বর্তমানে ডেঙ্গু আমাদের দেশে একটি আতঙ্কের নাম। ঘরে ঘরে অনেক মানুষই আজ এই জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন। তবে ডেঙ্গু নিয়ে ভয় পাওয়ার চেয়ে সচেতন হওয়া বেশি জরুরি। প্রথমত, একটি কথা আমাদের খুব ভালোভাবে মাথায় নিতে হবে ডেঙ্গু জ্বরের সরাসরি কোনো ওষুধ নেই। অর্থাৎ অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য কোনো জাদুকরী ওষুধ দিয়ে ডেঙ্গু এক দিনে ভালো করা সম্ভব নয়।
ডেঙ্গু রোগের মূল চিকিৎসা হলো শরীরের পানির সামঞ্জস্য বা ‘ফ্লুইড ব্যালেন্স’ ঠিক রাখা। অধিকাংশ মানুষ মনে করেন, জ্বর ছেড়ে গেলেই রোগী একদম সুস্থ হয়ে গেছেন। কিন্তু এটি একটি মারাত্মক ভুল ধারণা! প্রকৃতপক্ষে, ডেঙ্গু রোগীর জ্বর কমে যাওয়ার পরের ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টাই হলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘ক্রিটিক্যাল ফেজ’ বলা হয়।
ডেঙ্গুর ‘ক্রিটিক্যাল ফেজ’ এবং বিপজ্জনক লক্ষণসমূহ
সাধারণত ডেঙ্গু জ্বর শুরুর ৩ থেকে ৮ দিনের মাথায় ক্রিটিক্যাল ফেজ বা জটিল সময় আসতে পারে। এই সময়ে রোগীর শরীরের রক্তনালী থেকে তরল উপাদান বা প্লাজমা বাইরে বেরিয়ে আসে। ফলে রক্তচাপ কমে যেতে পারে এবং তৈরি হতে পারে নানা জটিলতা।
যদি কোনো ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দেয়, তবে এক মুহূর্তও ঘরে বসে থাকা যাবে না। এগুলো হলো ডেঙ্গুর বিপৎচিহ্ন:
- পেটে তীব্র বা অসহ্য ব্যথা হওয়া।
- বারবার বমি হওয়া বা কিছু খেতে না পারা।
- নাক, মুখ বা মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া।
- বমি বা পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাওয়া।
- অতিরিক্ত শারীরিক দুর্বলতা ও চরম অস্থিরতা অনুভব করা।
- শ্বাসকষ্ট হওয়া বা বুক ধড়ফড় করা।
এসব লক্ষণ দেখা দেওয়া মাত্রই কোনো ফার্মেসির দোকানদার, গ্রামের ভণ্ড চিকিৎসক বা প্রতিবেশীর পরামর্শে সময় নষ্ট না করে সরাসরি হাসপাতালে চলে যেতে হবে। মনে রাখবেন, ঘরের পাশের দোকানদারের পরামর্শে ভুল ওষুধ খেলে রোগীর জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ডেঙ্গু হলে ঘরে বসে কী করবেন এবং কী খাবেন?
যেহেতু ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট ওষুধ নেই, তাই শরীরের তরল বা পানিশূন্যতা পূরণ করাই হলো প্রধান কাজ। রোগী যেন পানিশূন্যতায় না ভোগেন, সেদিকে সার্বক্ষণিক খেয়াল রাখতে হবে।
- প্রচুর তরল খাবার পান করুন: পানি তো খাবেনই, পাশাপাশি খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি, তাজা ফলের রস, লেবুর শরবত এবং পাতলা স্যুপ খেতে দিন।
- বিশ্রাম নিন: ডেঙ্গু রোগীকে সম্পূর্ণ শারীরিক বিশ্রামে থাকতে হবে। কোনো ধরনের ভারী কাজ করা যাবে না।
- অহেতুক ওষুধ খাবেন না: ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কোনো ব্যথানাশক ওষুধ (যেমন: আইবুপ্রোফেন, নাপ্রোক্সেন বা এসপিরিন) ভুলেও খাওয়া যাবে না। এতে শরীরের ভেতরের রক্তক্ষরণ বেড়ে যেতে পারে।
ডেঙ্গু নির্ণয়ে NS1 পরীক্ষা কখন করবেন?
কারো জ্বর এলেই অবহেলা না করে প্রথম দিনেই Dengue NS1 টেস্ট বা পরীক্ষাটি করিয়ে ফেলা উচিত।
মনে রাখা অত্যন্ত জরুরি, এই NS1 টেস্টটি কেবল জ্বর শুরুর প্রথম ৫ দিনের মধ্যেই পজিটিভ আসে। পাঁচ দিন পার হয়ে গেলে রক্তে এই অ্যান্টিজেন আর পাওয়া যায় না, তখন টেস্ট করলে রিপোর্ট নেগেটিভ আসতে পারে যদিও রোগী ডেঙ্গুতেই আক্রান্ত! তাই পাঁচ দিন পার হয়ে গেলে ডেঙ্গু নিশ্চিত করার জন্য অন্য পরীক্ষা (যেমন: Anti-Dengue IgM/IgG) করতে হয়।
সুতরাং, জ্বর আসার পর দিন গুণবেন না। প্রথম দিনই ডেঙ্গু পরীক্ষা নিশ্চিত করুন এবং কোনো চ্যাটবক্স বা ফোনের মেসেজে চিকিৎসা না নিয়ে সরাসরি রেজিস্টার্ড ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
প্লাটিলেট কী এবং কেন কমে যায়?
আমাদের রক্তের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো প্লাটিলেট বা অণুচক্রিকা। এর প্রধান কাজ হলো শরীরে কোনো অংশ কেটে গেলে বা আঘাত পেলে রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করা। একজন সুস্থ মানুষের রক্তে স্বাভাবিকভাবে দেড় লাখ থেকে সাড়ে চার লাখ পর্যন্ত প্লাটিলেট থাকে।
ডেঙ্গু ভাইরাসের আক্রমণে রক্তে এই প্লাটিলেটের সংখ্যা দ্রুত কমতে শুরু করে। যদি রক্তে প্লাটিলেটের সংখ্যা ২০ হাজারের নিচে নেমে আসে, তবে কোনো আঘাত ছাড়াই শরীরের ভেতর বা বাইরে স্বতঃস্ফূর্ত রক্তক্ষরণ শুরু হতে পারে। এটিই ডেঙ্গুতে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।
প্রাকৃতিক উপায়ে রক্তে প্লাটিলেট বাড়ানোর উপায়
রক্তে প্লাটিলেট কমে গেলে ভয় না পেয়ে সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। কিছু প্রাকৃতিক ও পুষ্টিকর খাবার রয়েছে, যা দ্রুত প্লাটিলেট বাড়াতে এবং শরীরকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে:
১. পেঁপে ও পেঁপে পাতার রস
প্লাটিলেট দ্রুত বাড়াতে পেঁপে পাতার রস জাদুকরী ভূমিকা পালন করে। মালয়েশিয়ার ‘এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’-র এক গবেষণায় দেখা গেছে, ডেঙ্গুর কারণে কমে যাওয়া প্লাটিলেট দ্রুত বৃদ্ধিতে পেঁপে পাতার নির্যাস দারুণ কার্যকর। প্রতিদিন তাজা পেঁপে পাতার রস অথবা পাকা পেঁপের জুস খেলে রক্তে অণুচক্রিকার সংখ্যা দ্রুত বাড়ে।
২. মিষ্টি কুমড়া ও কুমড়ার বীজ
মিষ্টি কুমড়াতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘এ’ রয়েছে, যা রক্তে প্লাটিলেট তৈরিতে সরাসরি সাহায্য করে। এছাড়া মিষ্টি কুমড়ার বীজও প্লাটিলেট বাড়াতে বেশ কার্যকরী। নিয়ম করে মিষ্টি কুমড়ার তরকারি বা বীজ খেলে উপকার পাওয়া যায়।
৩. লেবুর রস ও ভিটামিন সি
লেবুতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ‘সি’। এই ভিটামিন রক্তে প্লাটিলেট ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা করে এবং নতুন প্লাটিলেট তৈরিতে সাহায্য করে। এছাড়া এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
৪. আমলকী
আমলকী ভিটামিন ‘সি’ এবং শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্টে ভরপুর। প্রতিদিন সকালে খালি পেটে আমলকীর রস খেলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং রক্ত বিশুদ্ধ থাকে, যা প্লাটিলেট বজায় রাখতে সাহায্য করে।
৫. অ্যালোভেরা বা ঘৃতকুমারী
অ্যালোভেরা জুস রক্ত পরিশোধন করতে এবং রক্তে যেকোনো ধরনের সংক্রমণ দূর করতে সাহায্য করে। নিয়মিত পরিমিত মাত্রায় অ্যালোভেরার জুস পান করলে রক্তের প্লাটিলেটের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
৬. ডালিম বা বেদানা
ডালিমে প্রচুর পরিমাণে মিনারেল ও আয়রন রয়েছে। এটি শরীরের দুর্বলতা দূর করে শক্তি জোগায়। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন ১৫০ মিলিলিটার ডালিমের রস একটানা দুই সপ্তাহ পান করলে রক্তের প্লাটিলেটের সংখ্যা লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমাদের করণীয়
চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ সবসময়ই উত্তম। ডেঙ্গু ছড়ায় এডিস মশার মাধ্যমে, আর এই মশা জন্মায় জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে। তাই শুধু নিজের ঘরের ভেতর সচেতন হলেই চলবে না, আশপাশের পরিবেশও পরিষ্কার রাখতে হবে।
- ঘরের টব, ফ্রিজের ট্রে, এয়ার কন্ডিশনার বা প্লাস্টিকের পাত্রে যেন কোনোভাবেই ৩ দিনের বেশি পরিষ্কার পানি জমে না থাকে।
- ছাদ বা বারান্দায় পানি জমে আছে কিনা নিয়মিত পরীক্ষা করুন।
- দিনে বা রাতে ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করুন।
- প্রতিবেশীদেরও এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করতে উদ্বুদ্ধ করুন।
মনে রাখবেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে কারো ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না। নিজেদের সুরক্ষা নিজেদেরকেই সুনিশ্চিত করতে হবে।








