গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি ছিল নানা গোপনীয়তা ও নাটকীয়তায় ভরা। ঠিক কীভাবে গণভবন থেকে তিনি নিরাপদে বের হলেন, কীভাবে সামরিক বিমানে ভারত পৌঁছালেন এবং কারা ছিলেন সেই রেসকিউ মিশনে ঘটনার দুই বছর পর এসে সেসব অজানা তথ্য অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
যদিও এ নিয়ে এখনো সরকারিভাবে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি, তবে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তৈরি করা বিস্তারিত তথ্য ইতোমধ্যে সরকারের উচ্চপর্যায়ে জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
গণভবন থেকে উদ্ধার: ৩০ মিনিটের আল্টিমেটাম
পাঁচই আগস্ট সকাল থেকেই রাজধানী ঢাকার দিকে লাখ লাখ মানুষের ঢল নামতে শুরু করে। দুপুর ঘনিয়ে আসার আগেই গণভবনের খুব কাছাকাছি চলে আসে ক্ষুব্ধ জনস্রোত। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় শেখ হাসিনাকে মাত্র ৩০ মিনিট সময় বেঁধে দেওয়া হয় এবং অবিলম্বে গণভবন ছাড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
বাণিজ্যমেলার পেছনের অংশ থেকে বিমানবাহিনীর একটি এমআই-১৭ (Mi-17) হেলিকপ্টারে করে শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানাকে উদ্ধার করা হয়। হেলিকপ্টারটি পরিচালনা করছিলেন:
- প্রধান পাইলট: এয়ার কমোডর আব্বাস
- কো-পাইলট: গ্রুপ ক্যাপ্টেন রায়হান কবির
দুপুর ৩টার দিকে হেলিকপ্টারটি কুর্মিটোলা এয়ার বেইজে নিরাপদে অবতরণ করে।
দেশের মাটিতে দাঁড়িয়েই শুনলেন পতনবার্তা
কুর্মিটোলা এয়ার বেইজে আগে থেকেই প্রস্তুত করে রাখা হয়েছিল একটি সি-১৩০ জুলিয়েট (C-130J) সামরিক পরিবহন বিমান। হেলিকপ্টার থেকে নেমে শেখ হাসিনা সেখানে অবস্থানরত কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার কাছে দেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে চান।
কর্মকর্তারা যখন জানান যে লাখো মানুষ গণভবনের দিকে ঢুকে পড়েছে, ঠিক তখনই দেশের মাটিতে দাঁড়িয়েই শেখ হাসিনা তার দীর্ঘ দেড় যুগের ক্ষমতার অবসানের মূল সত্যটি বুঝতে পারেন।
এক নজরে উড্ডয়ন ও ভারত যাত্রা:
- আকাশপথের কৌশল: রাডার এড়াতে বিমানের ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে ঘুরতি পথে উড্ডয়ন করা হয়।
- অবতরণ: বিকাল ৬টা ১৫ মিনিটে দিল্লির উপকণ্ঠে অবস্থিত হিন্দন বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করে।
- অভ্যর্থনা: ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা তাকে স্বাগত জানান।
কারা ছিলেন সেই বিশেষ বিমানে?
কঠোর গোপনীয়তায় পরিচালিত এই রেসকিউ মিশনের দায়িত্বে ছিলেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন আবু সালেহ মান্নাফি। বিমানটিতে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন তাদের নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকের পরিবার।
তবে রহস্যজনক কারণে তারিক সিদ্দিকী নিজে ওই বিমানে ওঠেননি। পরবর্তীতে তিনি চট্টগ্রাম থেকে নৌপথে দেশ ত্যাগ করার চেষ্টা করেন এবং তাকে সহায়তার অভিযোগে বন্দর কর্তৃপক্ষের তৎকালীন চেয়ারম্যান গ্রেফতার হন।
বিমানে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের বর্তমান অবস্থান
শেখ হাসিনাকে ভারতে রেখে বিমানটি যথারীতি ঢাকায় ফিরে আসে। রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নিয়োজিত থাকলেও পরবর্তীতে মিশনে থাকা কর্মকর্তাদের বিভিন্ন স্থানে পোস্টিং দেওয়া হয়:
- হেলিকপ্টার পাইলট এয়ার কমোডর আব্বাস: বর্তমানে এয়ার হেডকোয়ার্টার ইউনিটের অধিনায়ক।
- কো-পাইলট গ্রুপ ক্যাপ্টেন রায়হান কবির: বাশার এয়ার বেইজের ওসি (অ্যাডমিন)।
- পরিবহন বিমান পাইলট এয়ার কমোডর শামীম রেজা: ফিলিপাইনে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণে পাঠানো হয়।
- কো-পাইলট উইং কমান্ডার মাহফুজ: বর্তমানে বিমানবাহিনীর গোয়েন্দা পরিদপ্তরে কর্মরত।
আইনি ব্যাখ্যা ও মূল্যায়ন
সাবেক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান পদত্যাগ করার পরও আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এসএসএফ (SSF) ও সামরিক নিরাপত্তা পেয়ে থাকেন। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সেদিনের সেই ক্রাইসিস মুহূর্তে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সামরিক কর্মকর্তারা মূলত তাদের ওপর অর্পিত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তবে ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের রেশ ধরে সেইদিনের সেই উড্ডয়ন আজও বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক বড় আলোচনার বিষয় হয়ে রয়ে গেছে।








