ইরানে গত দুই সপ্তাহ ধরে চলা সরকার বিরোধী বিক্ষোভ এবং অস্থিরতা নিরসনে এবার কঠোর অবস্থান নিলো দেশটির প্রভাবশালী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি (IRGC)। জনসম্পত্তি, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে বিক্ষোভকারীদের জন্য একটি নির্দিষ্ট সীমারেখা বা ‘রেড লাইন’ ঘোষণা করেছে তারা।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিশেষ বিবৃতির মাধ্যমে এই ঘোষণা দেয় সেনাবাহিনীর এই অভিজাত শাখাটি। এই ঘোষণার ফলে দেশটির পরিস্থিতি আরও সংঘাতময় হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
আইআরজিসি’র ‘রেড লাইন’ ঘোষণা কেন?
বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গত কয়েকদিন ধরে আন্দোলনের নামে যা চলছে তা আর মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। তাদের দাবি, বিক্ষোভের সুযোগ নিয়ে একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার চেষ্টা করছে।
আইআরজিসি তাদের বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে, “গত দু’রাত ধরে সন্ত্রাসীরা সামরিক ঘাঁটি এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কেন্দ্রগুলো দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে। এই হামলায় বেশ কয়েকজন সাধারণ নাগরিক এবং নিরাপত্তা কর্মী নিহত হয়েছেন। এছাড়াও সরকারি সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে আইআরজিসি এই ‘রেড লাইন’ টেনে দিয়েছে। তারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, এখন থেকে কেউ যদি রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির ক্ষতি করার চেষ্টা করে, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর থেকে কঠোরতম পদক্ষেপ নেওয়া হবে। শত্রুদের সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেশে স্থায়ী শান্তি না ফেরা পর্যন্ত জনগণের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে তারা।
জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সেনাবাহিনীর অবস্থান
আইআরজিসি-এর পাশাপাশি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির অধীনস্থ নিয়মিত সেনাবাহিনীও মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, জাতীয় স্বার্থ, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দিতে তারা সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে। অর্থাৎ, বিক্ষোভ দমনে এখন ইরানের সবকটি বাহিনী একযোগে কাজ করার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারি ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান
ইরানের এই কঠোর অবস্থানের ঠিক আগেই, শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানি নেতাদের উদ্দেশ্যে কড়া বার্তা দিয়েছেন। তিনি সরাসরি জানিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানো হলে যুক্তরাষ্ট্র তা মেনে নেবে না এবং এর প্রতিক্রিয়া হবে তীব্র।
বিক্ষোভ শুরুর পর থেকেই ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছেন যে, ইরান সরকার যদি কঠোর পন্থায় আন্দোলন দমনের চেষ্টা করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র দেশটিতে সামরিক অভিযান চালাতে পারে। এখন পর্যন্ত তিনি চারবার এই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
অন্যদিকে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে বলেছেন, “ইরানের সাহসী জনগণের পাশে আছে যুক্তরাষ্ট্র।” আমেরিকার এই খোলামেলা সমর্থনের পর শুক্রবার রাতভর ইরানের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ আরও জোরদার হয়। শিরাজে, কোম এবং হামেদান শহরে নিহত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের শেষকৃত্যের ফুটেজও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও আবেগঘন করে তুলেছে।
বিক্ষোভের সূত্রপাত ও বর্তমান পরিস্থিতি
মূলত অর্থনৈতিক সংকট থেকেই এই বিক্ষোভের শুরু। বছরের পর বছর ধরে ইরানি রিয়ালের মান কমে যাওয়া, অসহনীয় মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গিয়েছিল।
- বিক্ষোভের শুরু: গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের বাজারের ব্যবসায়ীরা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে ধর্মঘট ডাকেন। সেখান থেকেই আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ।
- ছড়িয়ে পড়া: বর্তমানে ইরানের ৩১টি প্রদেশের প্রায় সব শহর ও গ্রামে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
- ইন্টারনেট বন্ধ: আন্দোলন দমাতে সরকার ইন্টারনেট ও মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।
- হতাহতের সংখ্যা: মার্কিন সাময়িকী টাইমসের তথ্যমতে, গত ১৩ দিনে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে ২০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
রাজনৈতিক মোড় ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
শুরুতে এটি অর্থনৈতিক দাবি-দাওয়ার আন্দোলন হলেও এখন তা পুরোপুরি রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে। বিক্ষোভকারীরা এখন ধর্মীয় শাসনের অবসান দাবি করছেন। আন্দোলনকারীরা বলছেন, তারা আর বর্তমান শাসনব্যবস্থা মেনে নিতে রাজি নন।
অন্যদিকে ইরান সরকারের অভিযোগ, এই বিক্ষোভের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সরাসরি মদদ রয়েছে। তাদের উস্কানিতেই পরিস্থিতি শান্ত হচ্ছে না। সব মিলিয়ে, আইআরজিসি-এর ‘রেড লাইন’ ঘোষণা এবং যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা হুমকিতে ইরানের পরিস্থিতি এখন বারুদের স্তূপের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী দিনগুলোতে কী ঘটে, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে পুরো বিশ্ব।
সূত্র: রয়টার্স।








