প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে কতটা সহজ করে তুলেছে, তা আমরা প্রতিদিনের জীবনে লক্ষ্য করি। কিন্তু আপনি কি কখনো ভেবেছেন, আপনার টয়লেট বা কমোড আপনার স্বাস্থ্যের ডাক্তার হয়ে উঠতে পারে? শুনতে অদ্ভুত বা হাস্যকর মনে হলেও, প্রযুক্তি বিশ্বে এমনই এক বিপ্লব ঘটিয়েছে জাপানের বিখ্যাত টয়লেট প্রস্তুতকারক কোম্পানি ‘টোটো’ (Toto Ltd.)। তারা এমন একটি স্মার্ট টয়লেট বাজারে এনেছে যা আপনার মল (Stool) স্ক্যান করে জানিয়ে দেবে আপনি কতটা সুস্থ বা অসুস্থ।
আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা জানবো জাপানের এই অদ্ভুত ও কার্যকরী প্রযুক্তি সম্পর্কে, যা স্যানিটেশন ব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
স্মার্ট টয়লেটের অভিনব প্রযুক্তি: এটি কীভাবে কাজ করে?
জাপানের টয়লেট বা স্যানিটেশন প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। তবে এবার তারা যা তৈরি করেছে, তা সত্যিই অভাবনীয়। টোটো কোম্পানি তাদের এই বিশেষ টয়লেটগুলোতে একটি ‘বিল্ট-ইন স্ক্যানার’ যুক্ত করেছে।
এই প্রযুক্তির মূল কার্যপদ্ধতি বারকোড স্ক্যানারের মতো। টয়লেট বোলের ভেতরে, পানির নজলের ঠিক পাশেই একটি সেন্সর মডিউল বসানো থাকে। যখনই ব্যবহারকারী টয়লেট সিটে বসেন, তখন এই স্ক্যানারের ঢাকনাটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যায় এবং যন্ত্রটি সক্রিয় হয়।
ব্যবহারকারী যখন মলত্যাগ করেন, তখন এই সেন্সরটি একটি বিশেষ আলো (Light) প্রক্ষেপণ করে। এই আলোর মাধ্যমেই মলের ছবি এবং প্রকৃতি বিশ্লেষণ করা হয়। টয়লেটের ফ্লাশ করার আগেই স্ক্যানারটি তার কাজ শেষ করে ফেলে এবং সমস্ত তথ্য প্রসেস করার জন্য তৈরি করে।
কী কী পরীক্ষা করতে পারে এই স্মার্ট টয়লেট?
অনেকেই ভাবতে পারেন, একটি টয়লেট আবার কী বা পরীক্ষা করবে? কিন্তু টোটোর এই স্মার্ট টয়লেটটি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে মলের বিশ্লেষণ করতে সক্ষম। এটি মূলত তিনটি প্রধান দিক বিবেচনা করে ডেটা তৈরি করে:
১. মলের আকৃতি (Shape): এটি মলকে সাতটি ভিন্ন ভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে। যেমন: সাধারণ আকৃতি, কলার মতো লম্বা, ছোট ছোট গুটি বা দানাদার, অথবা তরল বা লিকুইড।
২. রঙ (Color): স্বাস্থ্যের অন্যতম নির্দেশক হলো মলের রঙ। এই মেশিনটি তিনটি প্রধান রঙের ভিত্তিতে ফলাফল দেয়, মেটে হলুদ (Ochre), বাদামী (Brown), অথবা গাঢ় বাদামী (Dark Brown)।
৩. পরিমাণ ও কাঠিন্য (Quantity & Hardness): মলের পরিমাণ বেশি, মাঝারি নাকি কম সেটাও এই সেন্সর পরিমাপ করতে পারে। পাশাপাশি এটি কতটা শক্ত বা নরম, তাও নির্ণয় করে।
মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে স্বাস্থ্যের খোঁজ খবর
এই পুরো প্রক্রিয়াটি কেবল টয়লেটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। টোটো এই স্মার্ট টয়লেটের সাথে ব্যবহারের জন্য একটি বিশেষ স্মার্টফোন অ্যাপ তৈরি করেছে। টয়লেটটি স্ক্যান করার পর ওয়াইফাই-এর মাধ্যমে সমস্ত তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবহারকারীর ফোনে থাকা অ্যাপটিতে পাঠিয়ে দেয়।
অ্যাপটি ব্যবহারকারীদের জন্য একটি ব্যক্তিগত ডাক্তারের মতো কাজ করে। এটিতে যা যা সুবিধা পাওয়া যায়:
- ডেইলি ট্র্যাকিং: প্রতিদিনের মলের অবস্থা ক্যালেন্ডার আকারে সেভ করে রাখা যায়।
- ট্রেন্ড বিশ্লেষণ: গত এক সপ্তাহ বা এক মাসে আপনার পেটের অবস্থা কেমন ছিল, তার একটি গ্রাফ বা চার্ট দেখায়।
- লাইফস্টাইল পরামর্শ: আপনার মলের ধরণ দেখে অ্যাপটি আপনাকে পরামর্শ দেবে। যেমন, আপনার কি পানি বেশি খাওয়া উচিত? নাকি খাবারে ফাইবার বা আশঁযুক্ত খাবার বাড়ানো দরকার? এমনকি আপনার হজমে কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না, সে সম্পর্কেও এটি সতর্ক করতে পারে।
কেন এই প্রযুক্তির প্রয়োজন হলো?
টোটো কোম্পানির একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, জাপানের প্রায় ৭৬ শতাংশ মানুষ টয়লেট ব্যবহারের পর তাদের মলের দিকে তাকান এবং বোঝার চেষ্টা করেন তাদের পেট ঠিক আছে কি না। কিন্তু মাত্র ৬ শতাংশ মানুষ এই তথ্যগুলো কোথাও লিখে রাখেন বা ডিজিটালি রেকর্ড করেন।
স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে পেটের পীড়া, কোষ্ঠকাঠিন্য কিংবা অন্ত্রের রোগ নির্ণয়ে মলের প্রকৃতি বোঝা খুব জরুরি। ডাক্তাররা অনেক সময় রোগীর কাছে এই তথ্য জানতে চান, কিন্তু রোগীরা সঠিক বর্ণনা দিতে পারেন না। এই সমস্যার সমাধানেই টোটো এই প্রযুক্তি নিয়ে এসেছে। এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্যারামিটার রেকর্ড করে রাখে, যা ভবিষ্যতে চিকিৎসার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
দাম ও মডেলের বিস্তারিত
টোটোর এই নতুন ‘স্টুল অ্যানালাইসিস’ বা মল বিশ্লেষণ ফিচারটি তাদের হাই-এন্ড বা বিলাসবহুল মডেলগুলোতে যুক্ত করা হয়েছে। এই সিরিজের নাম দেওয়া হয়েছে “নিওরেস্ট” (Neorest)। ১লা আগস্ট ২০২৫ থেকে এই মডেলগুলো বাজারে ছাড়া হয়েছে।
মূলত দুটি মডেলে এই সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে:
১. Neorest LS-W: এই মডেলটির দাম শুরু হচ্ছে ৫,৪২,৩০০ ইয়েন থেকে, যা মার্কিন ডলারে প্রায় ৩,৬৫০ ডলার (বাংলাদেশি টাকায় যা প্রায় ৪ লক্ষ ৩০ হাজার টাকার সমান)।
২. Neorest AS-W: এর দাম কিছুটা কম, ৪,৯৩,৯০০ ইয়েন বা প্রায় ৩,৩৩০ ডলার (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩ লক্ষ ৯০ হাজার টাকা)।
কোম্পানি আশা করছে, বাজারে আসার তৃতীয় বছরের মধ্যে তারা বার্ষিক ৭,৩০০ টি ইউনিট বিক্রি করতে সক্ষম হবে। যদিও দাম সাধারণের নাগালের বাইরে, তবুও স্বাস্থ্য সচেতন বিত্তবান গ্রাহকদের কাছে এটি বেশ জনপ্রিয় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
টোটো (Toto) কোম্পানির ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
জাপানের কিতাকিউশু-ভিত্তিক কোম্পানি ‘টোটো’ (Toto Ltd.) স্যানিটারি জগতে একটি বিশ্বস্ত নাম। ১৯৮০ সালে তারা প্রথম ‘ওয়াশলেট’ (Washlet) বা বিডেট সিট বাজারে এনেছিল, যা গরম পানি দিয়ে পরিষ্কার করার সুবিধা দিত। সেই সময় এটি ছিল এক বৈপ্লবিক আবিষ্কার।
দীর্ঘ চার দশক ধরে তারা পরিচ্ছন্নতা, আরাম এবং পানি সাশ্রয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা তাদের ফোকাস পরিবর্তন করেছে। এখন তাদের মূল লক্ষ্য “গ্রাহকের সুস্বাস্থ্য বা ওয়েলনেস”।
কোম্পানিটি মনে করে, টয়লেট কেবল বর্জ্য ত্যাগের স্থান নয়, এটি এমন একটি জায়গা যেখানে মানুষ প্রতিদিন কিছুটা সময় কাটায়। তাই এই সময়টাকে কাজে লাগিয়ে যদি স্বাস্থ্যের কোনো উপকার করা যায়, সেটাই হবে সার্থক প্রযুক্তি। ভবিষ্যতে তারা এমন সেন্সর যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে যা প্রস্রাব বিশ্লেষণ করে ডায়াবেটিস বা কিডনির সমস্যার পূর্বাভাস দিতে পারবে।
প্রযুক্তি আমাদের জীবনের প্রতিটি কোণায় প্রবেশ করেছে। স্মার্ট ওয়াচ যেমন আমাদের হৃদস্পন্দন মাপে, তেমনি জাপানের স্মার্ট টয়লেট এখন আমাদের হজমশক্তির খবর রাখছে। যদিও এই মুহূর্তে এই টয়লেটগুলোর দাম অনেক বেশি এবং সাধারণ মানুষের জন্য কেনা কঠিন, তবে প্রযুক্তির ধর্মই হলো সময়ের সাথে সাথে সহজলভ্য হওয়া। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আমাদের দেশের বাথরুমেও এমন স্মার্ট প্রযুক্তির দেখা মিলবে, যা আমাদের সুস্থ থাকতে সাহায্য করবে।








