যেকোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়, যুদ্ধ-বিগ্রহ, অগ্নিকাণ্ড কিংবা মহামারি বিপদের সময়ে যে চিহ্নটি মানুষকে জীবনের নতুন আশা দেখায়, তা হলো লাল কাস্তে ও তারকার প্রতীকসংবলিত বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (BDRCS)। সংস্থাটি শতভাগ অরাজনৈতিক, অসাম্প্রদায়িক ও নিরপেক্ষভাবে মানবতার সেবা করে আসছে।
১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরপরই প্রেসিডেন্ট আদেশ নং ২৬-এর মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ রেড ক্রস সোসাইটি’ হিসেবে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে সংস্থাটির নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি’ রাখা হয়। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট আন্দোলনের (IFRC ও ICRC) অন্যতম সদস্য হিসেবে এবং সরকারি সাহায্যকারী সংস্থা (Auxiliary to Public Authorities) হিসেবে BDRCS সাধারণ মানুষের প্রাণরক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে অসাধারণ ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশে BDRCS-এর বহুমুখী সেবা ও ইতিবাচক উদ্যোগসমূহ
বাংলাদেশের দুর্যোগপ্রবণ ভৌগোলিক অবস্থানের কথা বিবেচনা করলে রেড ক্রিসেন্টের ভূমিকা অপরিসীম। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে তাদের সেবামূলক কার্যক্রম বিস্তৃত:
- সাইক্লোন প্রিপেয়ার্ডনেস প্রোগ্রাম (CPP): দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় BDRCS-এর সবচেয়ে সফল ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত উদ্যোগ হলো এটি। উপকূলীয় অঞ্চলে কয়েক লাখ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবী রয়েছে, যারা ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের আগে বিপদ সংকেত পৌঁছানো, সাধারণ মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া এবং উদ্ধার অভিযান পরিচালনায় সরাসরি অংশ নেন।
- বিনামূল্যে রক্তদান ও ব্লাড ব্যাংক পরিচালনা: রক্ত সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়াতে বিডিআরসিএস দেশের সবচেয়ে বড় ব্লাড ব্যাংক নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে। ধানমন্ডিস্থ কেন্দ্রীয় রক্তকেন্দ্রসহ সারা দেশে তাদের একাধিক আধুনিক ব্লাড ব্যাংক রয়েছে। প্রতিদিন অসংখ্য মুমূর্ষু রোগী, থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশু ও দুর্ঘটনাকবলিত মানুষ এখান থেকে নিরাপদ রক্ত পেয়ে থাকে।
- স্বাস্থ্যসেবা ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা: দেশের সাধারণ মানুষকে সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চিকিৎসা দিতে বিডিআরসিএস অসংখ্য মাতৃমঙ্গল কেন্দ্র, চক্ষু হাসপাতাল, জেনারেল হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিক পরিচালনা করছে। বিশেষ করে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় তাদের কাজ অত্যন্ত প্রসংশিত।
- জরুরি ত্রাণ বিতরণ ও টেকসই পুনর্বাসন: বন্যা, কালবৈশাখী, নদীভাঙন বা অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে সঙ্গে সঙ্গে শুষ্ক খাবার, বিশুদ্ধ খাবার পানি, হাইজিন কিট (স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী), তারপোলিন ও রান্নার সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া হয়। শুধু সাময়িক ত্রাণ নয়, ক্ষতিগ্রস্তদের ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ এবং জীবিকা নির্বাহের জন্য আর্থিক সাহায্যও দেওয়া হয়।
- যুব ও রেড ক্রিসেন্ট ভলান্টিয়ার্স (YRC): দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক চিকিৎসা, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। যুব রেড ক্রিসেন্টের হাজার হাজার তরুণ ভলান্টিয়ার যেকোনো জাতীয় সংকটে প্রথম সারির যোদ্ধা হিসেবে কাজ করেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিডিআরসিএস-এর প্রশংসনীয় অবদান
বাংলাদেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রেও BDRCS আজ এক নামকরা এবং বিশ্বস্ত নাম:
- রোহিংশা মানবিক সংকট মোকাবিলা: কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ এবং নোয়াখালীর ভাসানচরে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য সর্ববৃহৎ মানবিক সহায়তা প্রদান করছে বিডিআরসিএস। স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, সুপেয় পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন এবং তাদের মানসিক সুরক্ষায় বৈশ্বিক রেড ক্রিসেন্ট নেটওয়ার্কের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে তারা।
- আন্তর্জাতিক সাহায্য ও রেসকিউ টিম প্রেরণ: বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটে গেলে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট তাদের দক্ষ উদ্ধারকারী ও চিকিৎসকদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কে যুক্ত করে। অন্যান্য দেশে ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়ে আন্তর্জাতিক সহমর্মিতার বড় দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তারা।
- রেস্টোরিং ফ্যামিলি লিংকস (RFL): যুদ্ধ, সংঘাত বা রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিভিন্ন দেশের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া স্বজনদের খুঁজে বের করতে এবং তাদের মধ্যে আবার যোগাযোগের পথ তৈরি করতে বিডিআরসিএস-এর RFL বিভাগ বিশ্বজুড়ে রেড ক্রসের সাথে কাজ করে থাকে।
মানবসেবায় এক অবিচল অগ্রযাত্রা
আজকের বাংলাদেশে মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (BDRCS) একটি মূল চালিকাশক্তি। দেশের কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাস ও ভরসার প্রতীক হয়ে তারা প্রতিমুহূর্তে প্রমাণ করে চলেছে যে মানবসেবাই তাদের পরম ধর্ম। তাদের এই নিঃস্বার্থ অবদান জাতীয় উন্নতিতে যেমন গতি আনছে, ঠিক তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সম্মান বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।








