বাঙালি ও ইলিশ—এই দুইয়ের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। আর উৎসব যদি হয় দুর্গাপূজা, তবে তো কথাই নেই! আসন্ন দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সুস্বাদু পদ্মার ইলিশ পাওয়ার জন্য মুখিয়ে রয়েছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ভোজনরসিকরা। তাই তো দুর্গাপূজা উপলক্ষে বাংলাদেশ সরকারের ইলিশ মাছের ওপর জারি রাখা রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা স্থায়ীভাবে তুলে নেওয়ার জন্য জোরালো অনুরোধ জানিয়েছেন ভারতের মাছ আমদানিকারকরা।
সম্প্রতি ভারতের কলকাতার ‘ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন’ এ বিষয়ে বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। ভারতের বার্তা সংস্থা এএনআই (ANI)-এর প্রতিবেদনে এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে। চিঠিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে যেন বাংলাদেশ পুনরায় ভারতে ইলিশ পাঠানোর সুযোগ তৈরি করে দেয়।
বাণিজ্যমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে ভারতের আমদানিকারকদের আকুল আবেদন
কলকাতার ‘ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে দুই দেশের ঐতিহাসিক বাণিজ্যিক সম্পর্কের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, তারা ১৯৯৬ সাল থেকে নিয়মিতভাবে বেনাপোল ও আখাউড়া স্থল শুল্ক স্টেশনের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আমদানি করে আসছিলেন। কিন্তু ২০১২ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশ সরকার সার্বিক সংকট বিবেচনায় আনুষ্ঠানিকভাবে ইলিশ রপ্তানি নিষিদ্ধ করে। এরপর থেকেই ভারতের ব্যবসায়ীরা বারবার এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন।
সাময়িক অনুমতিতে অসন্তোষ কেন?
চিঠিতে আমদানিকারকরা আরও উল্লেখ করেছেন যে, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে প্রতি বছর দুর্গাপূজার উৎসবকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ সরকার মাত্র ১ মাসের জন্য বিশেষ সুবিধায় অল্প পরিমাণ ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দিয়ে আসছে। তবে ভারতীয় আমদানিকারকদের মতে, এত অল্প সময়ের বিশেষ সুযোগ ব্যবসায়িকভাবে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল নিশ্চিত করতে পারছে না এবং চাহিদা পূরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
দুই বাংলার সংস্কৃতি ও রন্ধনশৈলীর মেলবন্ধন
ভারতে ইলিশ পাঠানোর এই আহ্বানের পেছনে শুধু বাণিজ্যিক স্বার্থ নয়, রয়েছে দুই বাংলার মানুষের গভীর আবেগের সম্পর্ক। ভারতের আমদানিকারকরা চিঠিতে দুই বাংলার অভিন্ন সংস্কৃতি, মাতৃভাষা এবং খাবার ও রন্ধনশৈলীর ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের কথা বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন।
- জনপ্রিয় এলাকা: ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম এবং ত্রিপুরা রাজ্যে বাংলাদেশের পদ্মার রূপালী ইলিশ অত্যন্ত প্রিয় এবং জনপ্রিয় একটি খাবার।
- উৎসবের আমেজ: দুর্গাপূজার দিনগুলোতে পদ্মার ইলিশ দিয়ে তৈরি ঐতিহ্যবাহী পদ ছাড়া অনেকের উৎসবের আনন্দই যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
- কৃতজ্ঞতা প্রকাশের আশ্বাস: ভারতের মাছ আমদানিকারকরা আশা প্রকাশ করেছেন, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বাংলাদেশ সরকার যদি স্থায়ীভাবে ইলিশ রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়, তবে ভারতের জনগণ বাংলাদেশের কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবে।
ভারতে ইলিশ রপ্তানি ও বাংলাদেশের বাস্তবতা
বাণিজ্যিক চাহিদার কথা থাকলেও দেশের বাজারের ইলিশের সার্বিক স্বল্পতা এবং রেকর্ড দামের বিষয়টি সর্বদাই আলোচনায় থাকে। গত কয়েক বছরে দেশের স্থানীয় বাজারে ইলিশের আকাশচুম্বী দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এই অবস্থায় সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ দেশের চাহিদা পূরণ না করে বিদেশে ইলিশ রপ্তানির বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে।
তবে কূটনৈতিক সম্পর্ক ও আঞ্চলিক সৌহার্দ্যের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশ সরকারের এই সিদ্ধান্তের ওপর এখন নজর সবার। এখন দেখার বিষয়, আগামী দুর্গাপূজা উপলক্ষে বাংলাদেশ সরকার এই অনুরোধে কী সাড়া দেয় এবং ইলিশের বিষয়ে নতুন কোনো বাণিজ্য নীতি গ্রহণ করে কি না।








