রাতে স্বাভাবিকভাবে ঘুমিয়ে পড়ার পর দু’টো-তিনটা নাগাদ হঠাৎ কি আপনার ঘুম ভেঙে যায়? কিংবা ঘুম ভাঙার পর এই উদ্বেগে ভোগেন যে প্রয়োজন মতো ঘুম হচ্ছে না? আমাদের মধ্যে অনেকেরই এমন অভিজ্ঞতা নিয়মিত হয়। মাঝরাতে হুট করে ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর এক অদ্ভুত নীরবতায় মাথায় ভর করে দুনিয়ার সব দুশ্চিন্তা।
কারো কারো মতে স্ট্রেস বা মানসিক চাপের কারণে এমনটা হতে পারে। তবে চিকিৎসকেরা বলছেন, হঠাৎ ঘুম কমে যাওয়া বা মাঝরাতে জেগে ওঠা শরীরের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। পরের দিনটি নয়া উদ্যমে শুরু করার জন্য এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে গভীর ও পর্যাপ্ত ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চলুন জেনে নেওয়া যাক, ঠিক কী কারণে রাত ২টো থেকে ৩টের মধ্যে আমাদের ঘুম ভেঙে যায় এবং কেন সেই সময় মাথায় এত নেতিবাচক চিন্তা আসে।
মানুষের ঘুমের চক্র ও এর বিভিন্ন পর্যায়
চিকিৎসকদের মতে, ঘুম কোনো নিরবিচ্ছিন্ন বা একনাগাড়ে চলা অবস্থা নয়। এর বিভিন্ন পর্যায় বা সাইকেল রয়েছে। আমরা যখন ঘুমাই, তখন আমাদের মস্তিষ্ক মূলত দুটি পর্যায়ে কাজ করে:
- লাইট স্লিপ (পাতলা ঘুম): এই অবস্থায় ঘুমিয়ে থাকলেও আমাদের চারপাশের পরিবেশ নিয়ে মস্তিষ্ক কিছুটা সতর্ক থাকে।
- গভীর ঘুম ও আরইএম স্লিপ (REM Sleep): আরইএম বা ‘র্যাপিড আই মুভমেন্ট’ পর্যায়ে মানুষের চোখের তারার দ্রুত ঘোরাফেরা লক্ষ্য করা যায়। এই পর্যায়ের সঙ্গেই আমাদের স্বপ্ন দেখার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। স্মৃতির প্রক্রিয়াকরণ এবং তা মস্তিষ্কে ধরে রাখার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অপরিসীম।
আমাদের শরীরে এই ঘুমের চক্রটি প্রতি ৯০ মিনিট অন্তর পরিবর্তিত হয়। সাধারণত, রাতের প্রথম দিকে আমাদের গভীর ঘুম বেশি হয়। কিন্তু ভোরের দিকে, বিশেষ করে রাত দুটো থেকে তিনটের দিকে ঘুমের প্রকৃতি বদলে যায়। এই সময়ে মূলত হালকা ঘুম হয় এবং আরইএম স্লিপের পরিমাণ বেড়ে যায়। ফলে সামান্যতম শব্দ, পাশের মানুষের নড়াচড়া বা মাথায় চলা ছোটখাটো চিন্তার কারণেও সহজে ঘুম ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
রাত দু’টো-তিনটা নাগাদ ঘুম হারানোর মূল কারণগুলো
মনোরোগ ও নিউরোলজি বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঝরাতে বা ভোরের দিকে ঘুম ভেঙে যাওয়ার পেছনে একাধিক শারীরিক ও মানসিক কারণ কাজ করে। নিচে প্রধান কারণগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম বা জৈবিক ঘড়ি
সার্কাডিয়ান ছন্দ বলতে শরীরের এমন এক প্রাকৃতিক ও অভ্যন্তরীণ ঘড়িকে বোঝায়, যা ২৪ ঘণ্টায় আমাদের ঘুম ও সজাগ থাকার চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করে। মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসে অবস্থিত ‘সুপ্রাকিয়াসম্যাটিক নিউক্লিয়াস’ নামক একটি ক্ষুদ্র অংশ এই ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করে।
মুম্বাইয়ের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ঋষভ ভার্মা জানান, আপনি যদি সাধারণত রাত ১০-১১টায় ঘুমোতে যান, তবে ভোর তিনটে আপনার শরীরের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়। কারণ ততক্ষণে আপনার প্রয়োজনীয় ঘুমের একটা বড় অংশ সম্পন্ন হয়ে যায়। এই সময়ে দেহের তাপমাত্রা সর্বনিম্ন স্তরে চলে যায় এবং শরীরের অভ্যন্তরীণ সিস্টেম ধীরে ধীরে পরবর্তী দিনের জন্য সক্রিয় হতে শুরু করে। ফলে ঘুম এমনিতেই পাতলা হয়ে আসে।
২. কর্টিসল ও অন্যান্য হরমোনের প্রভাব
ভোরের দিকে আমাদের শরীর যখন ঘুম থেকে ওঠার প্রস্তুতি নিতে থাকে, তখন শরীরে কর্টিসল নামক একটি স্টেরয়েড হরমোনের মাত্রা বাড়তে শুরু করে। কর্টিসল আমাদের সজাগ হতে সাহায্য করে, পাশাপাশি এটি মানসিক চাপ, বিপাক ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে।
স্বাভাবিক অবস্থায় এই হরমোনের মাত্রা এত ধীরে বাড়ে যে আমরা বুঝতে পারি না। কিন্তু আপনি যদি ইতিমধ্যেই অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা উদ্বেগের (Anxiety) মধ্যে থাকেন, তবে শরীরে কর্টিসলের মাত্রা আগে থেকেই বেশি থাকে। এই বাড়তি কর্টিসল মাঝরাতে মস্তিষ্কে সজাগ হওয়ার সংকেত পাঠায়, যার কারণে হুট করে ঘুম ভেঙে যায়। এছাড়া তীব্র মানসিক চাপের সময় অ্যাড্রেনালিন এবং নোরড্রেনালিন হরমোন নিঃসরণের কারণেও হঠাৎ প্যানিক হয়ে ঘুম ভেঙে যেতে পারে।
৩. মেলাটোনিন হরমোনের ঘাটতি
ওখার্ড হাসপাতালের কনসালট্যান্ট নিউরোলজিস্ট ডা. প্রশান্ত মাখিজা জানান, ঘুম নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি হরমোনের সম্মিলিত প্রভাব রয়েছে। মেলাটোনিন, যা মূলত ‘ঘুমের হরমোন’ হিসেবে পরিচিত, তা রাতের দিকে সবচেয়ে বেশি নিঃসরণ হয়। কিন্তু বেলা বাড়ার সাথে সাথে বা ভোরের দিকে এর মাত্রা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। মেলাটোনিনের মাত্রা কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে।
ক্যারেট অনুযায়ী ঘুমের ধরন ও জেগে ওঠার ঐতিহাসিক কারণ
মাঝরাতে ২-৪ বার জেগে ওঠা কি স্বাভাবিক? ডা. ভার্মার মতে, এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি বিষয়। আজ থেকে লক্ষ লক্ষ বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষেরা যখন বনে-জঙ্গলে বাস করতেন, তখন রাতে কয়েক ঘণ্টা পর পর জেগে ওঠা তাদের চারপাশের বন্য পশুর বিপদ সম্পর্কে সচেতন হতে সাহায্য করত।
আধুনিক গবেষণা অনুযায়ী, একজন সুস্থ ও প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি রাতে দুই থেকে চারবার জাগেন। তবে সেই জেগে থাকাটা মাত্র কয়েক সেকেন্ডের হয় বলে পরদিন সকালে তা আমাদের মনে থাকে না। কিন্তু যখন আমরা পুরোপুরি সজাগ হয়ে যাই এবং মস্তিষ্ক কাজ করা শুরু করে, তখন পুনরায় ঘুমিয়ে পড়া কঠিন হয়ে পড়ে।
জীবনযাত্রার যে ৩টি ভুল মাঝরাতের ঘুম কেড়ে নেয়
আমাদের প্রতিদিনের কিছু অভ্যাস বা লাইফস্টাইলও মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যাওয়ার জন্য সমানভাবে দায়ী। চিকিৎসকেরা প্রধানত ৩টি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন:
[স্ক্রিন টাইম (নীল আলো)] ──> মেলাটোনিন কমায় ──> মস্তিষ্ক ভাবে দিন হয়েছে ──> ঘুমে বিঘ্ন ঘটে
[দেরি করে ভারী খাবার] ──> রক্তে শর্করা ওঠানামা ──> স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ ──> মাঝরাতে ঘুম ভাঙে
[অ্যালকোহল সেবন] ──> যকৃতে বিপাক প্রক্রিয়াবদ্ধ ──> উত্তেজক হিসেবে কাজ করে ──> পাতলা ঘুম নষ্ট করে
১. অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম বা ফোনের ব্যবহার
গভীর রাতে ফোন, ট্যাবলেট বা ল্যাপটপ ব্যবহার করলে চোখের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। এসব ডিভাইসের স্ক্রিন থেকে যে ক্ষতিকর নীল আলো (Blue Light) বের হয়, তা শরীরের মেলাটোনিন হরমোন তৈরিতে বাধা দেয়। ফলে মস্তিষ্ক মনে করে এখনও দিন রয়েছে এবং শরীরের প্রাকৃতিক ঘুমের সংকেত ও চক্র ওলোটপালোট হয়ে যায়।
২. গভীর রাতে ভারী বা মিষ্টি খাবার খাওয়া
বেশি রাতে ঘুমানোর আগে ভারী খাবার বা উচ্চ মাত্রায় চিনি বা মিষ্টি জাতীয় খাবার খেলে তা হজম করার জন্য শরীরকে অনবরত কাজ চালিয়ে যেতে হয়। চিনি খাওয়ার ফলে রক্তে শর্করার (Sugar) মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং তার কয়েক ঘণ্টা পর হঠাৎ তা কমে যায়। রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ কমে গেলে শরীরকে স্থিতিশীল রাখতে স্ট্রেস হরমোন নিঃসৃত হয়, যা মাঝরাতে ঘুম ভাঙার অন্যতম বড় কারণ।
৩. অ্যালকোহল বা মদ্যপানের প্রভাব
অনেকে মনে করেন অ্যালকোহল পান করলে ভালো ঘুম হয়, যা সম্পূর্ণ একটি ভুল ধারণা। অ্যালকোহল পানের পর প্রাথমিকভাবে ঘুম এলেও, পরবর্তী ৩ থেকে ৪ ঘণ্টার মধ্যে যখন যকৃৎ বা লিভার সেটি বিপাক (Metabolize) করা শুরু করে, তখন তা শরীরে উত্তেজক হিসেবে কাজ করে। ফলে ভোরের দিকে যখন আমাদের লাইট স্লিপ সাইকেল চলে, তখন ঘুম পুরোপুরি ভেঙে যায়।
একবার ঘুম ভেঙে গেলে করণীয় কী?
মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর আবার ঘুমিয়ে পড়তে না পারাটাই আসল সমস্যা। এই সময় অনেকেই ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দুশ্চিন্তা শুরু করেন “আমার তো ঘুম হচ্ছে না, কাল অফিসে কীভাবে কাজ করব?” এই চিন্তাই মস্তিষ্ককে আরও সজাগ করে তোলে। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো:
- ঘড়ির দিকে তাকাবেন না: ঘুম ভাঙার পর বারবার সময় দেখলে উদ্বেগ আরও বাড়ে।
- বিছানা ছেড়ে দিন: যদি ২০ মিনিটের মধ্যে পুনরায় ঘুম না আসে, তবে জোর করে বিছানায় শুয়ে না থেকে উঠে পড়ুন। অন্য ঘরে গিয়ে হালকা আলোয় বই পড়ুন বা শান্ত কোনো গান শুনুন। ঘুম এলে আবার বিছানায় যান।
- স্মার্টফোন থেকে দূরে থাকুন: ঘুম ভাঙার পর কোনো অবস্থাতেই মোবাইল হাতে নেবেন না।
মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যাওয়া এবং নানান চিন্তা আসা মূলত আমাদের শরীরের হরমোন, সার্কাডিয়ান ছন্দ এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার একটি সম্মিলিত ফলাফল। মানসিক চাপ কমানো, ঘুমানোর অন্তত দুই ঘণ্টা আগে স্ক্রিন থেকে দূরে থাকা এবং রাতের খাবার সময়মতো খাওয়ার মাধ্যমে এই সমস্যা থেকে অনেকাংশেই মুক্তি পাওয়া সম্ভব। তবে এই সমস্যা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং আপনার দৈনন্দিন কর্মক্ষমতায় ব্যাঘাত ঘটায়, তবে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। নিয়মিত স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার এমন সব গুরুত্বপূর্ণ খবরের আপডেট পেতে আমাদের নিউজ পোর্টালের সাথেই থাকুন।








