সমসাময়িক সমাজে প্রেম ও বিবাহের প্রশ্নে ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং ধর্মীয় নির্দেশনার মধ্যে প্রায়ই দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। এই দ্বন্দ্বের ফলে অনেক সময় ‘পালিয়ে বিয়ে’র মতো আবেগপ্রসূত সিদ্ধান্তের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। ইসলামের দৃষ্টিতে বিবাহ কেবল একটি ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়, বরং এটি একটি পবিত্র সামাজিক চুক্তি। এই চুক্তির পূর্ণতা ও স্থায়িত্বের জন্য ইসলামে অভিভাবকের অনুমতির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়েছে।
কুরআনের নির্দেশনা
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে অভিভাবকের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন। সুরা আন-নিসার ২৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন:
“তোমরা তাদেরকে তাদের অভিভাবকদের অনুমতিক্রমে বিয়ে কর।”
এই আয়াতের মাধ্যমে বোঝা যায়, ইসলাম বিবাহে পরিবারের সম্পৃক্ততাকে একটি সুরক্ষা কবজ হিসেবে দেখে, যা সম্পর্ককে সামাজিকভাবে সুসংহত করে।
হাদিসের আলোকে অভিভাবকের গুরুত্ব
রাসুলুল্লাহ (সা.) বিবাহকে প্রকাশ্য এবং অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন করার ওপর জোর দিয়েছেন। কয়েকটি হাদিস এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য:
- অভিভাবকের আবশ্যকতা: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “অভিভাবক ছাড়া কোনো বিয়ে বৈধ নয়।” (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ২০৮৫)
- বিয়ে বাতিল: অন্য হাদিসে এসেছে, “যে নারী তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করে, তার বিয়ে বাতিল।” (তিরমিজি, হাদিস: ১১০২)
- বিয়ে প্রকাশ করা: সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার জন্য রাসুল (সা.) বলেছেন, “বিয়ে প্রকাশ্যে করো।” (মুসনাদ আহমদ, হাদিস: ১৬১৩০)
মাযহাবের দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামী ফিকহের ইতিহাসে এই বিষয়ে ইমামদের মতপার্থক্য থাকলেও মূল সুর একই। ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ী এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মতে, অভিভাবক ছাড়া বিয়ে সহিহ বা বৈধ নয়। অন্যদিকে, ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, প্রাপ্তবয়স্ক ও বিবেচনাশীল নারী নিজেই তার বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যদি পাত্র সমমানের হয়। তবে হানাফি ফিকহেও অভিভাবকের সম্পৃক্ততাকে সম্পর্কের নিরাপত্তা ও সামাজিক স্বীকৃতির জন্য অত্যাবশ্যকীয় বলে বিবেচনা করা হয়।
কেন পালিয়ে বিয়ে ইসলামের দৃষ্টিতে সমর্থনযোগ্য নয়
ইসলাম পালিয়ে বিয়ের বিরোধী হওয়ার পেছনে গভীর সামাজিক প্রজ্ঞা রয়েছে:
১. সামাজিক স্বীকৃতি: গোপনে বিয়ে করলে সমাজে সন্দেহ, অপবাদ ও নৈতিক অবক্ষয়ের সৃষ্টি হয়।
২. পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা: পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে করা বিয়ে প্রায়ই অস্থিতিশীল হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে না।
৩. নিরাপত্তাহীনতা: আবেগ ফুরিয়ে গেলে আইনি ও সামাজিক জটিলতায় নারীর প্রাপ্য অধিকার রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ইসলামের ভারসাম্যের পথ
ইসলাম কোনো অবস্থাতেই অন্যায্য বাধা সমর্থন করে না। যদি কোনো অভিভাবক যৌক্তিক কারণ ছাড়া উপযুক্ত পাত্রের ক্ষেত্রে বিয়েতে বাধা দেন, তবে ইসলামে তার প্রতিকার আছে। এমন ক্ষেত্রে কাজী বা দায়িত্বশীল ইসলামি বিচারক অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতে পারেন, যাতে একটি বৈধ সম্পর্ক অন্যায়ের কারণে নষ্ট না হয়।
ইসলাম যে বিবাহব্যবস্থা চায়, তা হলো স্বচ্ছতা, দায়িত্ববোধ এবং সামাজিক স্বীকৃতির পথ। আবেগ দিয়ে তাড়িত হয়ে নেওয়া যেকোনো সিদ্ধান্ত প্রায়ই বাস্তবতার কঠিন পরীক্ষায় মুখ থুবড়ে পড়ে। অভিভাবকের অনুমতি ও পরিবারের সম্মতিতে সম্পন্ন হওয়া বিয়েই কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং দীর্ঘস্থায়ী সুখের নিশ্চয়তা দিতে পারে।








