পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর অবস্থানে থাকার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। খাগড়াছড়ি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. হাসান মাহমুদ পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন, এই শান্ত পাহাড়ি অঞ্চলে কোনো ধরনের স’ন্ত্রা’সী’দের ঠাঁ’ই হবে না। চাঁদাবাজি ও অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধ করে অচিরেই এই অঞ্চলে সক্রিয় স’ন্ত্রা’সী ও চাঁ’দা’বাজ গোষ্ঠীগুলোকে চূড়ান্তভাবে নি’মূল করা হবে।
তাঁর এই হুঁশিয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়ি-বাঙালি সকল জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও শান্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সেনাবাহিনীর দৃঢ় অঙ্গীকারেরই বহিঃপ্রকাশ। পানছড়ির তারাবন ছড়ায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন।
পাহাড়ে সন্ত্রাস-চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান এবং শান্তি চুক্তির পরেও আঞ্চলিক কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠীর অবৈধ তৎপরতার কারণে প্রায়শই এই অঞ্চল উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ঠিকাদাররা নিয়মিত চাঁদাবাজির শিকার হন। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. হাসান মাহমুদের সাম্প্রতিক বক্তব্য এই সমস্ত অবৈধ কার্যকলাপের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের ইঙ্গিত দেয়।
অস্ত্রের ঝনঝনানি আর নয়
রিজিয়ন কমান্ডার স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, শান্ত পাহাড়কে যারা অস্থিতিশীল করার স্বপ্ন দেখছে, তাদের সেই স্বপ্ন আর বাস্তবায়ন হতে দেওয়া হবে না। তিনি বলেন:
“পাহাড়ে সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজি ও অস্ত্রের ঝনঝনানি আর চলতে দেওয়া হবে না। এখানে আর কোনো সন্ত্রাসীর ঠাঁই হবে না। এখন থেকে সব ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কঠোর হস্তে দমন করা হবে।”
তাঁর এই বক্তব্য এটাই প্রমাণ করে যে, সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রাকে বিপন্ন করে তোলা এই গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী এখন আরও সুসংগঠিত ও শক্তিশালী ব্যবস্থা নিতে চলেছে।
চাঁদাবাজির অর্থেই অস্ত্র সংগ্রহ
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতে, এই স’ন্ত্রা’সী গোষ্ঠীগুলোর মূল অর্থনৈতিক উৎস হলো চাঁদাবাজি। এই চাঁদাবাজির টাকা দিয়েই তারা ভারত ও মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকা থেকে অবৈধভাবে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করে। এই অস্ত্রগুলো শেষ পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে অশান্তি সৃষ্টি এবং জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. হাসান মাহমুদ এই বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়েছেন এবং চাঁদাবাজদের কোনো রকম চাঁদা না দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন। স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া সঠিক তথ্য অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে বলে তিনি জানান।
শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নে সেনাবাহিনীর ভূমিকা
নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি, সম্প্রীতি ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নেও নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এটি কেবল একটি সামরিক অভিযান নয়, বরং এটি শান্তি ও উন্নয়নের একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা।
ঐক্যের বন্ধন অটুট রাখার আহ্বান
পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রিজিয়ন কমান্ডার পাহাড়ি ও বাঙালিদের ঐক্যের ডাক দিয়ে বলেন:
“পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়ি-বাঙালি আমরা সবাই এ দেশের নাগরিক। আমরা একে অপরের ভাই-বন্ধু। এখানকার শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সব সন্ত্রাসীকে পাহাড় থেকে উৎখাত করা হবে।”
তাঁর এই বক্তব্যে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
প্রত্যন্ত অঞ্চলে বহুমুখী সহায়তা
সেনাবাহিনী পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসরত সব জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সরাসরি কাজ করে যাচ্ছে। মতবিনিময় সভায় দেখা গেছে:
- শিক্ষা: শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা সামগ্রী বিতরণ করা হয়।
- স্বাস্থ্য: তিন শতাধিক স্থানীয় বাসিন্দাকে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা ও ওষুধ দেওয়া হয়।
- অন্যান্য: শীতার্তদের মাঝে কম্বল বিতরণ করা হয়।
এই ধরনের মানবিক সহায়তা কার্যক্রমগুলো পাহাড়ের মানুষের প্রতি সেনাবাহিনীর দায়িত্বশীলতা এবং সামাজিক প্রতিশ্রুতির পরিচায়ক।
চূড়ান্ত নির্মূল অভিযানে করণীয়
পার্বত্য অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা বর্তমানে শুধু আঞ্চলিক সমস্যা নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। আরাকান আর্মি (AA)-এর মতো বিদেশি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে স্থানীয় কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংযোগের অভিযোগও নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
যৌথ অভিযান ও গোয়েন্দা তৎপরতা
সন্ত্রাস নির্মূলের এই চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করবে। সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো (যেমন ডিজিএফআই) যৌথভাবে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করবে। ইতোমধ্যেই অতীতের ধারাবাহিক অভিযানে ইউপিডিএফসহ আঞ্চলিক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর বেশ কিছু আস্তানা ধ্বংস করা হয়েছে।
স্থানীয়দের ভূমিকা জরুরি
পাহাড়ে শান্তি ফিরিয়ে আনার এই বড় উদ্যোগে স্থানীয় হেডম্যান, কারবারী, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ জনগণের সহযোগিতা অপরিহার্য। স’ন্ত্রা’সী গোষ্ঠীগুলোকে উৎখাত করতে হলে তাদের বিষয়ে দ্রুত ও নির্ভুল তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে হবে। এতে করে চাঁদাবাজি বন্ধ হবে এবং এই অঞ্চলে বসবাসকারী সকল মানুষ নিরাপদে ও নির্ভয়ে তাদের জীবন যাপন করতে পারবে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. হাসান মাহমুদের এই ঘোষণা পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি নিরাপদ ও শান্ত পরিবেশ ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর প্রতিফলন। অচিরেই এই অঞ্চল সকল সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিমুক্ত হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।








