হটলাইনঃ +৮৮০ ৯৬১৩ ০০০ ২০০ |
বুধবার, জুন ১৭, ২০২৬
- বিজ্ঞাপন-spot_img
Homeইসলাম ও জীবনকসম ভেঙে ফেলার কাফফারা ও করণীয় কী? জেনে নিন ইসলামের সঠিক বিধান
spot_img

কসম ভেঙে ফেলার কাফফারা ও করণীয় কী? জেনে নিন ইসলামের সঠিক বিধান

মানুষ হিসেবে আমরা সবাই কম-বেশি আবেগপ্রবণ। জীবনের নানা মুহূর্তে রাগ, অভিমান, কষ্ট কিংবা চরম হতাশা থেকে আমরা অনেক সময় এমন কিছু কথা বলে ফেলি, যা পরবর্তী সময়ে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে রাগের মাথায় বা আবেগের বশবর্তী হয়ে অনেকেই আল্লাহর নামে কসম বা শপথ করে বসেন ‘আমি আর কখনো এই কাজ করব না’, ‘ওই ব্যক্তির সাথে আর কথা বলব না’, কিংবা ‘এই খাবার আর কোনোদিন খাব না’।

কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে, পরিস্থিতির চাপে অথবা কোনো যৌক্তিক কারণে সেই কসম রক্ষা করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয় না। এমন অবস্থায় মনে প্রশ্ন জাগে— কসম ভেঙে ফেললে কি গুনাহ হবে? এর কাফফারা কী? ইসলাম এ বিষয়ে কী নির্দেশনা দিয়েছে? পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ আমাদের এ বিষয়ে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও সহজ দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

এক নজরে কসম ভঙ্গের কাফফারা ও নিয়মাবলী

যদি কেউ দৃঢ়ভাবে কোনো কসম করার পর তা ভেঙে ফেলে, তবে তাকে নিচের ৩টি প্রধান মাধ্যমের যেকোনো একটি বেছে নিতে হবে। যদি কোনোটিতেই সামর্থ্য না থাকে, তবেই কেবল শেষ মাধ্যমটি প্রযোজ্য হবে:

কাফফারার প্রকারকরণীয় বা বিবরণসামর্থ্য না থাকলে বিকল্প
১. মিসকিনকে খাবার দেওয়া১০ জন অসহায় বা মিসকিনকে দুই বেলা পেট ভরে খাবার খাওয়ানোখাবার দেওয়ার আর্থিক সামর্থ্য থাকতে হবে
২. পোশাক দান করা১০ জন মিসকিনকে পরিধানযোগ্য এক জোড়া করে বস্ত্র বা কাপড় দেওয়াপোশাক দেওয়ার আর্থিক সামর্থ্য থাকতে হবে
৩. দাস মুক্ত করাএকজন দাস মুক্ত করা (যা বর্তমান যুগে প্রথাটি না থাকায় কার্যকর নয়)
৪. রোজা রাখা (সর্বশেষ বিকল্প)উপরের ৩টির কোনোটিরই সামর্থ্য না থাকলে টানা ৩ দিন রোজা রাখাকেবল আর্থিক অসচ্ছলদের জন্য প্রযোজ্য

কসম ভঙ্গের বিষয়ে পবিত্র কুরআনের নির্দেশনা

আল্লাহ তাআলা মানুষের দুর্বলতার কথা ভালো করেই জানেন। তাই ভুলবশত বা রাগের মাথায় করা শপথের জন্য তিনি সরাসরি শাস্তি না দিয়ে কাফফারার বিধান রেখেছেন। পবিত্র কুরআনের সুরা আল-মায়িদাহর ৮৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

لَا يُؤَاخِذُكُمُ اللَّهُ بِاللَّغْوِ فِي أَيْمَانِكُمْ وَلَٰكِن يُؤَاخِذُكُم بِمَا عَقَّدتُّمُ الْأَيْمَانَ ۖ فَكَفَّارَتُهُ إِطْعَامُ عَشَرَةِ مَسَاكِينَ مِنْ أَوْسَطِ مَا تُطْعِمُونَ أَهْلِيكُمْ أَوْ كِسْوَتُهُمْ أَوْ تَحْرِيرُ رَقَبَةٍ ۖ فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ

অর্থ: ‘আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের অনর্থক শপথের জন্য পাকড়াও করবেন না। তবে তোমরা যে শপথ দৃঢ়ভাবে কর, সে জন্য তিনি তোমাদেরকে জবাবদিহির আওতায় আনবেন। সুতরাং তার কাফফারা হলো দশজন মিসকিনকে মধ্যম ধরনের খাবার খাওয়ানো, যা তোমরা নিজেদের পরিবারকে খাওয়াও; অথবা তাদেরকে বস্ত্র প্রদান করা; অথবা একজন দাস মুক্ত করা। আর যে ব্যক্তি এর কোনোটি করতে সক্ষম না হবে, সে তিন দিন রোজা রাখবে। এটি তোমাদের শপথের কাফফারা, যখন তোমরা শপথ ভঙ্গ কর। আর তোমরা নিজেদের শপথ রক্ষা কর।’

কসম ভাঙলে যেভাবে কাফফারা আদায় করবেন

কুরআনের এই আয়াতের আলোতে ইসলামিক স্কলার ও আলেমগণ কসম ভঙ্গের কাফফারা আদায়ের পদ্ধতিগুলো বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। কেউ কসম ভাঙলে তাকে নিচের নিয়মগুলো মানতে হবে:

১. ১০ জন মিসকিনকে খাবার খাওয়ানো

আপনার পরিবারকে দৈনন্দিন যে মানের খাবার খাওয়ান, সেই মধ্যম ধরনের খাবার ১০ জন অভাবী বা মিসকিনকে দুই বেলা পেট ভরে খাওয়াতে হবে। অথবা চাইলে ১০ জন মিসকিনকে এক ফিতরা পরিমাণ টাকা বা সমমূল্যের খাদ্যসামগ্রী (যেমন চাল বা গম) দান করলেও কাফফারা আদায় হয়ে যাবে।

২. ১০ জন মিসকিনকে বস্ত্র বা কাপড় দেওয়া

১০ জন অসহায় মানুষকে এমন পোশাক বা কাপড় দিতে হবে, যা দিয়ে তারা শরীর ঢাকতে পারে এবং নামাজ আদায় করতে পারে। সাধারণত এক জোড়া করে পরিধানযোগ্য কাপড় দেওয়া উত্তম।

৩. রোজা রাখা (বিশেষ শর্তে)

অনেকেরই একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে, কসম ভাঙলেই বুঝি ৩টি রোজা রাখতে হবে। এটি সম্পূর্ণ ভুল। কাফফারার মূল বিধান হলো আর্থিক (খাবার বা কাপড় দেওয়া)। কোনো ব্যক্তির যদি ১০ জন মিসকিনকে খাবার বা কাপড় দেওয়ার মতো বিন্দুমাত্র আর্থিক সামর্থ্য না থাকে, কেবল তখনই সে বিকল্প হিসেবে ধারাবাহিকভাবে বা টানা ৩ দিন রোজা রাখবে। সামর্থ্য থাকতে টাকা না দিয়ে রোজা রাখলে কাফফারা আদায় হবে না।

রাগের মাথায় কসম ও ইসলামে রাগ নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব

অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষ কসম করে চরম রাগের মাথায় বা আবেগের বশে। ইসলাম তাই শুরুতেই রাগ নিয়ন্ত্রণকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। কারণ রাগের বশবর্তী হয়ে মানুষ এমন অনেক সিদ্ধান্ত নেয় বা কসম করে, যা পরে তার জন্য বড় অনুশোচনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণের তাগিদ দিয়ে বলেছেন:

لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُراعَةِ، إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ

অর্থ: ‘প্রকৃত শক্তিশালী বা বীর সেই ব্যক্তি নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং প্রকৃত বীর সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (সহিহ বুখারি: ৬১১৪, সহিহ মুসলিম: ২৬০৯)

কসম করার পর তা ভেঙে ফেলা কি ভালো?

যদি কেউ এমন কোনো বিষয়ে কসম করে যা ইসলামের দৃষ্টিতে অন্যায় বা যার কারণে আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট হয়, তবে সেই কসম ভেঙে ফেলা এবং কাফফারা দেওয়াটাই উত্তম। যেমন, কেউ যদি কসম করে বলে, “আমি আমার ভাইয়ের সাথে আর কোনোদিন কথা বলব না”, তবে ইসলাম বলে এই কসম ভেঙে ভাইয়ের সাথে কথা বলা উচিত এবং কসম ভঙ্গের জন্য কাফফারা দেওয়া উচিত। কারণ সম্পর্ক বজায় রাখা কসমের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

একজন মুমিনের বর্তমান করণীয়

কসম করার আগে আমাদের খুব ভালোভাবে চিন্তা করা উচিত। সামান্য কারণে-অকারণে কথায় কথায় আল্লাহর নামে কসম খাওয়া মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। যদি কোনো কসম বাস্তবায়ন করা কল্যাণকর না হয়, তবে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী দ্রুত কাফফারা আদায় করে নেওয়া উচিত।

আরো খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সর্বাধিক জনপ্রিয়

- বিজ্ঞাপন-spot_img

সাম্প্রতিক মন্তব্য

- বিজ্ঞাপন-spot_img
error: Content is protected !!