বিশ্বকাপ ফুটবলের ময়দানে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছিল, তার অবসান ঘটেছে। আজ শনিবার ইরানের ফুটবল ফেডারেশন আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, তাদের জাতীয় দল আগামী ২০২৬ বিশ্বকাপে মাঠে নামছে। তবে এই অংশগ্রহণ সাধারণ কোনো ঘোষণা নয়; এর পেছনে রয়েছে ১০টি সুনির্দিষ্ট শর্ত।
কেন এই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল
ইরানের এই কঠিন অবস্থানের নেপথ্যে রয়েছে গত মাসে ঘটে যাওয়া একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। ফিফা কংগ্রেসে অংশ নিতে যাওয়ার সময় ইরানের ফুটবল ফেডারেশনের প্রধানকে কানাডায় ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়। এই ঘটনায় ইরান ক্ষুব্ধ হয় এবং আয়োজক তিনটি দেশ যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার নিরাপত্তা এবং আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সেই প্রেক্ষাপটেই ইরান জানিয়ে দিয়েছে, তাদের শর্ত পূরণ না হলে তারা মাঠে নামবে না।
ইরানের দেওয়া ১০টি শর্তের মূল বিষয়গুলো কী কী
ইরানিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট মাহদি তাজ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তারা তাদের জাতীয় স্বার্থ ও খেলোয়াড়দের সম্মানের প্রশ্নে কোনো আপস করবেন না। ১০টি শর্তের মধ্যে প্রধান কয়েকটি হলো:
- ভিসা জটিলতা নিরসন: জাতীয় দলের সকল খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফকে কোনো হয়রানি ছাড়াই ভিসা দিতে হবে।
- সামরিক দায়িত্ব পালনকারীদের ছাড়: মেহদি তারেমি ও এহসান হাজসাফির মতো তারকা ফুটবলাররা যারা আইআরজিসিতে (IRGC) সামরিক দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের কোনো আইনি ঝামেলা ছাড়াই দেশগুলোতে প্রবেশের অনুমতি দিতে হবে।
- জাতীয় প্রতীকের মর্যাদা: টুর্নামেন্ট চলাকালে ইরানের জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীতের প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করতে হবে।
- নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা: বিমানবন্দর থেকে শুরু করে হোটেল এবং স্টেডিয়ামে যাতায়াতের সময় ইরানের দলকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দিতে হবে।
- সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের সুরক্ষা: ইরানের খেলোয়াড়দের ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতির পরিপন্থী কোনো পরিবেশ বা পরিস্থিতি তৈরি করা যাবে না।
গ্রুপ ‘জি’-তে ইরানের প্রতিপক্ষ কারা
বিশ্বকাপের সূচি অনুযায়ী ইরান খেলবে গ্রুপ ‘জি’-তে। এই গ্রুপে তাদের মোকাবিলা করতে হবে শক্তিশালী সব প্রতিপক্ষকে। ইরানের গ্রুপ সঙ্গীরা হলো:
- নিউজিল্যান্ড
- বেলজিয়াম
- মিসর
আগামী ১৫ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে ইরানের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
নিজেদের সংস্কৃতিতে অটল থাকার ঘোষণা
ইরানি ফেডারেশন তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে একটি বলিষ্ঠ বিবৃতি দিয়েছে। সেখানে তারা বলেছে, “আমরা ২০২৬ বিশ্বকাপে অবশ্যই অংশ নেবো। কিন্তু আয়োজকদের আমাদের উদ্বেগগুলো বিবেচনায় নিতে হবে। আমরা আমাদের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও দৃঢ় প্রত্যয় থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হবো না।”
এই বার্তা থেকে স্পষ্ট যে, ইরান কেবল ফুটবল খেলতেই যাচ্ছে না, বরং তাদের জাতীয় সম্মান এবং খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
কেন মেহদি তারেমি ও হাজসাফিকে নিয়ে এত আলোচনা
ইরান দলে মেহদি তারেমি ও এহসান হাজসাফি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নাম। যেহেতু ইরানে সামরিক সেবা বাধ্যতামূলক এবং অনেক খেলোয়াড়কে আইআরজিসির (ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস) অধীনে দায়িত্ব পালন করতে হয়, তাই পশ্চিমা দেশগুলো অনেক সময় তাদের ভিসা দিতে অনীহা প্রকাশ করে। ইরান এবার সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তাদের দলের প্রধান অস্ত্রদের বাদ দিয়ে বা হয়রানি করে তারা বিশ্বকাপ খেলবে না।
ফুটবল বিশ্বের প্রতিক্রিয়া
ইরানের এই ১০ শর্তের দাবি ফিফা এবং আয়োজক দেশগুলোর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে ক্রীড়াঙ্গনকে কীভাবে নিরাপদ রাখা যায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। ফুটবল বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ফিফা এই সংকট নিরসনে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করবে, যাতে করে একটি সুন্দর ও বৈষম্যহীন বিশ্বকাপ আয়োজন করা সম্ভব হয়।
ইরান ফুটবল ফেডারেশনের এই সাহসী পদক্ষেপ বিশ্ব ফুটবলে এক নতুন নজির সৃষ্টি করেছে। এখন দেখার বিষয়, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো এই শর্তগুলো কতটা মেনে নেয়। ফুটবল ভক্তরা আশা করছেন, মাঠের লড়াই শুরু হওয়ার আগেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে এবং ১৫ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসে ইরানের লাল-সবুজ-সাদা পতাকাই উড়বে।








