হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
শনিবার, জুন ২০, ২০২৬
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeজাতীয়ভারত থেকে শেখ হাসিনার শোকবার্তা: ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় খালেদা জিয়ার অবদান অপরিসীম’
spot_img

ভারত থেকে শেখ হাসিনার শোকবার্তা: ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় খালেদা জিয়ার অবদান অপরিসীম’

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী হলো জাতি। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা রাজনৈতিক বৈরিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার অবসান ঘটল এক শোকাবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে। বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন তাঁর আজীবনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী, বর্তমানে ভারতে নির্বাসিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোর ৬টায় ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় খালেদা জিয়ার মৃত্যু হয়। এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পরপরই ভারতের নির্বাসিত জীবন থেকে এক বিবৃতিতে শেখ হাসিনা এই শোক জানান। কার্যক্রমে নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এই শোকবার্তাটি প্রকাশ করা হয়।

শোকবার্তায় যা বললেন শেখ হাসিনা

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছাড়ার পর এই প্রথম কোনো রাজনৈতিক বিষয়ে এতটা নমনীয় ও ইতিবাচক মন্তব্য করলেন শেখ হাসিনা। শোকবার্তায় তিনি খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, “বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করছি।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, “বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাঁর অবদান অপরিসীম। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে এবং বিএনপি নেতৃত্বের এক অপূরণীয় ক্ষতি হলো।”

শেখ হাসিনা তাঁর শোকবার্তায় খালেদা জিয়ার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। একইসঙ্গে তিনি খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলেন, “আমি তাঁর ছেলে তারেক রহমান ও পরিবারের অন্যান্য শোকাহত সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। আশা করছি মহান আল্লাহ তাঁর পরিবারের সদস্যদের এবং বিএনপির সবাইকে এই শোক কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করবেন।”

‘দুই নেত্রীর’ মহাকাব্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইতি

খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই দুটি নাম গত তিন দশক ধরে সমার্থক হয়ে আছে ক্ষমতার পালাবদল ও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো যাদের সম্পর্ককে একসময় ‘দুই বেগমের যুদ্ধ’ (Battle of Begums) হিসেবে অভিহিত করত, আজ একজনের মৃত্যুতে সেই অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটলো।

১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে দুজনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিলেন। কিন্তু ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর থেকেই তাদের মধ্যে দূরত্বের সৃষ্টি হয়। পঁচাত্তর পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁরাই ছিলেন সবচেয়ে প্রভাবশালী দুই ব্যক্তি। একজন যখন সরকার প্রধান হয়েছেন, অন্যজন তখন বিরোধী দলীয় নেতার ভূমিকায় রাজপথ কাঁপিয়েছেন।

চড়াই-উতরাই ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ইতিহাস

শেখ হাসিনার শোকবার্তাটি রাজনৈতিক শিষ্টাচারের বহিঃপ্রকাশ হলেও, দুই দলের মধ্যে গত দুই দশকের ইতিহাস ছিল সংঘাতময়।

  • ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলা: একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলার জন্য আওয়ামী লীগ সরাসরি বিএনপি ও খালেদা জিয়াকে দায়ী করে আসছিল।
  • ২০১০ সালে বাড়ি উচ্ছেদ: আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই ২০১০ সালে খালেদা জিয়াকে তাঁর দীর্ঘদিনের স্মৃতিবিজড়িত শহীদ মইনুল রোডের বাসা থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল।
  • মামলা ও কারাবাস: ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাজা পেয়ে কারাগারে যান খালেদা জিয়া। পরবর্তীতে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলাতেও তাঁর সাজা হয়।

২০২০ সালে কোভিডের সময় নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়া শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পেলেও, শেখ হাসিনার সরকার তাঁকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি। সে সময় সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনাকে খালেদা জিয়ার অসুস্থতা ও বিদেশে যাওয়া নিয়ে কঠোর সমালোচনা করতে দেখা গিয়েছিল।

অন্তিম মুহূর্তে ভাগ্যের নির্মম পরিহাস

রাজনীতি বড়ই বিচিত্র। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতির দৃশ্যপট সম্পূর্ণ পাল্টে দেয়।

  • শেখ হাসিনার পতন: ৫ আগস্ট প্রবল গণআন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন শেখ হাসিনা। বর্তমানে তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে জুলাই গণহত্যার দায়ে প্রাণদণ্ড এবং প্লট দুর্নীতির মামলায় কারাদণ্ড দিয়েছে।
  • খালেদা জিয়ার মুক্তি: শেখ হাসিনার পতনের মাত্র দুই দিন পর, ৭ আগস্ট রাষ্ট্রপতির আদেশে পুরোপুরি মুক্তি পান খালেদা জিয়া। উচ্চ আদালত তাঁকে পূর্বের দুই মামলা থেকেও খালাস দেয়। ফলে মৃত্যুর আগে তিনি দুর্নীতির কলঙ্কমুক্ত হয়েই বিদায় নিলেন।

নির্বাচন ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

ভাগ্যের কি নির্মম খেলা! চলতি বছরের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়ার অংশ নেওয়ার কথা ছিল। সোমবার ছিল মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন, যেখানে খালেদা জিয়ার নামেও তিনটি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনের আগেই তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

অন্যদিকে, শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত থাকায় এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় তারা এবার নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছেন অথবা আত্মগোপনে আছেন।

আজ যখন খালেদা জিয়া চিরনিদ্রায় শায়িত হতে যাচ্ছেন, তখন তাঁর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনা বিদেশে ফেরারি আসামির মতো জীবন কাটাচ্ছেন। শেখ হাসিনার এই শোকবার্তা ইতিহাসের এক গভীর সত্যকেই মনে করিয়ে দেয়—রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই, আর মৃত্যু সব বিভেদ মুছে দেয়।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img
error: Content is protected !!