপাতালে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি, স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনা, সেবার মান নিশ্চিতকরণ এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা বাস্তবায়নের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত একটি বিশদ পরিপত্র জারি করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর ফলে দেশের প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে এখন থেকে একটি প্রতিযোগিতামূলক ও গতিশীল কাজের পরিবেশ তৈরি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
প্রযুক্তির কঠোর ব্যবহার: শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিতে বায়োমেট্রিক ও জিও-ফেন্সিং
সরকারি হাসপাতালে রোগীদের সবচেয়ে বড় ক্ষোভের জায়গা থাকে সময়মতো চিকিৎসক না পাওয়া। অনেক সময় দেখা যায়, নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসকরা হাসপাতালে উপস্থিত থাকেন না। এই সমস্যার চিরতরে অবসান ঘটাতে নির্দেশনায় বায়োমেট্রিক উপস্থিতি ব্যবস্থা চালু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে আধুনিক ‘জিও-ফেন্সিং’ (Geo-fencing) প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে কোনো কর্মকর্তা বা চিকিৎসক হাসপাতালের নির্ধারিত সীমানার বাইরে থাকলে তার উপস্থিতি গণনায় আসবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে সংগৃহীত উপস্থিতির তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই চিকিৎসকদের মাসিক বেতন, ছুটির হিসাব এবং ভবিষ্যতের পদোন্নতি (Promotion) নির্ধারণ করা হবে। ফলে ইচ্ছা করলেই কেউ আর দায়িত্বে অবহেলা করতে পারবেন না।
পারফরম্যান্স মূল্যায়ন: সেরা ৫ শতাংশের জন্য প্রণোদনা, দুর্বলদের শাস্তি
হাসপাতালগুলোর কাজের মান যাচাই করার জন্য একটি আধুনিক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা হচ্ছে। এই ব্যবস্থার আওতায় প্রতি মাসে দেশের সকল সরকারি হাসপাতালের সেবা ও কর্মদক্ষতা ট্র্যাক করা হবে।
- সেরা ৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান: যেসকল হাসপাতাল রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দেবে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখবে এবং প্রশাসনিকভাবে সফল হবে, সেগুলোকে প্রতি মাসে তালিকাভুক্ত করে ‘সেরা ৫ শতাংশ’ হিসেবে পুরস্কৃত করা হবে। এতে করে অন্যান্য হাসপাতালগুলোও ভালো সেবা দিতে উৎসাহিত হবে।
- দুর্বল ৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান: অন্যদিকে, যেসব হাসপাতালের সেবার মান খারাপ থাকবে এবং অবহেলা দেখা যাবে, সেগুলোকে ‘দুর্বল ৫ শতাংশ’ চিহ্নিত করে কারণ দর্শানোসহ প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
চিকিৎসা সেবায় অবহেলা করলে চিকিৎসক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা
রোগীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে এবার কোনো ধরনের অজুহাত গ্রহণ করা হবে না। নির্দেশনায় স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, চিকিৎসায় অবহেলা বা দায়িত্বে গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে শুধু নিচের স্তরের কর্মচারীরাই পার পাবেন না, বরং সরাসরি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক এবং প্রতিষ্ঠানপ্রধানের (হাসপাতাল পরিচালক বা টিএইচও) বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কোনো হাসপাতালে রোগী যদি সময়মতো সেবা না পান বা অব্যবস্থাপনার শিকার হন, তবে তার দায়ভার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে নিতে হবে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে হাসপাতাল পরিচালনায় স্বচ্ছতা এবং পেশাদারিত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
প্রতি মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে বাস্তবায়ন প্রতিবেদন জমার বাধ্যবাধকতা
এই বিশাল উদ্যোগ শুধু কাগজে-কলমে বা মুখে মুখেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। তা শতভাগ বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও ট্র্যাকিং করা হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিটি সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানকে প্রতি মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে তাদের বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদন (Progress Report) মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে হবে। কোনো হাসপাতাল যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তথ্য জমা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের বিরুদ্ধেও প্রশাসনিক কঠোরতা দেখানো হবে।
আগস্টের পর্যালোচনা বৈঠক ও ভবিষ্যতের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা
এই পুরো প্রক্রিয়ার অগ্রগতি এবং মাঠপর্যায়ের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার জন্য একটি বিশেষ পর্যালোচনা সভার সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী ২৫ আগস্ট সরকারের উচ্চপর্যায়ে এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের সার্বিক অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও মূল্যায়ন করা হবে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই বায়োমেট্রিক উপস্থিতি, জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তি, প্রতি মাসের মূল্যায়ন এবং পুরস্কার-শাস্তির নীতি সঠিকভাবে বজায় রাখা যায়, তবে বাংলাদেশের সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা এক নতুন যুগে পদার্পণ করবে। প্রান্তিক অঞ্চল থেকে শুরু করে শহরের বড় বড় সরকারি হাসপাতালগুলোতে সাধারণ মানুষ এখন থেকে কোনো রকম ভোগান্তি ছাড়াই দ্রুত ও মানসম্মত সেবা পাবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।








