হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
শনিবার, জুন ১৩, ২০২৬
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeইসলাম ও জীবনকাবার গিলাফের ইতিহাস: কেন এর রং কালো এবং কীভাবে তৈরি হয় পবিত্র...
spot_img

কাবার গিলাফের ইতিহাস: কেন এর রং কালো এবং কীভাবে তৈরি হয় পবিত্র ‘কিসওয়াহ’?

পৃথিবীতে এমন কোনো স্থাপনা নেই, যাকে ঘিরে মানুষের মনে এত গভীর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আধ্যাত্মিক টান রয়েছে, যতটা রয়েছে মক্কার পবিত্র কাবা শরিফকে কেন্দ্র করে। প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে প্রায় দুইশ কোটিরও বেশি মুসলমান এই ঘরের দিকে মুখ করে নামাজে দাঁড়ান। হজ ও উমরাহর মৌসুমে লাখো মানুষ কাবাকে ঘিরে তাওয়াফ করেন। তবে কাবা শরিফকে ঘিরে মানুষের মনে অন্যতম বড় একটি কৌতূহল হলো এর চারপাশের চমৎকার কালো আবরণ বা গিলাফ।

আরবিতে এই গিলাফকে বলা হয় ‘কিসওয়াহ’ (الكسوة)। এটি কেবল একটি সাধারণ কাপড় নয়, বরং মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্প এবং গভীর ধর্মীয় আবেগের এক অনন্য প্রতীক। কিন্তু কেন কাবা ঘর সবসময় কাপড়ে ঢাকা থাকে? কখন থেকে শুরু হলো এই প্রথা? আর এর রং কালোই বা কেন হলো? চলুন আজ জেনে নেওয়া যাক কাবার গিলাফের ইতিহাস ও এর পেছনের কিছু জানা-অজানা তথ্য।

ইসলামের পূর্বে কাবার গিলাফ: কীভাবে শুরু হয়েছিল এই প্রথা?

ইসলামি ইতিহাসবিদদের মতে, কাবা শরিফকে কাপড়ে আবৃত করার এই ঐতিহ্য ইসলামের আবির্ভাবের বহু শতাব্দী আগে থেকেই চলে আসছে। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আল-আজরাকি তার ‘আখবারু মাক্কাহ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ইয়েমেনের হিমইয়ারি রাজারা কাবার জন্য বিশেষ উপহার হিসেবে গিলাফ পাঠাতেন।

ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, ইয়েমেনের রাজা ‘তুব্বা আবু কারিব আসআদ’ কাবা শরিফকে সম্মান জানিয়ে প্রথম পূর্ণাঙ্গ গিলাফ পরিয়েছিলেন। প্রাক-ইসলামি যুগে কাবার রক্ষণাবেক্ষণ এবং গিলাফ দেওয়াকে আরবে বিশাল মর্যাদা ও নেতৃত্বের প্রতীক মনে করা হতো। তখন চামড়া, ইয়েমেনি বস্ত্র এবং সূক্ষ্মভাবে বোনা বিভিন্ন কাপড়ের সাহায্যে কাবা ঘরকে ঢেকে রাখা হতো।

রাসুলুল্লাহ (সা.) ও খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগে কিসওয়াহ

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়ত পাওয়ার আগেও কাবা শরিফ গিলাফে ঢাকা ছিল। মক্কা বিজয়ের পর যখন কাবা ঘর থেকে সব মূর্তি অপসারণ করে একে পুনরায় তাওহিদের কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়, তখন এর গিলাফ পরিবর্তনের ঐতিহ্যে এক নতুন মাত্রা যুক্ত হয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) কাবার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখেন এবং তার বিদায়ের পর খোলাফায়ে রাশেদিনও এই নিয়ম চালু রাখেন। হযরত আবু বকর (রা.), হযরত উমর (রা.) এবং হযরত উসমান (রা.)-এর শাসনামলে ইয়েমেনের বিখ্যাত ও দামি কাপড় দিয়ে কাবার গিলাফ তৈরি করা হতো। পরবর্তীতে উমাইয়া, আব্বাসীয়, ফাতেমীয়, মামলুক এবং উসমানীয় খলিফারাও কিসওয়াহ তৈরিকে তাদের সাম্রাজ্যের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ কাজ বলে মনে করতেন।

কাবার গিলাফ কেন কালো রঙের হয়?

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, কাবার গিলাফ সবসময় কালো কেন থাকে? ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, কাবার গিলাফ সবসময় কালো ছিল না। বিভিন্ন যুগে এটি সাদা, লাল, হলুদ এমনকি সবুজ রঙেরও করা হয়েছিল।

তাহলে কালো রং স্থায়ী হলো কীভাবে? গবেষকদের মতে, আব্বাসীয় খিলাফতের সময় কাবার গিলাফে কালো রঙের ব্যবহার জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কারণ, আব্বাসীয়দের সরকারি পতাকার রং ছিল কালো। সেই সময় থেকে কাবার গিলাফে কালো রং দেওয়ার যে প্রথা শুরু হয়, তা ধীরে ধীরে স্থায়ী রূপ নেয়। আজ বিশ্বজুড়ে কালো রঙের এই কিসওয়াহ-ই কাবার মূল পরিচিতি বা প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

মিসর থেকে মক্কা: কিসওয়াহ তৈরির রাজকীয় কারখানা

মধ্যযুগে মিসর হয়ে উঠেছিল কাবার গিলাফ তৈরির প্রধান কেন্দ্র। প্রায় ৭০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কায়রোর বিশেষ কারখানায় অত্যন্ত নিখুঁতভাবে কাবার গিলাফ বোনা হতো। প্রতি বছর ‘মাহমাল’ নামক একটি বিশেষ এবং জাঁকজমকপূর্ণ উটের কাফেলার মাধ্যমে এই গিলাফ মিসর থেকে মক্কায় পাঠানো হতো। এই আয়োজনটি তখন মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ও রাজনৈতিক শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখা হতো।

উসমানীয় বা অটোমান সাম্রাজ্যের যুগে এই শিল্প আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়। দক্ষ কারিগররা খাঁটি সোনা ও রুপার সুতা দিয়ে গিলাফের গায়ে কুরআনের আয়াত ফুটিয়ে তুলতে শুরু করেন। কাবার গিলাফের ওপর যে সোনালি রঙের বেল্ট বা বর্ডার দেখা যায়, তাকে বলা হয় ‘হিযাম’। এতে অত্যন্ত নিখুঁত সূচিকর্মে সুরা ইখলাস, আয়াতুল কুরসি এবং আল্লাহর বিভিন্ন প্রশংসামূলক বাণী লেখা থাকে।

বর্তমান যুগে কীভাবে তৈরি হয় কাবার মূল্যবান গিলাফ?

১৯২৭ সালে সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা রাজা আবদুল আজিজ আল সৌদ মক্কাতেই নিজস্ব উদ্যোগে গিলাফ তৈরির কারখানা স্থাপনের নির্দেশ দেন। বর্তমানে মক্কার ‘কিং আবদুল আজিজ কমপ্লেক্স ফর কিসওয়াহ’-এ অত্যন্ত আধুনিক উপায়ে এই গিলাফ তৈরি করা হয়।

কিসওয়াহ তৈরির কিছু অবাক করা তথ্য

  • খাঁটি রেশম: একটি গিলাফ তৈরিতে প্রায় ৬৫০ থেকে ৭০০ কেজি প্রাকৃতিক ও খাঁটি রেশম সুতা ব্যবহার করা হয়।
  • সোনা ও রুপার সুতা: গিলাফের ক্যালিগ্রাফি বা নকশার জন্য প্রায় ১২০ কেজি খাঁটি সোনা ও রুপার সুতা প্রয়োজন হয়।
  • বিশাল খরচ: সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি কিসওয়াহ বা গিলাফ তৈরি করতে প্রতি বছর কয়েক মিলিয়ন সৌদি রিয়াল ব্যয় হয়, যা এটিকে বিশ্বের অন্যতম মূল্যবান ধর্মীয় আবরণে পরিণত করেছে।
  • দক্ষ কারিগর: প্রায় একশোরও বেশি অভিজ্ঞ কারিগর ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে সারা বছর ধরে কেবল একটি গিলাফই প্রস্তুত করা হয়।

আগে প্রতি বছর ৯ জিলহজ অর্থাৎ হজের দিন কাবার পুরোনো গিলাফ বদলে নতুন গিলাফ পরানো হতো। তবে বর্তমানে এই নিয়ম পরিবর্তন করে আরবি বছরের প্রথম মাস অর্থাৎ মহররম মাসের ১ তারিখে নতুন গিলাফ পরানো হয়। পুরোনো গিলাফটি অত্যন্ত যত্নের সাথে টুকরো করে বিভিন্ন মুসলিম দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব এবং আন্তর্জাতিক ইসলামি জাদুঘরগুলোতে উপহার হিসেবে পাঠানো হয়।

ইসলামে কাবার গিলাফের ধর্মীয় অবস্থান

কাবার গিলাফের ইতিহাস যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি এর একটি ধর্মীয় দিকও আমাদের পরিষ্কার জানা থাকা দরকার। ইসলাম ধর্মে কাবা শরিফকে কাপড়ে ঢেকে রাখা কোনো ফরজ, ওয়াজিব বা সুন্নতে মুয়াক্কাদা বিধান নয়। কুরআন বা হাদিসের কোথাও কাবাকে গিলাফ দিয়ে আবৃত করার কোনো নির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়নি।

এটি মূলত কাবা ঘরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, এর সৌন্দর্য রক্ষা এবং একটি ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের অংশ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:

“নিশ্চয়ই মানুষের জন্য সর্বপ্রথম যে ঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা মক্কার ঘর, বরকতময় এবং বিশ্ববাসীর জন্য হিদায়াতস্বরূপ।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯৬)

ইসলামের দৃষ্টিতে কাবার আসল মর্যাদা এর গিলাফের কাপড়ে নয়, বরং আল্লাহর নির্দেশে এটি পুরো মুসলিম উম্মাহর একমাত্র ‘কিবলা’ হওয়ার কারণে। আর কিসওয়াহ বা গিলাফ হলো বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মুসলিমদের ঐক্য ও ভালোবাসার এক দৃশ্যমান বহিঃপ্রকাশ।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img
error: Content is protected !!