ভেনিজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসনের পর থেকেই বিশ্বজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছে পরবর্তী লক্ষ্য কি ইরান? ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কি এবার ভেনেজুয়েলার মতোই একই কায়দায় ইরানের সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করবে? মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা এবং আমেরিকার আগ্রাসী মনোভাব সেই আশঙ্কাকেই উসকে দিচ্ছে।
তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক এবং সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভেনিজুয়েলার ফর্মুলা ইরানে প্রয়োগ করা কার্যত অসম্ভব। ইরানে ভেনেজুয়েলা কৌশল খাটানো আমেরিকার জন্য কেন আত্মঘাতী হতে পারে, তার পেছনে রয়েছে বেশ কিছু শক্তিশালী কারণ। আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা সেই কারণগুলোই সহজভাবে তুলে ধরব।
তেহরান আর কারাকাস এক নয়: সামরিক শক্তির বিশাল ব্যবধান
আমেরিকা চাইলেই ভেনেজুয়েলার মতো ইরানে সহজে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। এর প্রধান কারণ হলো দুই দেশের সামরিক সক্ষমতার আকাশ-পাতাল পার্থক্য। ভেনেজুয়েলায় মাদুরো সরকারকে উৎখাত করার জন্য সিআইএ (CIA) প্রায় ছয় মাস ধরে প্রস্তুতি নিয়েছিল এবং তাদের সামরিক বাহিনীতে বিশৃঙ্খলা ছিল।
কিন্তু ইরানের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইরানের রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহৎ এবং সুশৃঙ্খল সামরিক বাহিনী।
- বিশাল সেনাবহর: ইরানে সক্রিয় এবং রিজার্ভ মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ সেনা সদস্য যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।
- আইআরজিসি (IRGC): ইরানের ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ বা আইআরজিসি-তে অন্তত দেড় লাখ প্রশিক্ষিত সদস্য রয়েছে, যারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রণাঙ্গনে যুদ্ধের বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন।
- বসিজ মিলিশিয়া: দেশটির সাধারণ জনগণের মধ্য থেকে তৈরি কয়েক লাখ সদস্যের ‘বসিজ মিলিশিয়া’ বাহিনী যেকোনো মুহূর্তে প্রতিরোধ গড়তে সক্ষম।
এছাড়াও ইরানের কাছে রয়েছে নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি আধুনিক ব্যালিস্টিক মিসাইল, শক্তিশালী ড্রোন বাহিনী এবং দক্ষ নৌবাহিনী। ভেনেজুয়েলার মতো দুর্বল সামরিক অবকাঠামো ইরানের নেই, যা আমেরিকাকে ভাবিয়ে তুলছে।
হরমুজ প্রণালী: বিশ্ব অর্থনীতির তুরুপের তাস
ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকেও ইরান ভেনেজুয়েলার চেয়ে অনেক বেশি সুবিধাজনক স্থানে রয়েছে। বিশ্বের জ্বালানি তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। ইরান কৌশলগতভাবে এই প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখে।
যদি আমেরিকা ইরানে হামলা চালায়, তবে ইরান খুব সহজেই হরমুজ প্রণালী আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারে। এর ফলে:
১. বিশ্ববাজারে তেলের দাম কল্পনাতীতভাবে বেড়ে যাবে।
২. আমেরিকা ও ইউরোপসহ সারা বিশ্বের অর্থনীতিতে ধস নামবে।
৩. জ্বালানি সংকটে অচল হয়ে পড়তে পারে অনেক দেশের শিল্পকারখানা।
ভেনেজুয়েলার হাতে এমন কোনো বৈশ্বিক ‘তুরুপের তাস’ ছিল না, যা দিয়ে তারা আমেরিকাকে চাপে ফেলতে পারত।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের মিত্রশক্তির নেটওয়ার্ক
ইরান একা নয়। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তাদের একটি শক্তিশালী মিত্র নেটওয়ার্ক রয়েছে, যাকে পশ্চিমারা ‘রিং অফ ফায়ার’ বলে থাকে। লেবানন, ইরাক, সিরিয়া এবং ইয়েমেনে ইরানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থনপুষ্ট একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে। হিজবুল্লাহর মতো সংগঠনগুলো ইরানের নির্দেশে যেকোনো সময় ইজরায়েল বা মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালাতে সক্ষম।
অর্থাৎ, ইরানে ভেনেজুয়েলা কৌশল প্রয়োগ করতে গেলে আমেরিকাকে শুধু একটি ফ্রন্টে নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধ করতে হবে। এটি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এক দুঃস্বপ্ন হতে পারে।
রাশিয়া ও চীনের শক্তিশালী অবস্থান
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ইরান একা হয়ে পড়েনি। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে মাদুরো সরকার রাশিয়া বা চীনের কাছ থেকে সরাসরি বড় কোনো সামরিক সহায়তা পায়নি। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে সমীকরণটি ভিন্ন। ইরানের সাথে রাশিয়া ও চীনের গভীর কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।
ইরানের ওপর সরাসরি হামলা মানেই হলো পরোক্ষভাবে রাশিয়া ও চীনের স্বার্থে আঘাত করা। এতে করে একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ খুব দ্রুতই আন্তর্জাতিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে, যা আমেরিকা কখনোই চাইবে না।
পারমাণবিক কর্মসূচি এবং মার্কিন ভয়
ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক না হলেও, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পশ্চিমা বিশ্বের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। আমেরিকা জানে, কোণঠাসা হয়ে পড়লে ইরান তাদের পারমাণবিক সক্ষমতাকে পূর্ণাঙ্গ অস্ত্রে রূপ দিতে পারে। এই ‘অজানা ভয়’ বা ডেটারেন্স (Deterrence) আমেরিকাকে সরাসরি আগ্রাসন থেকে বিরত রাখছে।
ট্রাম্পের জন্য কঠিন পরীক্ষা
সবদিক বিবেচনা করলে দেখা যায়, ভেনেজুয়েলায় যে কৌশল সফল হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, ইরানে তা অকার্যকর। ইরানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী, ভৌগোলিক সুবিধা, শক্তিশালী মিত্র এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে তাদের প্রভাব সব মিলিয়ে তেহরান এক দুর্ভেদ্য দুর্গ। ট্রাম্প প্রশাসন যদি আবেগের বশবর্তী হয়ে ইরানে হামলা চালায়, তবে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, খোদ আমেরিকার অর্থনীতির জন্যও বুমেরাং হতে পারে। তাই বিশ্লেষকরা নিশ্চিত, ইরানে ভেনেজুয়েলার কৌশল খাটবে না।
সূত্র: আল জাজিরা








