বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসে যুক্ত হলো সাফল্যের আরও একটি নতুন পালক। নৌবাহিনীর আধুনিকায়ন এবং ত্রিমাত্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এবার নৌবহরে সংযোজিত হলো সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ল্যান্ডিং ক্রাফট ট্যাংক ‘এলসিটি ১০১’ (LCT-101)। বুধবার (১৫ জানুয়ারি) খুলনায় অবস্থিত খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেডে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই জাহাজটির লঞ্চিং অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান। তিনি এই আধুনিক জলযানটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এই জাহাজটি শুধুমাত্র নৌবাহিনীর শক্তিই বাড়াবে না, বরং বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পের দক্ষতারও একটি বড় প্রমাণ।
এলসিটি ১০১ এর বিশেষত্ব ও ক্ষমতা
সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, এই জাহাজটি আসলে কী কাজে লাগবে বা এর ক্ষমতা কতটুকু? সহজ কথায়, এটি এমন একটি জলযান যা যুদ্ধের সময় ট্যাংক এবং ভারী সামরিক যান পরিবহনে ব্যবহৃত হয়।
খুলনা শিপইয়ার্ডের তথ্য অনুযায়ী, এলসিটি ১০১ জাহাজটি অত্যন্ত শক্তিশালী। এর পরিবহন ক্ষমতা শুনলে আপনি অবাক হবেন। এটি একাই বহন করতে পারে:
- একসাথে ৬টি ভারী ট্যাংক।
- অথবা ১২টি আর্মার্ড পারসোনেল ক্যারিয়ার (APC)।
- কিংবা ১৮টি সামরিক ট্রাক বা যান।
এই বিশাল পরিবহন ক্ষমতার কারণে উপকূলীয় এলাকায় যেকোনো অপারেশন বা অভিযানে নৌবাহিনী এখন আরও দ্রুত এবং কার্যকরভাবে মুভ করতে পারবে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় ‘এলসিটি ১০১’ এর ভূমিকা
বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ। প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের উপকূলে আঘাত হানে। যুদ্ধের পাশাপাশি শান্তির সময়েও এই জাহাজটি মানুষের পাশে দাঁড়াবে।
নৌবাহিনী প্রধান জানান, উপকূলীয় ও এমফিবিয়াস (উভচর) অপারেশনের পাশাপাশি এই জাহাজটি দুর্যোগ পরবর্তী উদ্ধার কাজ ও মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। দুর্গম চরাঞ্চল বা উপকূলীয় এলাকায় যেখানে সাধারণ জাহাজ ভিড়তে পারে না, সেখানে এই ল্যান্ডিং ক্রাফট সহজেই ত্রাণ ও সহায়তা নিয়ে পৌঁছে যাবে।
খুলনা শিপইয়ার্ড: দেশীয় সক্ষমতার প্রতীক
রূপসা নদীর তীরে অবস্থিত খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড বর্তমানে আন্তর্জাতিক মানের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান। এক সময় বিদেশ থেকে যুদ্ধজাহাজ কিনতে হতো, আর এখন আমাদের দেশেই তৈরি হচ্ছে বিশ্বমানের যুদ্ধজাহাজ।
এলসিটি ১০১ নির্মাণের মাধ্যমে খুলনা শিপইয়ার্ড তাদের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের প্রমাণ দিয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্লাসিফিকেশন সোসাইটির তত্ত্বাবধান এবং আইএসও (ISO) নির্দেশনা মেনে তৈরি এই জাহাজটি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ এখন ভারী শিল্প ও জাহাজ নির্মাণে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পথে। দক্ষ জনবল আর আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় তৈরি এই জাহাজটি দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
নৌবাহিনীর আধুনিকায়ন ও ভবিষ্যৎ
বর্তমান সরকার এবং নৌবাহিনী সদর দপ্তর ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ এর আলোকে নৌবাহিনীকে একটি আধুনিক ও ত্রিমাত্রিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার কাজ করে যাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় যুক্ত হলো এই নতুন ল্যান্ডিং ক্রাফট। নিজস্ব প্রযুক্তিতে এমন ভারী যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।
এলসিটি ১০১ শুধুমাত্র একটি লোহা-লক্করের জাহাজ নয়, এটি বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস ও সক্ষমতার প্রতীক। এই সংযোজন দেশের জলসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি উপকূলীয় মানুষের জান-মাল রক্ষায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।








