বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক পরিস্থিতি। গত ২৩ নভেম্বর রাতে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তির পর থেকেই তাঁর অবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও জনমনে গভীর উদ্বেগ বিরাজ করছে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার পাশাপাশি তাঁর চিকিৎসায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।
আজ সোমবার (১ ডিসেম্বর), তাঁর চিকিৎসার জন্য রাজধানীতে এসে পৌঁছেছেন পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ বিদেশি চিকিৎসক দল। এই দলটি সরাসরি এভারকেয়ার হাসপাতালে এসে দেশি মেডিকেল বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন। নেত্রীর বর্তমান অবস্থাকে দলের পক্ষ থেকে ‘অত্যন্ত সংকটাপন্ন’ বলে জানানো হয়েছে, যা তাঁর ভক্ত ও কর্মীদের মধ্যে গভীর উৎকণ্ঠা তৈরি করেছে।
বেগম জিয়ার বর্তমান স্বাস্থ্য পরিস্থিতি: যা জানা গেল
বিএনপি ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আযম খান দুপুরে গণমাধ্যমকে বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য সম্পর্কে যে তথ্য দিয়েছেন, তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে নেত্রীর অবস্থা ‘অত্যন্ত সংকটাপন্ন’।
নেত্রীর অবস্থা ‘ডিপ কন্ডিশনে’ কেন?
আহমেদ আযম খান সাংবাদিকদের সামনে বেগম জিয়ার শারীরিক অবস্থার গভীরতা বোঝাতে গিয়ে ‘খুবই ডিপ কন্ডিশনে’ শব্দটি ব্যবহার করেন। এর ব্যাখ্যা তিনি বিশদভাবে দিতে না চাইলেও উল্লেখ করেন যে, এটিকে ‘ভেন্টিলেশন বা খুব ডিপ কন্ডিশন’ হিসেবে ধরে নেওয়া যেতে পারে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, ‘ডিপ কন্ডিশন’ বা ‘সংকটাপন্ন অবস্থা’ সাধারণত তখনই বলা হয় যখন রোগীর জীবনরক্ষাকারী অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ (যেমন: কিডনি, ফুসফুস বা হৃদযন্ত্র) স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারাতে শুরু করে এবং তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে লাইফ সাপোর্টের কাছাকাছি কোনো অবস্থায় রাখতে হয়।
নেত্রীর দীর্ঘদিনের অসুস্থতার ইতিহাস বিবেচনা করলে বোঝা যায়, এই গভীর সংকটাপন্ন অবস্থা হঠাৎ আসেনি, বরং এটি একাধিক পুরনো জটিলতার সম্মিলিত ফল।
বিদেশি চিকিৎসক দলের আগমন
বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতির খবর আসার পরপরই তাঁর চিকিৎসার জন্য পাঁচ সদস্যের বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল ঢাকায় এসে পৌঁছেছেন। সোমবার (১ ডিসেম্বর) তাঁরা সরাসরি এভারকেয়ার হাসপাতালে আসেন। এই চিকিৎসক দলের আগমনের মূল উদ্দেশ্য হলো:
- দেশি মেডিকেল বোর্ডের সাথে বর্তমান চিকিৎসা পদ্ধতির মূল্যায়ন করা।
- রোগীর জটিলতাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা।
- বিশেষায়িত জ্ঞান প্রয়োগ করে পরবর্তী চিকিৎসার পথ নির্ধারণ করা।
এই বিদেশি দলের অন্তর্ভুক্তি তাঁর চিকিৎসার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাদের পরামর্শক্রমে আগামী দিনগুলোতে তাঁর চিকিৎসা পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
কেন এই জটিলতা: খালেদা জিয়ার দীর্ঘদিনের অসুস্থতা
বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরেই একাধিক জটিল ও ক্রনিক রোগে ভুগছেন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই রোগগুলো তাঁর শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে দুর্বল করে তুলেছে।
একাধিক জটিল রোগে আক্রান্ত নেত্রী
জানা গেছে, তিনি আর্থ্রাইটিস (হাঁটু ও জয়েন্টের ব্যথা), ডায়াবেটিস (ডায়াবেটিস), কিডনি (বৃক্ক), ফুসফুস (শ্বাসতন্ত্র), চোখের সমস্যাসহ নানা ধরনের জটিলতায় আক্রান্ত।
- কিডনি সমস্যা: কিডনির কার্যকারিতা কমে যাওয়া যেকোনো রোগীর জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এটি শরীরে বিষাক্ত পদার্থ জমা করে এবং অন্যান্য অঙ্গের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
- ফুসফুসের জটিলতা: শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা বা ফুসফুসে সংক্রমণও তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতির অন্যতম কারণ হতে পারে। সংকটাপন্ন অবস্থায় পৌঁছানোর ক্ষেত্রে শ্বাসযন্ত্রের দুর্বলতা একটি বড় ভূমিকা পালন করে।
- ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ: দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসে ভোগার কারণে অন্যান্য জটিল রোগ দ্রুত শরীরে প্রভাব ফেলে।
মেডিকেল বোর্ডের পক্ষ থেকে এই সমস্ত পুরোনো সমস্যাগুলোকে একত্রিত করে তাঁর নিবিড় পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
হাসপাতালে ভর্তির প্রক্রিয়া ও প্রাথমিক চিকিৎসা
গত ২৩ নভেম্বর রাতে সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’ থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য এভারকেয়ার হাসপাতালে আনা হয়। তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি লক্ষ্য করেই মেডিকেল বোর্ড তাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করার পরামর্শ দেয়।
হাসপাতালে ভর্তির পর থেকেই তাঁকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। সেখানে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে এবং তার ওপর ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে বর্তমানে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের আগমন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে দেশি চিকিৎসকরা হয়তো কোনো নির্দিষ্ট জটিলতা মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক পরামর্শ জরুরি মনে করছেন।
রাজনৈতিক মহলে গভীর উদ্বেগ
বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতার খবরে দলের নেতা-কর্মী এবং সমর্থকসহ সারা দেশের রাজনৈতিক মহলে গভীর উদ্বেগ বিরাজ করছে। দলের ভাইস চেয়ারম্যানের ‘সংকটাপন্ন’ ঘোষণার পর তাঁর দ্রুত আরোগ্য কামনায় বিভিন্ন স্থানে দোয়া-মাহফিল অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
বিশেষ করে, তাঁর মতো একজন বরেণ্য রাজনীতিকের সুচিকিৎসা নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মহল থেকে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। দেশের সুস্থ গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে তাঁর দ্রুত সুস্থতা কামনা করা হচ্ছে।
বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা এবং তাঁর শারীরিক অবস্থার সর্বশেষ আপডেট জানতে দেশের মানুষ উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছে। বিদেশি চিকিৎসক দলের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসায় তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন, এমনটাই আশা রাখছে কোটি কোটি মানুষ।








