ইরানের রাজপথ এখন রক্তে রঞ্জিত। সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, তা কার্যত রক্তবন্যা বইয়ে দিচ্ছে। বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে সরাসরি তাজা গুলি ছোড়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘ইরান ইন্টারন্যাশনাল’-এর তথ্যমতে, গত ৪৮ ঘণ্টায় নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রায় দুই হাজার মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নিহতের প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রোববার (১১ জানুয়ারি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ইরান ইন্টারন্যাশনাল এই ভয়াবহ তথ্য জানিয়েছে। দেশটির ইন্টারনেট সেবা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে এই দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে, যাতে বাইরের বিশ্ব ভেতরের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে না পারে।
কঠোর দমন-পীড়ন ও লাশের সারি
ইরানজুড়ে চলা এই বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা কোনো ছাড় দিচ্ছে না। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের সুযোগ নিয়ে বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হচ্ছে। দক্ষিণ তেহরানের কাহরিজাক এলাকা থেকে পাঠানো একটি ভিডিওতে দেখা গেছে ভয়াবহ দৃশ্য। সেখানে রাস্তায় এবং একটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল শেডের পাশে বেশ কয়েকজন মানুষের মরদেহ পড়ে আছে। অনেক মরদেহ ইতিমধ্যে বডি ব্যাগে ভরে রাখা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা গেছে, শুধুমাত্র ওই এলাকাতেই কয়েক ডজন মরদেহ দেখা গেছে। এটি নির্দেশ করে যে, নিরাপত্তা বাহিনী কতটা আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। কেবল রাজধানী তেহরান নয়, বরং যেখানেই বিক্ষোভ দানা বাঁধছে, সেখানেই চলছে গুলিবর্ষণ।
হাসপাতালগুলোতে লাশের স্তূপ
ফারদিস, কারাজ এবং পূর্ব তেহরানের আলঘাদির হাসপাতাল থেকে পাওয়া ভিডিও ফুটেজেও একই চিত্র উঠে এসেছে। এসব ভিডিওতে হাসপাতালের মেঝেতে এবং করিডোরে মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা গেছে। উত্তরাঞ্চলীয় শহর ‘রাশত’-এর এক চিকিৎসক ইরান ইন্টারন্যাশনালকে জানিয়েছেন, শুধুমাত্র তাদের হাসপাতালেই অন্তত ৭০টি মরদেহ আনা হয়েছে।
এই তথ্যগুলো প্রমাণ করে যে, সহিংসতা কোনো নির্দিষ্ট শহরে সীমাবদ্ধ নেই। তেহরানের বিভিন্ন অংশ এবং কারাজের ফাদরিসে সহিংসতার মাত্রা সবচেয়ে বেশি। তবে দেশের অন্যান্য প্রান্ত থেকেও বিক্ষোভকারীদের ওপর ব্যাপক হারে গুলি ছোড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। চিকিৎসকরা হিমশিম খাচ্ছেন আহত ও নিহতদের সামলাতে।
ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন: ভরসা এখন স্টারলিংক
বিক্ষোভের খবর যাতে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেজন্য ইরান সরকার ইন্টারনেট সংযোগ প্রায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। ফলে দেশটির ভেতরের সঠিক চিত্র পুরোপুরি উঠে আসছে না। তবে প্রযুক্তির কল্যাণে কিছু খবর বাইরে আসছে।
সাধারণ ইন্টারনেট বন্ধ থাকলেও ইলন মাস্কের ‘স্টারলিংক’ স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের মাধ্যমে কিছু সাহসী নাগরিক ভিডিও ও তথ্য বাইরে পাঠাতে সক্ষম হচ্ছেন। ইরান ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, যেসব ভিডিও এবং তথ্য তারা পাচ্ছে, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় বিক্ষোভ দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে ব্যাপকভাবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইন্টারনেট বন্ধ রেখে এমন হত্যাকাণ্ড চালানো মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। ২ হাজার মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা সত্য হলে এটি হবে ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ঘটনা। বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে ইরানের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির দিকে।
সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল








