দীর্ঘ তিন ম্যাচের জয়হীন থাকার পর রিয়াল মাদ্রিদ শিবিরে যখন হতাশা দানা বাঁধছিল, ঠিক তখনই ত্রাতা হয়ে এলেন ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে। মাত্র এক জয়ের শঙ্কা নিয়ে নভেম্বর মাস শেষ করার দুশ্চিন্তা ছিল রিয়াল মাদ্রিদ শিবিরে। সেই ২ নভেম্বর ভ্যালেন্সিয়ার বিপক্ষে ৪-০ গোলে জয়ের পর কোনো প্রতিযোগিতাতেই আর জয়ের দেখা মেলেনি স্প্যানিশ জায়ান্টদের। তবে বুধবার রাতে অলিম্পিয়াকোসের মাঠে অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়নস লিগের ম্যাচে একাই চার গোল করে সেই খরা কাটালেন এমবাপ্পে। তার অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সে রিয়াল মাদ্রিদ ৪-৩ গোলে অলিম্পিয়াকোসকে পরাজিত করে তাদের জয়ের ধারায় ফিরল।
এই জয়ের মাধ্যমে রিয়াল মাদ্রিদ শুধু তাদের তিন ম্যাচের জয়হীন ধারা ভাঙল না, বরং চ্যাম্পিয়নস লিগের মঞ্চে নিজেদের অবস্থানও আরও শক্ত করল। এমবাপ্পের পায়ের জাদুতে গ্রিসের মাটিতে এক নতুন ইতিহাস লিখল রিয়াল।
শুরুতেই পিছিয়ে পড়া রিয়াল: চমকে দিল অলিম্পিয়াকোস
ম্যাচের শুরুটা রিয়াল মাদ্রিদের জন্য মোটেও সহজ ছিল না। গ্রিসের ক্লাব অলিম্পিয়াকোস নিজেদের মাঠে শুরুতেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে এবং অপ্রত্যাশিতভাবে এগিয়ে যায়।
চিকিনিয়োর গোলে এগিয়ে গেল অলিম্পিয়াকোস
ম্যাচের শুরুতেই চমক দেখান অলিম্পিয়াকোসের তারকা খেলোয়াড় চিকিনিয়ো। ২০ গজ দূর থেকে তার নেওয়া দারুণ এক শট রিয়াল মাদ্রিদের গোলপোস্টে জড়িয়ে যায়। রিয়ালের গোলরক্ষক আন্দ্রি লুনিনের কিছু করার ছিল না। ২০ মিনিটের মাথায় এই গোলটি করে অলিম্পিয়াকোস তাদের সমর্থকদের উল্লাসে মাতিয়ে তোলে এবং রিয়াল মাদ্রিদ শিবিরে চাপ সৃষ্টি করে। উল্লেখ্য, রিয়ালের নিয়মিত গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া অসুস্থ থাকায় এই ম্যাচে গোলপোস্ট সামলাচ্ছিলেন আন্দ্রি লুনিন।
এমবাপ্পের ঝলক: ৬ মিনিটেই হ্যাটট্রিক!
১-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পরই যেন ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি চলে গেল কিলিয়ান এমবাপ্পের হাতে। অলিম্পিয়াকোসের ডিফেন্সকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে মাত্র ৬ মিনিট ৪২ সেকেন্ডের ব্যবধানে তিনি করে বসলেন এক অবিশ্বাস্য হ্যাটট্রিক।
প্রথম গোল: সমতা ফেরালেন এমবাপ্পে
অলিম্পিয়াকোসের এগিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই রিয়াল মাদ্রিদ পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। ২২ মিনিটে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের দুর্দান্ত এক পাস ধরে এমবাপ্পে নিজের গতিতে বল নিয়ে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের কাটিয়ে এগিয়ে যান। গোলরক্ষক কোস্তাস জোলাকিসের পায়ের ফাঁক দিয়ে বল জালে পাঠিয়ে তিনি সঙ্গে সঙ্গে রিয়াল মাদ্রিদকে ম্যাচে ১-১ গোলে সমতায় ফেরান।
দ্বিতীয় গোল: দুর্দান্ত হেড
প্রথম গোল করার মাত্র দুই মিনিট পরেই নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন এমবাপ্পে। এই গোলের কারিগর ছিলেন রিয়ালের তরুণ তুর্কি আরদা গুলের। তার ক্রস থেকে নিচু হয়ে দুর্দান্ত এক হেডে বল জালে জড়ান এমবাপ্পে। মাত্র ২৪ মিনিটের মাথায় রিয়াল মাদ্রিদ ২-১ গোলে এগিয়ে যায়। এমবাপ্পের এই গোলটি ছিল তার অসাধারণ ফিনিশিং ক্ষমতার প্রমাণ।
চ্যাম্পিয়নস লিগের দ্বিতীয় দ্রুততম হ্যাটট্রিক
এমবাপ্পে এরপর নিজের হ্যাটট্রিক পূরণ করতে একদমই দেরি করেননি। প্রথম গোলের পর মাত্র ছয় মিনিট ৪২ সেকেন্ডের মধ্যেই ডিফেন্স ভেঙে এগিয়ে গিয়ে ঠান্ডা মাথায় বল জালে পাঠিয়ে তিনি হ্যাটট্রিক সম্পন্ন করেন। তার এই হ্যাটট্রিকটি ছিল চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসে দ্বিতীয় দ্রুততম হ্যাটট্রিক। এর আগে কেবল লিভারপুলের মোহামেদ সালাহ ২০২২ সালে রেঞ্জার্সের বিপক্ষে আরও দ্রুত হ্যাটট্রিক করার রেকর্ড গড়েছিলেন। এমবাপ্পের এই অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স ফুটবলপ্রেমীদের মনে দীর্ঘদিন ধরে থাকবে।
অলিম্পিয়াকোসের লড়াই ও এমবাপ্পের চতুর্থ গোল
প্রথমার্ধে ৩-১ গোলে পিছিয়ে গেলেও দ্বিতীয়ার্ধে অলিম্পিয়াকোস দারুণভাবে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করে।
মেহদি তারেমির হেড
প্রথমার্ধে চোট পেয়ে মাঠ ছেড়ে যাওয়া চিকিনিয়োর বদলি হিসেবে নামা মেহদি তারেমি দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই দারুণ এক হেডে গোল করে অলিম্পিয়াকোসের আশা বাঁচিয়ে রাখেন। ৫২ মিনিটের মাথায় এই গোলটি করে তিনি ব্যবধান ৩-২-এ নিয়ে আসেন। অলিম্পিয়াকোসের খেলোয়াড়রা এই গোলে উজ্জীবিত হয় এবং রিয়াল মাদ্রিদের ডিফেন্সে চাপ বাড়ায়।
গ্রিসের ইতিহাস বদলালেন এমবাপ্পে
তবে এমবাপ্পেকে থামানো যাচ্ছিল না। গ্রিসে এর আগে সাতবার গিয়ে রিয়াল মাদ্রিদ কখনো জয় নিয়ে ফিরতে পারেনি। কিন্তু এমবাপ্পে সেই ইতিহাসও বদলে দেওয়ার পণ করেছিলেন। অলিম্পিয়াকোস যখন ম্যাচে ফেরার স্বপ্ন দেখছিল, ঠিক তখনই ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের কাছ থেকে বল পেয়ে নিজের চতুর্থ গোলটি করেন এমবাপ্পে। তার এই গোলটি রিয়াল মাদ্রিদকে ৪-২ গোলে এগিয়ে দেয় এবং ম্যাচে তাদের জয় নিশ্চিত করে।
এই গোলের পর চ্যাম্পিয়নস লিগে এমবাপ্পের মোট গোল সংখ্যা দাঁড়াল পাঁচ ম্যাচে নয়টিতে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ভিক্টর ওসিমহেনের চেয়ে তিনি তিন গোল এগিয়ে থেকে গোলদাতার তালিকায় শীর্ষস্থান ধরে রেখেছেন।
আয়ুব এল কাবির সান্ত্বনা গোল
ম্যাচের শেষ দিকে অলিম্পিয়াকোসের খেলোয়াড় আয়ুব এল কাবি গোল করে ব্যবধান কমালেও (৪-৩), রিয়াল মাদ্রিদ নিজেদের লিড ধরে রেখে শেষ পর্যন্ত ম্যাচ জিতে নেয়।
পাঁচ ম্যাচে এটি রিয়াল মাদ্রিদের চতুর্থ জয়। লিভারপুলের কাছে শেষ ম্যাচে হারের পর তারা এই বড় জয় দিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়ালো এবং চ্যাম্পিয়নস লিগে নিজেদের নকআউট পর্বের পথে আরও এগিয়ে গেল। এমবাপ্পের এমন একার হাতে ম্যাচ জেতানো পারফরম্যান্স নিশ্চিতভাবেই রিয়াল মাদ্রিদকে বড় স্বস্তি এনে দিল।








