হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
সোমবার, জুন ২২, ২০২৬
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeতথ্য প্রযুক্তিএনইআইআর চালু: আজ থেকে বন্ধ হয়ে যাবে যেসব অবৈধ মোবাইল
spot_img

এনইআইআর চালু: আজ থেকে বন্ধ হয়ে যাবে যেসব অবৈধ মোবাইল

দীর্ঘদিন ধরে চলা আলোচনা, জল্পনা-কল্পনা এবং সময়সীমা বাড়ানোর পর অবশেষে কার্যকর হতে যাচ্ছে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার বা এনইআইআর (NEIR)। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী, আজ বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রযুক্তিগত সেবাটি চালু হচ্ছে। এর মূল লক্ষ্য হলো দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং অবৈধ হ্যান্ডসেট বা ‘গ্রে মার্কেট’ প্রতিরোধ করা।

বিটিআরসির এই সিদ্ধান্তের ফলে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিলেও, সাধারণ গ্রাহকদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে ফোন ব্যবহার করছেন, তাদের জন্য রয়েছে স্বস্তির খবর।

এনইআইআর চালুর ফলে কী ঘটবে?

এনইআইআর বা ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যা মোবাইল ফোনের আইএমইআই (IMEI) নম্বর যাচাই করে সেটির বৈধতা নিশ্চিত করে। আজ থেকে এই সিস্টেম চালু হওয়ার অর্থ হলো, এখন থেকে মোবাইল নেটওয়ার্কে নতুন করে কোনো অবৈধ হ্যান্ডসেট যুক্ত হলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা হবে এবং বন্ধের প্রক্রিয়ার আওতায় আসবে।

মূলত তিনটি বিষয় যাচাই করে এনইআইআর কাজ করে:

১. হ্যান্ডসেটের আইএমইআই (IMEI) নম্বর।

২. ব্যবহারকারীর মোবাইল নম্বর (MSISDN)।

৩. সিমের আইএমএসআই (IMSI)।

এই তিনটি তথ্যের সমন্বয়ে বিটিআরসি নিশ্চিত করবে যে হ্যান্ডসেটটি বৈধভাবে আমদানী করা হয়েছে কিনা এবং নিবন্ধিত কিনা।

কাদের ফোন বন্ধ হবে, আর কাদের নয়?

এনইআইআর চালুর খবরে সাধারণ মানুষের মনে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে তা হলো “আমার হাতের ফোনটি কি বন্ধ হয়ে যাবে?” এ বিষয়ে বিটিআরসি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

বর্তমানে সচল ফোনের কী হবে?

বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কে সচল থাকা কোনো হ্যান্ডসেটই বন্ধ করা হবে না। আপনার ফোনটি বৈধ পথে আসা হোক বা অবৈধ যদি সেটি গতকাল (৩১ ডিসেম্বর) পর্যন্ত নেটওয়ার্কে অন্তত একবার সচল থেকে থাকে, তবে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধিত হয়ে যাবে এবং কোনো সমস্যা ছাড়াই চলতে থাকবে।

নতুন ফোনের ক্ষেত্রে নিয়ম

কড়াকড়ি মূলত আজ (১ জানুয়ারি) থেকে নতুন কেনা বা নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়া ফোনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। আজ থেকে কেউ যদি অবৈধ পথে আসা কোনো ফোন (যা আগে কখনো বাংলাদেশের নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়নি) চালু করার চেষ্টা করেন, তবে সেটি এনইআইআর সিস্টেমের মাধ্যমে শনাক্ত হবে এবং বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।

ব্যবসায়ীদের কাছে থাকা অবিক্রীত ফোন

ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্টকে থাকা ফোনের তথ্য জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। যেসব অবিক্রীত ফোনের আইএমইআই তালিকা বিটিআরসিতে জমা দেওয়া হয়েছে, সেগুলো পরবর্তীতে বিক্রি হলেও বন্ধ হবে না। অর্থাৎ, বৈধ ব্যবসায়ীদের কাছে থাকা স্টক নিরাপদ থাকবে।

প্রবাসীদের জন্য হ্যান্ডসেট আনার নিয়ম

প্রবাসীরা বিদেশ থেকে ফেরার সময় শুল্কমুক্ত সুবিধায় হ্যান্ডসেট আনতে পারবেন। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী এর নিয়মে কিছু স্পষ্টতা আনা হয়েছে:

  • ব্যবহৃত ফোন: প্রবাসীরা তাদের নিজের ব্যবহৃত ফোনটি কোনো শুল্ক ছাড়াই আনতে পারবেন।
  • নতুন ফোন: ব্যবহৃত ফোনের পাশাপাশি সর্বোচ্চ দুটি নতুন হ্যান্ডসেট দেশে আনা যাবে।

নিবন্ধন প্রক্রিয়া: বিদেশ থেকে আনা এসব ফোন এনইআইআরে নিবন্ধনের জন্য গ্রাহক তিন মাস সময় পাবেন। দেশে আসার পর সিম কার্ড প্রবেশ করানোর পর থেকে তিন মাস পর্যন্ত হ্যান্ডসেটটি সচল থাকবে। এর মধ্যে পাসপোর্ট, ভিসা বা ভ্রমণসংক্রান্ত নথিপত্র দিয়ে অনলাইনে বা নির্দিষ্ট সেন্টারে গিয়ে ফোনটি নিবন্ধন করে নিতে হবে। তিন মাসের মধ্যে নিবন্ধন না করলে ফোনটি নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।

কেন চালু হলো এনইআইআর?

বিটিআরসির মতে, দেশের মোবাইল বাজারের বিশৃঙ্খলা দূর করতেই এই উদ্যোগ। এর পেছনে প্রধান কারণগুলো হলো:

১. অবৈধ হ্যান্ডসেট রোধ: সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে অবৈধ বা লাগেজ পার্টির মাধ্যমে আসা ফোনের কারণে। এনইআইআর চালু হলে কর ফাঁকি দিয়ে ফোন আনা বন্ধ হবে।

২. চুরি হওয়া ফোন বন্ধ করা: ফোন চুরি বা ছিনতাই হলে এনইআইআর-এর মাধ্যমে সেটি পুরোপুরি অকেজো করে দেওয়া সম্ভব হবে, ফলে চুরির প্রবণতা কমবে।

৩. নিরাপত্তা নিশ্চিত করা: ভুয়া আইএমইআই বা ক্লোন ফোন ব্যবহার করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড রোধ করা সহজ হবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যেমন ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাজ্য এবং অস্ট্রেলিয়াতে হ্যান্ডসেট চুরিরোধ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে এমন ব্যবস্থা আগে থেকেই চালু রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডিজিটাল অর্থনীতিতে জালিয়াতি রোধে এটি একটি কার্যকর পদক্ষেপ।

শুল্ক কমানোর শর্ত ও উপদেষ্টার বক্তব্য

এনইআইআর চালুর আগে হ্যান্ডসেটের দাম এবং কর কাঠামো নিয়ে সরকারের ভেতরেও আলোচনা চলছে। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়ব একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, উপদেষ্টা পরিষদ যদি হ্যান্ডসেট আমদানি ও উৎপাদন শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তবেই এনইআইআর পূর্ণাঙ্গরূপে চালু হবে।

এর আগে গত ১০ ডিসেম্বর রাজধানীর কারওয়ান বাজারে মোবাইল বিক্রেতারা ‘গ্রে মার্কেট’ বা অবৈধ ফোন বন্ধের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছিলেন। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কার্যক্রমটি কিছুটা শিথিল বা পিছিয়ে দেওয়ার কথা উঠেছিল। তবে বিটিআরসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম পেছানোর কোনো নির্দেশনা তারা পাননি, তাই ১ জানুয়ারি থেকেই এটি কার্যকর ধরা হচ্ছে।

গোপনীয়তা ও নজরদারির উদ্বেগ

এনইআইআর একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেসে দেশের সব মানুষের সিম ও হ্যান্ডসেটের তথ্য সংরক্ষণ করবে। এ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে এর মাধ্যমে সরকার কি নাগরিকদের ওপর নজরদারি চালাবে?

বিটিআরসি আশ্বস্ত করে বলেছে, এনইআইআর কারিগরিভাবে শুধুমাত্র হ্যান্ডসেট ও সিমের বৈধতা যাচাই করে। এটি কোনো গ্রাহকের কল রেকর্ড করে না, মেসেজ বা এসএমএস পড়তে পারে না এবং ইন্টারনেট ব্রাউজিং ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করে না।

আইনি সুরক্ষা

ব্যবহারকারীদের শঙ্কা কাটাতে এবং গোপনীয়তা রক্ষায় সরকার আইনি ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছে। ফয়েজ আহমদ তৈয়ব জানান, গত ২৪ ডিসেম্বর উপদেষ্টা পরিষদে অনুমোদিত সংশোধিত টেলিযোগাযোগ অধ্যাদেশে নাগরিকদের সুরক্ষায় বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে।

  • সিম ও ডিভাইস নিবন্ধনের মাধ্যমে নাগরিকদের ওপর নজরদারি বা হয়রানি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
  • যদি কোনো কর্মকর্তা বা সংস্থা এই তথ্যের অপব্যবহার করে, তবে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।


এনইআইআর চালু হওয়া দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের জন্য একটি বড় মাইলফলক। এটি যেমন রাজস্ব আয় বাড়াতে সহায়তা করবে, তেমনি মোবাইল ফোন চুরি রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। তবে সাধারণ গ্রাহকদের ভোগান্তি কমাতে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ রাখা এবং সার্ভারের জটিলতা এড়ানো জরুরি। একইসঙ্গে, হ্যান্ডসেটের ওপর শুল্ক কমিয়ে তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখলে অবৈধ ফোনের চাহিদা এমনিতেই কমে যাবে বলে মনে করেন বাজার বিশ্লেষকরা।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img
error: Content is protected !!