হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
বৃহস্পতিবার, জুন ১১, ২০২৬
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeইসলাম ও জীবনঘরে প্রবেশের দোয়া: আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থসহ সুন্নাহ পদ্ধতি
spot_img

ঘরে প্রবেশের দোয়া: আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থসহ সুন্নাহ পদ্ধতি

প্রতিটি মুসলিমের জীবন আল্লাহর নির্দেশ এবং রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহ মোতাবেক পরিচালিত হওয়া উচিত। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি কাজের শুরু ও শেষে নির্দিষ্ট কিছু দোয়া ও আমল রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো ঘরে প্রবেশের দোয়া এবং ঘর থেকে বের হওয়ার আমল।

আমরা যখন সারাদিনের কাজ শেষে ঘরে ফিরি, তখন শয়তানও আমাদের সাথে ঘরে প্রবেশ করার চেষ্টা করে। কিন্তু আমরা যদি সুন্নাহ মেনে, আল্লাহর নাম নিয়ে এবং নির্দিষ্ট দোয়া পড়ে ঘরে প্রবেশ করি, তাহলে আমাদের ঘর শয়তানের প্রভাবমুক্ত থাকে এবং আল্লাহ তায়ালা সেই ঘরে বরকত নাযিল করেন। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা ঘরে প্রবেশের দোয়া, আরবি ও বাংলা উচ্চারণ, অর্থ এবং প্রবেশের সঠিক সুন্নাহ পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

ঘরে প্রবেশের দোয়া আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ

হাদিস শরীফে রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘরে প্রবেশের সময় একটি নির্দিষ্ট দোয়া পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সুনানে আবু দাউদ শরীফের বর্ণনায় এই দোয়াটি পাওয়া যায়। দোয়াটি মুখস্থ করে নেওয়া প্রতিটি মুমিনের জন্য কল্যাণকর।

ঘরে প্রবেশের দোয়া আরবি উচ্চারণ

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَ الْمَوْلَجِ وَخَيْرَ الْمَخْرَجِ بِسْمِ اللَّهِ وَلَجْنَا وَبِسْمِ اللَّهِ خَرَجْنَا وَعَلَى اللَّهِ رَبِّنَا تَوَكَّلْنَا

ঘরে প্রবেশের দোয়া বাংলা উচ্চারণ

“আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা খাইরাল মাওলাজি ওয়া খাইরাল মাখরাজি; বিসমিল্লাহি ওয়ালাজনা ওয়া বিসমিল্লাহি খারাজনা, ওয়া আলাল্লাহি রাব্বিনা তাওয়াক্কালনা।”

ঘরে প্রবেশের দোয়া বাংলা অর্থ

“হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট আগমন ও প্রস্থান (ঘরে প্রবেশ ও বের হওয়া) উভয় পথের কল্যাণ কামনা করছি। আমরা আল্লাহর নামে প্রবেশ করলাম, আল্লাহর নামেই বের হলাম এবং আমাদের রব আল্লাহর ওপরই ভরসা করলাম।”

(সূত্র: সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫০৯৬)

বিশেষ দ্রষ্টব্য: দোয়াটি পড়ার পর ঘরে উপস্থিত সদস্যদের সালাম দেওয়া সুন্নাত।

ঘরে প্রবেশের সুন্নাহ ও আদবসমূহ

শুধুমাত্র দোয়া পড়াই শেষ কথা নয়, ঘরে প্রবেশের সময় রাসূলুল্লাহ (সা.) বেশ কিছু আদব ও সুন্নাহ পালন করতেন। এই নিয়মগুলো মেনে চললে পারিবারিক জীবনে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় থাকে। নিচে ঘরে প্রবেশের ৫টি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ আলোচনা করা হলো:

১. অনুমতি নেওয়া বা নক করা: নিজের ঘর হলেও হুট করে ভেতরে ঢুকে পড়া উচিত নয়। বিশেষ করে দরজা বন্ধ থাকলে নক করা বা বেল বাজানো উচিত, যাতে ঘরের ভেতরের সদস্যরা সতর্ক হতে পারেন এবং पर्দা রক্ষা করতে পারেন।

২. ডান পা দিয়ে প্রবেশ করা: যেকোনো ভালো কাজে ডান দিকের ব্যবহার ইসলামের শিক্ষা। মসজিদ এবং ঘরের মতো পবিত্র ও নিরাপদ স্থানে প্রবেশের সময় ডান পা আগে দেওয়া সুন্নাহ।

৩. বিসমিল্লাহ বলা: প্রবেশের মুহূর্তে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা অত্যন্ত জরুরি। এটি শয়তানকে ঘর থেকে দূরে রাখে।

৪. সালাম দেওয়া: ঘরে প্রবেশ করে পরিবারের সদস্যদের উচ্চস্বরে সালাম দেওয়া (আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ) একটি বড় ইবাদত। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, “যখন তোমরা ঘরে প্রবেশ করবে, তখন তোমরা তোমাদের স্বজনদের প্রতি সালাম করবে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণময় ও পবিত্র অভিবাদন।” (সূরা আন-নূর: ৬১)

৫. মিসওয়াক করা: রাসূলুল্লাহ (সা.) যখনই ঘরে প্রবেশ করতেন, তখন তিনি মিসওয়াক করতেন। এটি পরিবারের সদস্যদের সামনে নিজেকে পরিচ্ছন্ন ও দুর্গন্ধমুক্ত উপস্থাপন করার একটি মাধ্যম। (সহীহ মুসলিম)

বিসমিল্লাহ বলে ঘরে প্রবেশের ফজিলত ও গুরুত্ব

অনেকে ঘরে ঢোকার সময় আল্লাহর নাম নিতে ভুলে যান। অথচ হাদিসে এর ভয়াবহ পরিণতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আবার যারা আল্লাহর নাম নিয়ে প্রবেশ করেন, তাদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ।

সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

“যখন কোনো ব্যক্তি নিজের ঘরে প্রবেশের সময় এবং খাবার গ্রহণের সময় আল্লাহকে স্মরণ করে (বিসমিল্লাহ বলে), তখন শয়তান তার সঙ্গীদের বলে ‘আজকের রাতে তোমাদের জন্য এই ঘরে থাকার কোনো জায়গা নেই এবং খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই।’

পক্ষান্তরে, যখন সে ঘরে প্রবেশের সময় আল্লাহকে স্মরণ করে না, তখন শয়তান বলে ‘তোমরা থাকার জায়গা পেয়ে গেলে।’ আর যখন সে খাবার গ্রহণের সময়ও আল্লাহকে স্মরণ করে না, তখন শয়তান বলে ‘তোমরা থাকার জায়গাও পেলে এবং রাতের খাবারও পেলে’।” (সহীহ মুসলিম: ২০১৭)

সুতরাং, আমাদের ঘরকে শয়তানের আস্তানা হওয়া থেকে বাঁচাতে হলে প্রবেশের সময় বিসমিল্লাহ বলা এবং দোয়া পড়া অপরিহার্য।

ঘরে কেউ না থাকলে কীভাবে সালাম দেবেন?

এটি একটি সাধারণ প্রশ্ন। অনেক সময় আমরা ফাঁকা বাসায় প্রবেশ করি। তখন কাকে সালাম দেব?

ইসলামী বিধান অনুযায়ী, ঘরে কেউ না থাকলেও সালাম দেওয়া উচিত। কারণ, সেখানে রহমতের ফেরেশতারা থাকেন। এছাড়া মুমিন ব্যক্তি নিজেকেও সালাম দিতে পারেন। ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন ঘরে কেউ না থাকে তখন বলবে:

“আসসালামু আলাইনা ওয়া আলা ইবাদিল্লাহিস সালিহীন”

অর্থ: আমাদের ওপর এবং আল্লাহর নেক বান্দাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।

এতে ঘরের পরিবেশ শান্তিময় হয় এবং একাকীত্ব বা ভয় দূর হয়।

ঘর থেকে বের হওয়ার দোয়া আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ

ঘরে প্রবেশের যেমন দোয়া আছে, তেমনি ঘর থেকে বের হওয়ার সময়ও মহানবী (সা.) একটি বিশেষ দোয়া পড়ার শিক্ষা দিয়েছেন। এই দোয়াটি পড়লে মানুষ যাবতীয় বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা পায়।

ঘর থেকে বের হওয়ার দোয়া আরবি উচ্চারণ | ghor theke ber howar dua arabic uchcharon

বাসা থেকে বের হওয়ার দোয়া আরবি উচ্চারণ নিচে দেয়া হলো:

بِسْمِ اللَّهِ تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ، لاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللَّهِ

ঘর থেকে বের হওয়ার দোয়া বাংলা উচ্চারণ | ghor theke ber howar dua bangla uchcharon

“বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ, লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।”

ঘর থেকে বের হওয়ার দোয়া বাংলা অর্থ | ghor theke ber howar doya bangla ortho

“আল্লাহর নামে (বের হচ্ছি), আল্লাহর ওপর ভরসা করলাম। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া (পাপ থেকে ফেরা ও নেক কাজ করার) কোনো শক্তি ও সামর্থ্য নেই।”

ঘর থেকে বের হওয়ার দোয়া ও ফজিলত

তিরমিজি শরীফের হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি ঘর থেকে বের হওয়ার সময় এই দোয়াটি পাঠ করবে, তাকে (আল্লাহর পক্ষ থেকে) বলা হয় “তোমার জন্য এটাই যথেষ্ট, তোমাকে হেদায়েত দেওয়া হয়েছে এবং তোমাকে অনিষ্ট থেকে রক্ষা করা হয়েছে।” তখন শয়তান হতাশ হয়ে তার থেকে দূরে সরে যায়।

ইসলামি শরীয়ত অনুযায়ী ঘর থেকে বের হওয়ার নিয়ম

হাদিস ও সুন্নাহ অনুযায়ী ঘর থেকে বের হওয়ার সময় কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম ও দোয়া রয়েছে, যা মেনে চললে শয়তানের অনিষ্ট থেকে রক্ষা পাওয়া যায় এবং যাত্রা নিরাপদ হয়।

  • সালাম দেওয়া: ঘর থেকে বের হওয়ার সময় পরিবারের সদস্যদের সালাম দিয়ে বের হওয়া সুন্নাত।
  • বাম পা আগে দেওয়া: ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বাম পা দিয়ে বের হওয়া উত্তম। (উল্লেখ্য, ঘরে প্রবেশের সময় ডান পা দেওয়া সুন্নাত)।
  • দরজা খোলার সময় বিসমিল্লাহ বলা: ঘর থেকে বের হওয়ার সময় ‘বিসমিল্লাহ’ বলে দরজা খোলা সুন্নাত।
  • ঘর থেকে বের হওয়ার দোয়া: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ঘর থেকে বের হওয়ার সময় এই দোয়াটি পড়ে, শয়তান তার থেকে দূরে সরে যায় এবং সে আল্লাহর জিম্মায় চলে যায়।
  • আকাশের দিকে তাকিয়ে দোয়া: রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘর থেকে বের হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে একটি বিশেষ দোয়া পড়তেন, যা মানুষকে পথভ্রষ্টতা থেকে মুক্তি চায়।

ঘরে প্রবেশের দোয়া এবং এর সুন্নাহগুলো পালন করা আপাতদৃষ্টিতে ছোট কাজ মনে হতে পারে, কিন্তু এর প্রভাব অপরিসীম। এটি আমাদের ঘরকে শয়তানের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখে, পারিবারিক কলহ দূর করে এবং আল্লাহর রহমত নাজিল করে।

আসুন, আমরা আজ থেকেই প্রতিজ্ঞা করি—ঘরে প্রবেশের সময় মোবাইল ফোন বা দুনিয়াবি চিন্তায় মগ্ন না থেকে, সচেতনভাবে আল্লাহর নাম নেব, ডান পা দিয়ে প্রবেশ করব এবং হাসিমুখে পরিবারকে সালাম দেব। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই সুন্নাহগুলো আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

ঘরে প্রবেশের দোয়া সম্পর্কিত প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ) 

প্রশ্ন: ঘরে প্রবেশের দোয়া কোনটি?

উত্তর: ঘরে প্রবেশের দোয়া হলো “আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা খাইরাল মাওলাজি ওয়া খাইরাল মাখরাজি…” (আবু দাউদ: ৫০৯৬)। সংক্ষেপে শুধু ‘বিসমিল্লাহ’ বলে প্রবেশ করলেও সুন্নাহ আদায় হবে।

প্রশ্ন: ঘরে প্রবেশের সময় কোন পা আগে দিতে হয়?

উত্তর: ঘরে প্রবেশের সময় ডান পা আগে দেওয়া সুন্নাহ। কারণ ঘর একটি মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ স্থান।

প্রশ্ন: ঘর থেকে বাহির হওয়ার দোয়া কি?

উত্তর: ঘর থেকে বের হওয়ার দোয়া হলো “বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ, লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।”

প্রশ্ন: খালি ঘরে প্রবেশ করলে কি সালাম দিতে হবে?

উত্তর: হ্যাঁ, খালি ঘরে প্রবেশ করলেও সালাম দেওয়া উচিত। তখন বলতে হয় “আসসালামু আলাইনা ওয়া আলা ইবাদিল্লাহিস সালিহীন”।

প্রশ্ন: সালাম আগে দেব নাকি ঘরে প্রবেশের দোয়া আগে পড়ব?

উত্তর: প্রথমে প্রবেশের দোয়া পড়ে (বা বিসমিল্লাহ বলে) ঘরে ঢুকবেন, তারপর ঘরের মানুষদের সালাম দেবেন। সালাম হলো মানুষের জন্য অভিবাদন।

প্রশ্ন: বাথরুম যুক্ত ঘরে প্রবেশের নিয়ম কী?

উত্তর: বর্তমান ফ্ল্যাট বাড়িতে ঘরের ভেতরেই বাথরুম থাকে। মূল দরজা দিয়ে ঢোকার সময় সাধারণ প্রবেশের দোয়াই পড়বেন। শুধুমাত্র বাথরুমের নির্দিষ্ট দরজায় ঢোকার সময় বাথরুমের দোয়া পড়বেন।

প্রশ্ন: ঘরে প্রবেশের সময় বিসমিল্লাহ না বললে কি হয়?

উত্তর: হাদিস অনুযায়ী, বিসমিল্লাহ না বলে ঘরে প্রবেশ করলে শয়তান সেই ঘরে রাত কাটানোর সুযোগ পায়, যা পরিবারের জন্য অকল্যাণকর।

প্রশ্ন: নিজের স্ত্রী বা স্বামীকে কি সালাম দেওয়া যাবে?

উত্তর: অবশ্যই। নিজের মাহরাম আত্মীয়, স্ত্রী বা স্বামীকে সালাম দেওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ এবং এতে পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়।

প্রশ্ন: মেহমান হিসেবে কারো ঘরে প্রবেশের আদব কী?

উত্তর: মেহমান হিসেবে গেলে অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত দৃষ্টি অবনত রাখা উচিত এবং তিনবার অনুমতি চাওয়ার পর সাড়া না পেলে ফিরে আসা উচিত।

প্রশ্ন: বাচ্চাদের ঘরে প্রবেশের দোয়া শেখানোর সহজ উপায় কী?

উত্তর: প্রতিদিন ঘরে ঢোকার সময় উচ্চস্বরে দোয়াটি পড়ুন এবং সালাম দিন। শিশুরা অনুকরণপ্রিয়, তারা আপনাকে দেখেই দ্রুত শিখে নেবে।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img
error: Content is protected !!