বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় যখন আকাশচুম্বী খরচ আর আস্থার সংকট নিয়ে মানুষ হতাশ, ঠিক তখনই আশার আলো হয়ে জ্বলছেন একজন মানুষ। তিনি অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম। টাকার পেছনে না ছুটে, মানুষের সেবাকেই জীবনের ব্রত হিসেবে নিয়েছেন তিনি। গত মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত তাঁর নিজের হাতে গড়া প্রতিষ্ঠানে ২০০০তম কিডনি প্রতিস্থাপন সম্পন্ন করে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছেন এই স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত চিকিৎসক।
আজকের প্রতিবেদনে আমরা জানবো এই মানবিক চিকিৎসকের অবিশ্বাস্য অর্জন, তাঁর জীবন সংগ্রাম এবং কীভাবে তিনি হাজারো মানুষের জীবন বাঁচিয়ে চলেছেন তার বিস্তারিত।
২০০০তম কিডনি প্রতিস্থাপন: একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক
মঙ্গলবার রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত ‘সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (সিকেডি)’ হাসপাতালে এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। এদিন অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম সফলভাবে তাঁর ২০০০তম কিডনি প্রতিস্থাপন সম্পন্ন করেন।
বাংলাদেশে কিডনি প্রতিস্থাপনের ইতিহাসে এটি একটি বিরল ঘটনা। দেশে এ পর্যন্ত যতগুলো কিডনি প্রতিস্থাপন হয়েছে, তার প্রায় অর্ধেকই হয়েছে ডা. কামরুল ইসলামের একক নেতৃত্বে। প্রচারবিমুখ এই মানুষটি গত ১৮ বছর ধরে নীরবে নিভৃতে এই কাজ করে যাচ্ছেন। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, এই বিশাল কর্মযজ্ঞে তিনি নিজের জন্য কোনো পারিশ্রমিক বা সার্জারি ফি নেন না।
বিনা পারিশ্রমিকে সেবার নজির
সাধারণত একটি কিডনি প্রতিস্থাপন বা ট্রান্সপ্লান্ট সার্জারি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল প্রক্রিয়া। দেশে-বিদেশে এর জন্য লাখ লাখ টাকা খরচ হয়। কিন্তু ডা. কামরুল ইসলাম এই ধারণা বদলে দিয়েছেন।
সিকেডি হাসপাতালের তথ্যমতে, এখানে কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য রোগীকে সব মিলিয়ে খরচ করতে হয় মাত্র ২ লাখ ১৫ হাজার টাকা। এই টাকার মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত থাকে:
- অস্ত্রোপচারের খরচ
- প্রয়োজনীয় ওষুধ
- আইসিইউ বেড ভাড়া
- আনুষঙ্গিক হাসপাতালের খরচ
সবচেয়ে বড় কথা হলো, প্রধান সার্জন হিসেবে ডা. কামরুল ইসলাম নিজে কোনো টাকাই নেন না। শুধু তাই নয়, অপারেশন পরবর্তী ফলোআপ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্যও রোগীকে কোনো অতিরিক্ত টাকা দিতে হয় না। যেখানে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে এই খরচ আকাশছোঁয়া, সেখানে ডা. কামরুল ইসলাম নামমাত্র খরচে গরিব ও অসহায় রোগীদের নতুন জীবন দান করছেন।
সফলতার হার ৯৫ শতাংশের বেশি
কম খরচে চিকিৎসা মানেই যে সেবার মানে ছাড় দেওয়া, তা কিন্তু নয়। ডা. কামরুল ইসলামের সাফল্যের হার ঈর্ষণীয়। তাঁর করা অস্ত্রোপচারে সাফল্যের হার ৯৫ শতাংশেরও বেশি।
প্রতি সপ্তাহে তিনি গড়ে পাঁচটি করে কিডনি প্রতিস্থাপন করেন। প্রতিটি অপারেশনে তাঁর সঙ্গে থাকেন ১০ থেকে ১২ জন দক্ষ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর একটি দল। এত বড় একটি টিম নিয়ে কাজ করা এবং দিনের পর দিন সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা মোটেও সহজ কাজ নয়। অথচ তিনি ক্লান্তিহীনভাবে এই কাজ করে যাচ্ছেন।
মেধাবী ছাত্র থেকে মানবিক চিকিৎসক: ডা. কামরুল ইসলামের বেড়ে ওঠা
ডা. কামরুল ইসলামের জন্ম ১৯৬৫ সালে পাবনার ঈশ্বরদীতে। তাঁর বাবা আমিনুল ইসলাম ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। বাবার দেশপ্রেমের আদর্শেই তিনি বড় হয়েছেন।
ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী।
- এসএসসি ও এইচএসসি: মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় তিনি মেধা তালিকায় যথাক্রমে ১৫তম ও ১০তম স্থান অধিকার করেন।
- এমবিবিএস: ১৯৯০ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে স্বর্ণপদকসহ এমবিবিএস পাস করেন।
- উচ্চতর ডিগ্রি: ১৯৯৫ সালে এফসিপিএস এবং ২০০০ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) থেকে ইউরোলজিতে এমএস ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০০৩ সালে ইংল্যান্ডের রয়্যাল কলেজ থেকে এফআরসিএস ডিগ্রি লাভ করেন।
এত উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে তিনি চাইলে বিদেশে বিলাসবহুল জীবন কাটাতে পারতেন। কিন্তু তিনি দেশেই থেকে গেছেন সাধারণ মানুষের সেবা করার জন্য।
বর্ণাঢ্য কর্মজীবন ও হাসপাতালের স্বপ্ন
ডা. কামরুল ইসলাম ১৯৯৩ সালে বিসিএস দিয়ে স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দেন। সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজিতে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেখানেই ২০০৭ সালে তিনি প্রথম সফল কিডনি প্রতিস্থাপন করেন।
কিন্তু সরকারি হাসপাতালের সীমাবদ্ধতা এবং রোগীদের দীর্ঘ লাইনে ভোগান্তি দেখে তিনি ব্যথিত হতেন। তাই ২০১১ সালে তিনি সরকারি চাকরি ছেড়ে দেন। ২০১৪ সালে নিজের জমানো টাকা ও উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেন ‘সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (সিকেডি)’ হাসপাতাল। তাঁর লক্ষ্য ছিল একটাই—কিডনি প্রতিস্থাপনকে সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে নিয়ে আসা।
দেশের কিডনি রোগের ভয়াবহ চিত্র ও ডা. কামরুল ইসলামের ভাবনা
কিডনি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় দুই কোটি মানুষ কোনো না কোনো কিডনি রোগে ভুগছেন। প্রতি ঘণ্টায় দেশে গড়ে পাঁচজন মানুষ কিডনি বিকল হয়ে মারা যাচ্ছেন।
কিডনি বিকল হলে ডায়ালাইসিস করা বা কিডনি প্রতিস্থাপন করা ছাড়া উপায় থাকে না। ডায়ালাইসিস অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। তাই প্রতিস্থাপনই সেরা সমাধান। কিন্তু সুযোগের অভাবে এবং অর্থের অভাবে অধিকাংশ রোগী বিনাচিকিৎসায় মারা যান।
মেডিভয়েসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডা. কামরুল ইসলাম বলেন,
“আমাদের দেশের গরিব রোগীদের আরও বেশি করে সেবা দেওয়া যায়, আরও বড় পরিসরে অনেক মানুষকে যাতে সেবা দিতে পারি এটাই আমার মূল পরিকল্পনা। আমরা বাণিজ্যিকভাবে অতিরিক্ত খরচ চাই না। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশে কম খরচে চিকিৎসা হচ্ছে, আমাদের দেশেও যেন সেটা হতে পারে, সেদিকেই আমি মনোযোগী।”
পুরস্কার ও সম্মাননা
কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ডা. কামরুল ইসলাম বহু সম্মাননা পেয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
- স্বাধীনতা পদক (২০২২): সমাজসেবা ও চিকিৎসায় অসামান্য অবদানের জন্য তিনি দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘স্বাধীনতা পদক’ লাভ করেন।
- স্বর্ণপদক: কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট বিষয়ে বিশেষ অবদানের জন্য ইউরোলজি সোসাইটি তাঁকে স্বর্ণপদক প্রদান করে।
কেন তিনি অন্যদের চেয়ে আলাদা?
একজন চিকিৎসক হিসেবে ডা. কামরুল ইসলাম প্রমাণ করেছেন যে, ইচ্ছে থাকলে সীমিত সাধ্যের মধ্যেও মানুষের জন্য অনেক কিছু করা সম্ভব। তিনি হাসপাতালের লভ্যাংশ রোগীদের সেবায় ব্যয় করেন। তাঁর হাসপাতালে কিডনি দাতা ও গ্রহীতাকে অপারেশনের আগে ও পরে দীর্ঘ সময় রাখা হয়, অথচ বিল বাড়ানো হয় না। তিনি বিশ্বাস করেন, চিকিৎসা কোনো ব্যবসা নয়, এটি একটি মহান সেবা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, অনেক সময় হাসপাতালের আয়ের অন্যান্য খাত থেকে কিডনি রোগীদের চিকিৎসার ভর্তুকি দেওয়া হয়। ডা. কামরুল ইসলাম বলেন, “এটি যেকোনো হাসপাতালই করতে পারে এবং এতে লোকসান হয় এমনটা নয়।” তাঁর এই কথাটি দেশের অন্যান্য প্রাইভেট হাসপাতালের জন্য একটি বড় বার্তা।
ডা. কামরুল ইসলাম শুধু একজন চিকিৎসক নন, তিনি মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ২০০০ কিডনি প্রতিস্থাপনের এই মাইলফলক কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি ২০০০টি পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর গল্প। একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে তিনি স্বাধীন দেশে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে যে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন, তা আমাদের সবার জন্য অনুপ্রেরণার। আমরা আশা করি, তাঁর দেখানো পথে হেঁটে আরও অনেক তরুণ চিকিৎসক মানবসেবায় এগিয়ে আসবেন।
আপনার যদি কিডনি রোগ বা এর চিকিৎসা সম্পর্কে কোনো জানার থাকে বা ডা. কামরুল ইসলামের অ্যাপয়েন্টমেন্ট সম্পর্কে জানতে চান, তবে নিচে কমেন্ট করতে পারেন। আমরা চেষ্টা করব সঠিক তথ্য দিয়ে আপনাকে সহায়তা করতে।








